Book Review Monthly

উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে

রিডিং ক্লাবের ৫ম মাসিক পাবলিক লেকচারের সারাংশ 

উয়ারী-বটেশ্বর নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার দুটি গ্রামের বর্তমান নাম। প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামে আড়াই হাজার বছর আগে গড়ে ওঠেছিল নগর সভ্যতা। উয়ারী-বটেশ্বর ছিল সেই নগর সভ্যতার নগর কেন্দ্র। তবে শুধু বেলাব নয় শিবপুর, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলায় এ পর্যন্ত ৫০টি প্রত্নপীঠ আবিষ্কৃত হয়েছে। আড়াই হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা নগর সভ্যতা একদিন ধ্বংস হয়। ঠিক দিনক্ষণ এবং কারণ জানা না গেলেও নগর সভ্যতা মাটির নিচে চাপা পড়েছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অনুসন্ধিৎসু মোহাম্মদ হানিফ পাঠান ১৯৩০ এর দশকে কিছু ধাতব মুদ্রার সন্ধান পান। এরপরই খুঁজে পান কিছু লোহার হাতিয়ার। তাঁর মনে হয় এগুলো কোনো ফেলনা বস্তু নয়। খুব সম্ভব প্রাচীন মানব সভ্যতার নিদর্শন। উয়ারী-বটেশর অঞ্চলে জমি চাষ, গর্ত খনন প্রভৃতি গৃহস্থালী কাজে ভূমির মাটি ওলট-পালট হয়। প্রাচীন শিল্পবস্তু ভূমির ওপর চলে আসে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পর পাথরের প্রত্নবস্তুগুলো চকচকে দেখায়। মোহাম্মদ হানিফ পাঠান সেগুলো সংগ্রহ করেন এবং লেখালেখি শুরু করেন।

১৯৫০-এর দশক থেকে প্রত্নবস্তু সংগ্রহ এবং গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন মোহাম্মদ হানিফ পাঠানের সুযোগ্য পুত্র আরেক স্কুল শিক্ষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। দীর্ঘ ৬০ বছর হাবিবুল্লা পাঠান উয়ারী-বটেশ্বর নিয়ে গবেষণারত আছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের কথা এদেশের বড় বড় অধ্যাপক, পণ্ডিত, ঐতিহ্য বিশারদ কানে নেননি দীর্ঘদিন। উপরন্তু কোনো কোনো সময় উয়ারী-বটেশ্বরের কথা বলতে গিয়ে তিনি নিগৃহীত হয়েছেন। কিন্তু স্ব-শিক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান হাল ছাড়েন নি। ১৯৭৪ সালে সে সময়ের তরুণ গবেষক লেখক মুনতাসীর মামুন উয়ারী-বটেশ্বর পরিদর্শন করে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রচ্ছদ প্রবন্ধে লেখেন- “হয়ত বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে”। তারপরও উয়ারী-বটেশ্বর থাকে অবহেলিত দীর্ঘদিন।

১৯৯২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার চক্রবর্তী প্রাচীন বাংলাদেশ গ্রন্থে লেখেন- “উয়ারী-বটেশ্বর কমপক্ষে বাইশ শত বছর প্রাচীন। উয়ারী-বটেশ্বরে তৈরি হতো ক্রিস্টাল, অ্যাগেট, জেসপার, কার্নেলিয়ান, অ্যামেথিস্ট পাথরের পুঁতি। উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভূ-মধ্যসাগর অঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।” এরপরও বাংলাদেশের পণ্ডিতগণ উয়ারী-বটেশ্বরের প্রতি মনোযোগী হন নি। ১৯৯৬ সালে পুণ্ড্রনগর নিয়ে পিএইচ. ডি. গবেষণা আরম্ভকালে উয়ারী-বটেশ্বর পরিদর্শন করি। সেই থেকে উয়ারী-বটেশ্বর আমার দৃষ্টি কাড়ে। মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানকে সঙ্গে নিয়ে পুরো এলাকা জরিপ শুরু করি। ২০০০ সাল থেকে নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন একটি ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও বহুশাস্ত্রীয় জটিল কাজ। বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের সীমিত আর্থিক সহায়তায় গবেষণা কাজ চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণায় প্রধান ভূমিকা পালন করলেও, কুমিল্লা, ঢাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভূ-তত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরমাণ শক্তি কমিশন ও ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষকগণ উয়ারী-বটেশ্বর গবেষণায় সীমিতভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।

গবেষণার শুরুতে একশ্রেণীর পণ্ডিত ব্যক্তি আমাদের আবিষ্কারকে অস্বীকার করতে থাকেন। তাঁরা বলতে থাকেন মুসলিম যুগের পূর্বে চুন-সুরকির ব্যবহার ছিল না। মাটির এত উপরে এত প্রাচীন প্রত্নবস্তু থাকতে পারে না। উয়ারী-বটেশ্বর নগর তো দূরের কথা ওখানে মানব বসতির চিহ্নও নেই। উয়ারী-বটেশ্বর আসলে মিথ, বাস্তবে ওখানে কিছু নেই। সুফি মোস্তাফিজুর রহমান হলো লাল সালুর মজিদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিতদের এ রকম আচরণে আমরা বিব্রত হয়েছি। কষ্ট পেয়েছি কিন্তু হাল ছাড়ি নি। তবে একথাও সত্য নিন্দুকের দলের চেয়ে সাহায্যকারীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। তাঁরা অর্থ ও মনোবল দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী আমাদের সহায়তা করেছেন বিভিন্নভাবে। ২০০৬ সালে প্রকাশিত Oxford Companion to Indian Archaeology  গ্রন্থে ভারতবর্ষের প্রাচীন ৪১টি নগরের মধ্যে উয়ারী-বটেশ্বর ২ নং ক্রমিকে এবং দুই বাংলার ১২টি নগরের মধ্যে উয়ারী-বটেশ্বর ১নং ক্রমিকে টেক্সট এবং মানচিত্রে উল্লেখ করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্ক ২০০৯ সালে প্রকাশিত হিস্ট্রি অব বাংলাদেশের গ্রন্থে উয়ারী-বটেশ্বর গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে ।

আমাদের মাইলফলক আবিষ্কার ও পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল উয়ারী-বটেশ্বরকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ইতিমধ্যে দাঁড় করিয়েছে। কার্বন-১৪ তারিখের মাধ্যমে উয়ারী-বটেশ্বর আড়াই হাজার বছর প্রাচীন একটি দুর্গ-নগরের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনপদ শ্রেণীর ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা ও উত্তরাঞ্চলীয় কৃষ্ণ মসৃণ মৃৎপাত্র প্রাপ্তি কার্বন-১৪ তারিখের মাধ্যমে নির্ণীত আড়াই হাজার বছর সময়কে সমর্থন করে। রোলেটেড মৃৎপাত্র ও স্যান্ডউইচ কাচের পুঁতির আবিষ্কার উয়ারী-বটেশ্বরকে ভূ-মধ্যসাগর এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করে। নবযুক্ত হাইটিন ব্রোঞ্জ নির্মিