weekly

অধ্যাপক মো. আনিসুর রহমান : সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন

রিডিং ক্লাবের ২৪২ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ 

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে আনিসুর রহমানকে একজন সৃজনশীল ও বিকল্প উন্নয়ন চিন্তার ধারক ও বাহক বলে মনে করা হয়। তিনি আত্নবিশ্বাসে বলীয়ান একটি স্বনির্ভর জাতির স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে সকলেই সমান সুযোগের অংশীদার হবে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য ও অসমতার বিরুদ্ধে অন্যান্যদের মত তিনিও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। গ্রামীণ মানুষের স্বউদ্যোগী অংশগ্রহণকে তিনি উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একযুগব্যাপী তিনি বহির্বিশ্বে অংশীদারীত্বমূলক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন। অর্থনীতির জটিল সমীকরণে ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জন্য ছিল অপরিসীম দরদ ও মমতা । গ্রামের কৃষকদের নিয়ে ছাত্রসহ তিনিও মাঠে নেমে পড়েছিলেন উৎপাদনের জন্য। সমাজের  শিক্ষিত ও প্রান্তিক মানুষদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই জনগণের আত্মোন্নয়ন, সম্পদের সুষম বন্টন এবং সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে তিনি স্বপ্ন দেখতেন। এ প্রবন্ধে আমরা আনিসুর রহমানের জীবন এবং তার কর্মচিন্তা নিয়ে আলোচনা করব।

বেড়ে উঠার সময়:

আনিসুর রহমান ১৯৩৩ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং  ভাইদের মাঝে তিনি পরিবারের বড় সন্তান। আনিসুর রহমানের বেড়ে উঠার সময়ে তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন তার বাবা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাঙালী মুসলমানদের মাঝে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা শুরু হতে থাকে। আনিসুর রহমানের বাবা ছিলেন সেই প্রজন্মের মানুষ। তাঁর বাবা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান যিনি অর্থনীতিতে (সম্মান পরীক্ষা) প্রথম শ্রেণীতে পাশ করেছিলেন।[1] তিনি সিভিল সার্ভিস এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পালন করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে হাফিজুর রহমানই প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। আনিসুর রহমানের মাও ছিলেন সেসময়ে মেট্রিক পাশ করা ছাত্রী। বাবা-মা দুজনের কড়া শাসন এবং আদর্শিক স্নেহের ভেতর বড় হয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর পড়াশুনা এবং চরিত্র গঠনে বাবা-মার বিশেষ নজর ছিল। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি বেশ আগ্রহী ছিলেন। ‍শিল্পী কামরুল ইসলামের ‘মুক্তিফৌজ’ তাঁর কিশোর বয়সে চরিত্র গঠনে বিশেষ অবদান রাখে। পারিবারিকভাবে সংগীতচর্চার ধারা বজায় ছিল। বিখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ‍ফিরোজা বেগম ছিলেন তাঁর খালা। ফিরোজা বেগমের নিকট হাতেখড়ি এবং ভক্তিময় দাশগুপ্তের নিকট থেকে রবীন্দ্র সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে একজন রবীন্দ্র সংগীতজ্ঞ ও গবেষক হিসেবে আনিসুর রহমান সমাদৃত ও পুরষ্কৃত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আত্মনির্ভরশীলতা ও গ্রামোন্নয়ন চিন্তা দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা তিনি তাঁর পরবর্তী জীবনে কর্মপন্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন।

তাঁর বাবা হাফিজুর রহমান সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। হাফিজুর রহমানের ন্যায়পরায়নতা ও আদর্শিক দৃঢ়তার কথা কিংবদন্তীর মত লোক মুখে ঘুরতো। ছেলেমেয়েদের কখনো তিনি বিলাসিতার জীবন যাপনে প্রশ্রয় দেননি। বাবার এসব গুণাগুণ আনিসুর রহমানের ভেতরেও প্রভাব ফেলে। বিলাসী জীবন যাপনকে তিনি কখনো প্রাধান্য দেননি। তাঁর বাবা একজন সমাজসেবক হিসেবেও সুপরিচিত ছিল। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন প্র্তিষ্ঠা ও সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন সবসময়। অবসর থাকাকালীন সময়েও অন্তত ১৫ টি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত ছিলেন। বাবার এই সেবাপরায়ণমুখীতা আনিসুর রহমানের জীবনমোড়ে প্রভাব রেখেছিল। তিনি তার সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন গ্রামের প্রান্তিক মানুষের কল্যাণ সাধনায়। হাইস্কুলে থাকাকালীন সময়ে বাবার সাথে প্রায়ই আনিসুর রহমান সকালে ঘুরতে বের হতেন। বাবা দেশ-কাল সমাজ ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন।[2] এমন পরিবেশে বড় হয়ে পরবর্তীতে আনিসুর রহমান দেশের একজন সেরা অর্থনীতিবিদ হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন।

আনিসুর রহমান ও অসম  সমাজব্যবস্থা

অসম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বসাবাস

১৯৪৭ সালে আনিসুর রহমান সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ক্লাস নাইনে ভর্তি হন। ভারতীয় মুসলমানদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য এবছরই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। প্রায় হাজার মাইলের দূরত্ব নিয়ে নতুন রাষ্ট্রটি দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের  মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে ৩০৫ ও ৩৩০ টাকা।[3] তবে শ্রমশক্তির বিচারে এগিয়ে থাকার কারণে ১৯৪৮-৪৯ সালের মধ্যে অর্জিত সকল বৈদেশিক মুদ্রার ৫১.৫ শতাংশ আসে পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি থেকে। অথচ পাকিস্তানের শুরুর দিকের বছরগুলোতে আমদানির ৭০ শতাংশ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য।[4] এরকমভাবে চাকরিতে নিয়োগ, রাজনীতি বা ‍শিক্ষা ইত্যাদি সবক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করার কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিচে নেমে আসে। সারা পূর্ব পাকিস্তান বিশেষ করে গ্রাম বাংলা ব্যাপক দুর্ভিক্ষে পতিত হয়। ১৯৫২ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করে মন্তব্য করেন- “মানুষ ও কুকুর খাদ্য লইয়া কাড়াকাড়ি করিতে আমি নিজে দেখিয়াছি। কোন মানুষ হইলে এই দৃশ্য দেখিয়া কেহ স্থির থাকিতে পারেনা।”[5] পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি একটু বেশি যত্নের পরিবর্তে অবহেলা আর বৈষম্য এ অঞ্চলকে আরো বেশি পিছিয়ে দিয়েছিল।  ফলে ১৯৫৪-৫৫ সালে পূর্ব ও পশ্চিমের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ২৯৮ ও ৩৫৬ টাকা।[6] আর্থ-সামাজিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন ও সাম্য নিশ্চিতের যে উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান তা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

দুই পাকিস্তানের মাঝে বিরাজমান এসব বৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা শুরু হয় ১৯৫৬ সাল থেকে।[7] তরুণ আনিসুর রহমান তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের নামকরা মেধাবী ছাত্র। এর আগে  তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশুনা শেষ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে ১৯৫৪ সালে অনার্স এরং ১৯৫৫ সালে তিনি মাস্টার্স পাশ করেন।‍ ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে ফজলুল হক হলে থাকাকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেসময়ে সাধারণত ইউনিভার্সিটির সেরা ছাত্ররাই ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতেন। রাজনীতি থেকে বরাবরই দূরে থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আনিসুর রহমান ব্যস্ত থাকেতেন। মেধাবী এবং সংস্কৃতিমনা হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমান ও অন্যান্যরা তাঁকে এ পদ নিতে অনুরোধ করায় তিনি রাজি হন।[8] ফলে পূর্ব পাকিস্তানে বিরাজমান বৈষম্যমূলক অর্থনীতির ব্যাপারে তিনি মোটামুটি ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং এর প্রতিবাদে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে তিনি অল্প-বিস্তর জড়িত ছিলেন।

বণ্টনব্যবস্থা নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বরাদ্দ বিষয়ে পিএইচডি করেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় যেসব অর্থনীতিবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের অনেকেই বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চতর শিক্ষার জন্য। নূরুল ইসলাম হার্ভার্ড থেকে পড়াশুনা শেষ করে আসেন ১৯৫৫ সালে। রেহমান সোবহান ক্যামব্রিজ থেকে ফেরেন ১৯৫৭ সালে। তাঁরা এখানে এসে বাঙালিদের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে নিজেদের অন্তর্ভূক্ত করেন এবং নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেন। ১৯৬১ সালে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর তা এ আন্দোলনে নতুন আলোড়ন তৈরি করে। আনিসুর রহমান এর ঠিক দু’বছর আগে ১৯৫৯ সালে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে গিয়েছিলেন। ফলে  পিএইচডি করার সময় পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বই তাঁর মূল প্রেরণা ছিল।[9]

১৯৫০-৫৫ সালের প্রাক-পরিকল্পনা আমলে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ৭০কোটি টাকা জোটে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যে। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তান পায় ২০০ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ৩৬ ভাগ প্রদান করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য।[10] অথচ মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাস করত পূর্ব পাকিস্তানে। আনিসুর রহমান এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। তিনি বিভিন্নভাবে এটাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বলতো পশ্চিম পাকিস্তান উৎপাদন শক্তিতে এগিয়ে গেছে এবং এইজন্য ওখানে পুঁজি বেশি বিনিয়োগ করলে সমস্ত দেশে প্রবৃদ্ধির হার বেশি হবে এবং তার থেকে ভবিষ্যতে পূর্ব অঞ্চলকেও দেয়া যাবে। কিন্তু অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পাচার হয়ে যাচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এর একটা অর্থ হলো- পূর্ব অঞ্চল তার আয় থেকে কম হারে ভোগ করছে। অর্থাৎ তার সঞ্চয়ের হার বেশি হচ্ছে এবং এটা তথ্য দিয়ে প্রমাণিত। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাহলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় পূর্ব অঞ্চলে বেশি বিনিয়োগ করলে পশ্চিমের উৎপাদন শক্তি বেশি হলেও পূর্বাঞ্চলের বেশি সঞ্চয় হারের জন্য সারা দেশের প্রবৃদ্ধির হার বেশি হতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যানিং পিরিয়ডকে ব্যাখ্যা করে লিনিয়ার প্রোগ্রামিং এর পদ্ধতিতে একটি হিসেব বের করেন এবং তাতে দেখা যায় যে, প্ল্যানিং পিরিয়ড একটু লম্বা হলে সত্যিই তার ধারণা ঠিক হয়। তার মনে হল আঞ্চলিক বিনিয়োগে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে জেনারেল থিওরী হিসেবে এটাকে দাঁড় করানো যায় এবং এটি একটা মৌলিক কাজ হবে।[11] মূলত ছোটবেলা থেকেই এমন ভিন্নভাবে চিন্তা করা বা কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। জীবনের আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছার কথা কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন যে বিশ্বের চিন্তায় অবদান রাখতে চাই।[12]

আনিসুর রহমান তখন অঙ্ক প্রয়োগের মাধ্যমে তার থিওরী প্রমাণ করার জন্য আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ইকোনমেট্রিক্স এর আশ্রয় গ্রহণ করেন। অঙ্কে তখন মোটামুটি জানা থাকলেও বিশ্লেষণাত্বক অঙ্ক খুব বেশি জানা ছিলনা। লাইব্রেরিতে কয়েকমাস খেটে তিনি অঙ্কের জ্ঞান হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন এবং মেট্রিক আলজেব্রা, ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন এবং ‘বেলম্যান’স অপটিমালিটি প্রিন্সিপল’ ইত্যাদি এসব অঙ্ক প্রয়োগ করে তার থিওরি প্রমাণ করলেন। তাঁর প্রিয় শিক্ষক এবং ‍সেসময়ের বিখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ লিওনতিফ তাঁর এই থিসিসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আনিসুর রহমান তাঁর থিসিসের নাম দিয়েছিলেন “রিজিওনাল এলোকেশন অব ইনভেস্টমেন্ট”। অঙ্কে তাঁর পান্ডিত্যের সুনাম পরবর্তীতে অনেকের মুখে শোনা যায়। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রও তাঁর প্রশংসা করেছেন। স্বাধীনতার পর আনিসুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওরেটিক্যাল ইকনোমিক্স বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থনীতি চর্চায় অঙ্কসহ যে সমস্ত উন্নত টুলস ব্যবহৃত হচ্ছে সেসময় অর্থনীতি বিভাগের অনেকেই সেগুলির সঙ্গে পরিচিত ছিলনা। তাছাড়া আমাদের দেশের অর্থনীতি শিক্ষা অনেকটা শিল্পোন্নত দেশগুলোর সমস্যানুযায়ী। যেটা কৃষিভিত্তিক দেশগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে রচিত নয়। এসব কারণে তিনি এ বিভাগটি খোলেন এবং অমর্ত্য সেন, ওয়াহিদুল হকসহ দেশি-বিদেশি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের  ক্লাস নেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।[13] আনিসুর রহমানের এ প্রচেষ্টা আমাদের দেশের অর্থনীতির শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

স্বাধিকার আন্দোলনে অবদান

হার্ভার্ডে পিএইচডি শেষ করার পর তিনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন। তৎকালীন ভিসির সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণে ১৯৬৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেন । ১৯৬৭ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন। সেসময় বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বেগবান হচ্ছিল। এর আগের বছর বঙ্গবন্ধু ছয়দফা প্রণয়ন করেন যার তিনটি দফাই ‍ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো বিষয়ক। আনিসুর রহমান সক্রিয় রাজনীতিতে কখনোই আগ্রহী ছিলেননা। কিন্তু সেসময়ের স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি আর দূরে থাকতে পারেননি। ১৯৬৯ এর গোড়ার দিকে আইয়ূব সরকার যে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তা নিরসনের জন্য ইসলামাবাদে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। কারাগার থেকে সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত শেখ মুজিব গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য পেশকালে তাঁকে সহায়তার জন্য যে তিনজন অর্থনতিবিদকে আমন্ত্রণ জানান তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আনিসুর রহমান।[14] উত্তাল সেসময়ে রাওয়ালপিন্ডিতে বসে পূর্ব পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক অধিকার, স্বায়ত্ত্বশাসনের যৌক্তিকতা এবং জাতীয় সম্পদের বণ্টনে ন্যায়বিচারসহ প্রবৃদ্ধির উপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখতেন। নিজের সমাজ থেকে বহু দূরে সিংহের গুহায় বসেই তিনি সেসময়ে পূর্ববঙ্গের মুখপাত্র বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ফোরাম’-এ প্রবন্ধ লিখতেন।

১৯৭০ এর মার্চ মাসে ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তুতি হিসেবে একটি প্যানেল অব ইকোনমিস্ট গঠন করা হয়। তাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নূরুল ইসলাম, ড. আখলাকুর রহমান , অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন , ড. আজিজুর রহমান এবং আনিসুর রহমান সদস্য ছিলেন।[15] তাঁরা মূলত জনসংখ্যার ভিত্তিতে দুই অঞ্চলের মধ্যে বিনিয়োগ- সম্পদ বন্টন দাবী করেন। আর পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যরা দাবী করেন তাদের অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে গতিশীলতা এসে গেছে তাকে কিছুতেই দমিয়ে দেয়া যুক্তিযুক্ত হবেনা। ফলে আলোচনায় কোন সন্তোষজনক সমাধান আসেনি। আনিসুর রহমান সেসময় তাদেরকে বলেন তোমাদের এখানে আসার জন্য সামনে হয়ত আমাদের ভিসা করে আসতে হবে।

প্যানেল অব ইকনমিস্ট এর কাজ শেষ হবার পর তিনি পিআইডিই এর ডিরেক্টর নূরুল ইসলাম সহ দায়িত্বরত ড. এ আর খান এবং স্বদেশ বোস কে প্রস্তাব করেন, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটা ইকোনমিক মেনিফেস্টো তৈরি করতে,যেটা শেখ মুজিবকে তাঁর আন্দোলনের সহায়তা করবে।[16] দেড়মাসের প্রচেষ্টায় তাঁরা একাজটি সম্পন্ন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দেন। সেসময় অন্যান্য অর্থনীতিবিদদের মত তিনিও আওয়ামীলীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টো তৈরিতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং অবদান রাখেন। নির্বাচনে অভূতপূর্ব জয়ের পর সংবিধান রচনার জন্য বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামীলীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের ‍বৈঠকে অন্যান্য অর্থনীতিবিদদের সাথে তিনিও অংশগ্রহণ করেন।[17] নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তারিরা মেনে নেয়নি। নিরস্ত্র বাঙালিকে তারা নির্বচারে হত্যা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হয়। আনিসুর রহমান এসময় রেহমান সোবহানসহ ভারতে চলে যান। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর মূখ্য সচিব পি এন হাকসারের নিকট যুদ্ধের সামগ্রিক অবস্থা বর্ণনা করেন। ভারত সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের এটাই ছিল প্রথম পরিপূর্ণ প্রচেষ্টা।[18] যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সরকারের প্ল্যানিং সেলে স্বাধীন বাংলাদশের আয়-নীতি এবং বাংলাদশ –ভারত সম্পর্ক এই বিষয়াবলির উপর পলিসি তৈরি করেন।

 

সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার মাধ্যমে মহিমান্বিত এক স্বাধীনতা অর্জন করে। শতাব্দীর বঞ্চনা আর অবহেলাকে দূরে ঠেলে এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান সমতাভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীন দেশের পথচলা শুরু হয়। এ পথচলার মাঝেই নিজের স্বপ্নের একাত্মতা খুঁজে পান আনিসুর রহমান। স্বাধীন দেশের অভীষ্ট পথে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রকে সংবিধানের চারটি মূলনীতির অন্যতম একটি মূলনীতি হিসেবে ঠিক করা হয়।  তিনি সমাজতন্ত্রকে সমাজের সাম্যবাদে উত্তরণের পথে একটি উপায় চিহ্নিত করেছেন।[19] এ লক্ষ্যেই তাঁর নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়।

 

প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে যোগদান

আনিসুর রহমান ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন। প্রথম ছ’মাস তিনি বেতনভুক্ত পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত খণ্ডকালীন ও অনারারী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তিনি মূলত বিভিন্ন গবেষণামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক কাজে পরিকল্পনা কমিশনকে সাহায্য করতেন।

১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে একটি নাজুক ও জটিল উন্নয়ন সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে। এখানকার মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল তখন মাত্র ৫০ থেকে ৭০ ডলার। শিক্ষার হার ছিল ২০ শতাংশেরও কম।[20] আনিসুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি একে দ্বিতীয় যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে আবার চালু করা , মানুষের অন্নের সংস্থান করা- এ সমস্ত জরুরি কাজ দ্রুত করার তাগাদা অনুভব করেন। এ অনুযায়ী একটি নোট তৈরি করেন এবং পরিকল্পনামন্ত্রী , ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং পরিকল্পনা কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের নিকট এ নোটটি পাঠান। তিনি সেখানে প্রথম ছয় মাসের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক পদক্ষেপগুলো ঠিক করার আহ্বান জানান। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট বিভাগগুলোকে অতি সত্ত্বর এ দায়িত্ব অর্পণের কথা বলেন। এ ছাড়াও একটি কমিটি গঠনের কথা বলেন যেটি সমতাভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ, জীবনযাত্রার সমমান প্রতিষ্ঠা এবং সরকার ও সমাজের সকলের অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস নিবৃত্ত করতে সেসময়ের চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।[21]

সেসময় দেশের চরম অর্থনৈতিক দুরাবস্থা সত্ত্বেও সরকারি কর্মচারীদের মাঝে বিলাসী চেতনা তীব্র ছিল। অফিসগুলো ছিল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ও শৌখিন কার্পেট বেষ্টিত। সরকারী গাড়ি ব্যবহারে কর্মচারীদের সংযমের অভাব ছিল। আনিসুর রহমান নিজে এসব বিলাসিতা সর্বাত্মকভাবে পরিহার করেছিলেন। তিনি শৌখিন কার্পেট বর্জিত ফ্যানওয়ালা ঘরে অফিস করতেন। সাইকেলে করে অফিসে আসা-যাওয়া করতেন। সেসময় আরেকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ব্যক্তিগত কাজে যাতায়াতের জন্য সাইকেল ব্যবহার কররতেন। তিনি হচ্ছেন পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। [22] সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এলিট শ্রেণীর বিলাসভোগ করাকে আনিসুর রহমান চরম সাংঘর্ষিক বলে মনে করতেন। এব্যাপারে তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘প্রথম পদক্ষেপ’ নামক একটি প্রস্তাব পাঠান।[23]

সেসময়ে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও মারাত্নক দুর্ভিক্ষ এড়াতে বিদেশী সাহায্যনীতি প্রস্তাব করেন। তিনি দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে সমাজতন্ত্র বিরোধী দেশগুলো থেকে সাহায্যের উপর নির্ভরশীল করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।[24] দেশ পরিচালনাকালে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্য প্রার্থনা করা হবেনা। পরবর্তীতে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ণের সময় বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা ব্যাপকহারে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। গোটা পরিকল্পনার আর্থিক উন্নয়ন রুপরেখায় বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা ৬২% থেকে কমিয়ে প্রান্তিক বছরে (১৯৭৭-৭৮) ২৭% এ নামিয়ে আনার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।[25] তবে প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকারে দৃঢ সংকল্প এবং সর্বজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোন সাহায্য ছাড়াই বাংলাদেশের মত গরীব দেশেরও উন্নয়ন সম্ভব বলে আনিসুর রহমান তাঁর এই সাহায্যনীতি প্রস্তাবে উল্লেখ করেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ণের পর তিনি পরিকল্পনা কমিশন থেকে বিদায় নেন এবং নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতায় নিয়োজিত রাখেন।

 

স্বপ্নভঙ্গ ও দেশত্যাগ

অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ চারজন অর্থনীতিবিদের সমন্বয়ে ১৯৭২ সালে গঠিত হয়েছিল প্রথম পরিকল্পনা কমিশন।  বঙ্গবন্ধু প্ল্যানিং কমিশনকে ‘আলু’ হিসেবে উল্লেখ করতেন যেটা সব তরকারীর জন্য দরকারী ছিল। মন্ত্রণালয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রণয়নে সহায়তাকরণের দায়িত্ব ছিল কমিশনের। [26] এককথায় পুরো দেশের অর্থিনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ভার ন্যস্ত করা হয়েছিল এ কমিশনের হাতে।[27] কিন্তু ১৯৭৪ সালের শেষ নাগাদ অর্থনীতিবিদদের প্রত্যেকেই এ কমিশন ছেড়ে চলে যান।[28] বস্তুত পরিকল্পনায় তারা যতটা স্বাধীন ছিলেন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ততটা স্বাধীন ছিলনা। আনিসুর রহমান একারণে প্রথমদিকে কমিশনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় দিল্লীতে থাকাকালীন নূরুল ইসলামসহ অন্যান্যরাও এব্যাপারে তাঁর সাথে সম্মত ছিলেন। আমাদের দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি অনুযায়ী ক্ষমতার আসল ব্যবহার রাজনীতিবিদরাই করেন। ফলে ইচ্ছেনুযায়ী অন্যান্যদের এখানে কাজ করা কঠিন ব্যাপার। কিন্তু দেশকে নতুন করে গড়ার আহ্বান এঁরা কেউই উপেক্ষা করতে পারেনি। আনিসুর রহমান প্রথমে ছয়মাসের ট্রায়াল হিসেবে কমিশনে যোগ দেন এই শর্তে যে তিনি যদি ইচ্ছেনুযায়ী কাজ করতে পারেন তবে থাকবেন, নাহলে থাকবেন না।[29]

সমতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের স্বপ্নযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন ছিলেন এ অর্থনীতিবিদরাই। আনিসুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু ডেকে প্রায়ই বলতেন-“ডাক্তার সাহেব, আমার জন্য সোস্যালিজম এর প্ল্যান করে দেন-আপনাদের এজন্যই এনেছি।”[30] তিনি বঙ্গবন্ধুকে সোস্যালিজম বাস্তবায়নের জন্য সরকারে সোস্যালিস্ট কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু সেসময়ের রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারণেই এ কমিশন লক্ষ্যানুযায়ী কাজ করতে পারেনি। কমিশনে থাকাকালীন আনিসুর রহমানের প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়নি একই কারণে। ক্রমান্বয়ে সার্বিক পরিস্থিতি হতাশা ও নৈরাজ্যময় হয়ে উঠে। আত্মনির্ভরশীলতার বদলে দেশ ক্রমান্বয়ে বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর হয়ে পড়ে। ১৯৭৪-৭৫ সালের মোট ৫২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৪৪২ কোটি টাকা[31]। সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়তে থাকে। আনিসুর রহমান উন্নয়নের ভিন্নরকমের উপায় অনুসন্ধান করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ই মে ব্যাংককে “এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এন্ড প্ল্যানিং” এ বিকল্প ‍উন্নয়ন প্যারাডাইমের ওপর তিনমাস কাজ করার জন্য দেশত্যাগ করেন। [32]

আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের উদ্যোগ

স্বাধীনতা আন্দোলন এদেশের মানুষের আত্মশক্তির এক নবউন্মেষ ঘটিয়েছে। আনিসুর রহমান নতুন দেশকে গড়ার কাজে এ শক্তিকে গণজোয়ারে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি বিশ্বাস করেন এর মাধ্যমেই সমস্যা সমাধানে মানুষের সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টার প্রয়োগ দেখা যাবে, সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য ব্যক্তিগত আত্মত্যাগে উৎসাহিত হবে এবং মানুষ তার সামাজিক উন্নয়নের এক নবদিগন্ত আবিষ্কার করতে পারবে। গতানুগতিক উন্নয়ন চিন্তায় যেটার গুরুত্ব অনুল্লিখিত। সেসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি তাঁর ছাত্রদের নিয়ে ১৯৭৩ সালে মাঠে কাজ করা নিয়ে দেশব্যাপী এক প্রোগ্রাম শুরু করেন। ছাত্ররা গ্রামে গিয়ে কৃষক এবং চাষীদের সাথে থাকেবে, তাদের সাথে মাঠে কাজ করবে এবং সমস্যা নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করবে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানের নয়টি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে থেকে মোট প্রায় ১৪০০ ছাত্র এ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে।[33]

পরবর্তীতে এ প্রজেক্টের খবর দেশের বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারিত হলে দেশব্যাপী এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। স্বউদ্যোগে অনেকেই কাজ শুরু করে। এ প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে তিনি সেসময় দেশের বিভিন্ন উদ্যোগী তরুণদের কাজ সম্পর্কে জানতে পারেন। সেসময় রংপুরের স্বনির্ভর আন্দোলনের কথা জানেন। কৃষি অফিসার মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দীন ছিলেন এ আন্দোলনের উদ্যোক্তা। সরকারের কাছে আবেদনে ব্যর্থ হয়ে গ্রামবাসীদের নিয়ে তিনি নিজেই উন্নয়ন কাজ শুরু করেন। নিজেদের যা আছে তাই নিয়ে উন্নয়নের চেষ্টায় ব্রতী হওয়ার শপথ নেয় গ্রামবাসী। দেড়বছরের মাথায় এ আন্দোলন প্রায় ৬০ টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট ছোট পরিসরের এসব স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল নিজস্ব শক্তিতে অনুপ্রাণিত, সমন্বয়ভিত্তিক সামষ্টিক প্রচেষ্টা, সমবায়ভিত্তিক বণ্টননীতি এবং ফলশ্রুতিতে সমতাভিত্তিক জীবনব্যবস্থা। আনিসুর রহমান এদের কাছ থেকে উন্নয়নের আসল শিক্ষা নতুনভাবে উপলব্ধি করেন। উন্নয়ন মানে গণজীবনের গর্বিত আত্মপ্রকাশ। মানুষের দীপ্তি অনেক সময় পারিপার্শ্বিক সংস্কৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকে, তাকে উদ্ভাসিত করার কাজটিই উন্নয়ন প্রচেষ্টায় নেতৃত্বের কাজ। [34] একাজেই তিনি নতুন পথের দিশা খুঁজে পান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। সেসময় তিনি দেশের বাইরে থাকলেও জীবননাশের হুমকির কারণে তাঁর দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিদেশে থাকাকালীন বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অংশীদারীত্বমূলক উন্নয়ন এবং এর পদ্ধতিগত উপায় নিয়ে গবেষণা করেন। উন্নয়ন চিন্তায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন উন্নয়ন আর মানুষের মনের সাথে গভীর সম্পর্ক আছে। মানুষের মনে দুটি বিপরীত সত্তা আছে এবং নির্দিষ্ট প্রণোদনার দ্বারা একটি সত্তা থেকে আরেকটি সত্তায় রুপান্তর করা যায়। আনিসুর রহমান কার্ল জ্যাংয়ের এই তত্ত্বকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করেছেন।[35] গরীব লোকদের জন্য শুধু আত্মশক্তি ও আত্মসম্মান সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ ও প্রেরণা দরকার, তাতেই তারা নিজেদের উন্নয়ন করতে পারবে। প্রেরণাদায়ী ও প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে উন্নয়নে অংশগ্রহণ করার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেই বলা হয় অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন।

১৯৭৭ সালে তিনি আইএলও’র “পার্টিসিপেটরি অরগানাইজেশনস অব দ্য রুরাল পুউর” প্রোগ্রামের সমন্বয়ক হিসেবে যোগ দেন। তিনি সেখানে গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকদের সাথে স্বয়ং গ্রামীণ গরীব লোকদের অংশগ্রহণকেও প্রাধান্য দেন, যাতে গবেষণার ফলাফলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিফলিত হয়। অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষিত কর্মীদেরও মাঠ-গবেষণায় নিয়োজিত করেন সাধারণ লোকদের সৃজনশীল প্রচেষ্টা ও আর্থ সামাজিক কার্যক্রমকে সাহায্য করার জন্য । আইএলওতে এরকম গবেষণা সেসময় ছিল সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।  বিভিন্ন দেশের উন্নয়নমূলক তৃণমূল আন্দোলনকে পরষ্পরের সাথে সংযুক্ত করে তাদের পদ্ধতি, অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তিনি প্রায় এক যুগ কাজ করেন।[36]

১৯৯০ সালের দিকে তিনি দেশে ফেরেন। দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সাথে তিনি তাঁর কাজের ধারা অব্যাহত রাখেন। ২০০২ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় “রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ”। এটি বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ক গবেষণা কর্মকান্ডকে আরো প্রাসঙ্গিক, প্রয়োগমুখী ও কার্যকরী করে তোলা এবং তার জন্য ক্ষেত্র তৈরী করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা ও কারিগরী সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।[37] এর মাধ্যমেই আনিসুর রহমান তাঁর আত্মনির্ভরশীল, বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

সবশেষে বলা যায়, আনিসুর রহমান উন্নয়ন চিন্তায় সৃষ্টিশীল পদ্ধতির ধারা তৈরি করেছেন। গতানুগতিকতাকে পরিহার করে তাঁর চিন্তায় মানুষ এবং মানুষের সৃজনশীলতাই প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষদের সার্বিক অংশগ্রণ ‍নিশ্চিতকরণে আনিসুর রহমানের কাজ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। একজন তাত্ত্বিক এবং একই সাথে একজন মাঠকর্মী হিসেবে তিনি আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তথ্যসূত্র 

[1](সম্পা.) হোসনে আরা কামাল, মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ,অধুনা প্রকাশ, ২০০৭, পৃ: ৪৯

[2] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (প্রথম পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০২,পৃ: ১৯-২১

[3] এম.এম.আকাশ, সাধারণ অর্থনৈতিক অবস্থা: পাকিস্তান আমল, উদ্ধৃত: (সম্পা.) সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস, দ্বিতীয় খন্ড, এশিয়াটিক সোসাইটি,২০০০, পৃ: ১১০)

[4] রেহমান সোবহান, আমার সমালোচক আমার বন্ধু, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ,২০০৭, পৃ:১৫

[5]  (সম্পা) আতিউর রহমান ও অন্যান্য, ভাষা-আন্দোলনের আর্থ সামাজিক পটভূমি, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০০, পৃ:১১৭

[6]  এম এম আকাশ, পূর্বোক্ত, পৃ :১১০

[7] Nurul Islam, Making of a nation, Bangaldesh, University press limited,2003, p:23-60

[8] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (প্রথম পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০২,পৃ: ২৩-২৪

[9] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (প্রথম পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০২,পৃ: ৪৬

[10] রেহমান সোবহান, পূর্বোক্ত,পৃ: ১৫

[11] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (প্রথম পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০২,পৃ: ৪৬

[12] প্রাগুক্ত,পৃ: ২৩

[13] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ:১৬৯

[14] রেহমান সোবহান, প্রাগুক্ত, পৃ:২০

[15] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ: ৭৬

[16] প্রাগুক্ত, পৃ: ৭৭

[17] রেহমান সোবহান, প্রাগুক্ত, পৃ:৬২

[18]

[19] মোঃ আনিসুর রহমান, অপহৃত বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৩, পৃ:২২

[20] আকবর আলী খান, অন্ধকারের উৎস হতে, পাঠক সমাবেশ, ২০১১, পৃ: ১৫৮

[21]  মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ:২০

[22]  প্রাগুক্ত, পৃ:২৪

[23] ঐ, ৩১

[24] ঐ, ৫০

[25] মওদুদ আহমদ, শেখ মুজিবর রহমানের শাসনকাল,ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ: ২২৩

[26]  প্রাগুক্ত,পৃ: ১৪০

[27]  Nurul Islam, Ibid,p: 139

[28]  Ibid, p: 158

[29]  মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ: ১৮-১৯

[30] প্রাগুক্ত, পৃ:৩৭

[31] মওদুদ আহদম, প্রাগুক্ত, পৃ: ২২৩

[32] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ:১৬৮

[33]  Muhammad Anisur Rahman, People’s self-Development, University press limited, 1994, p: 2

[34] মোঃ আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি (দ্বিতীয় পর্ব) অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন,২০০৪,পৃ: ১৪৩

[35]  Md. Anisur Rahman, Through moments in history,pathak shamabesh,2007,p: 217

[36] Md. Anisur Rahman, Through moments in history,pathak shamabesh,2007,p: 215

[37] www.rib-bangladesg.org

ফটোক্রেডিট: দি ডেইলি স্টার

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply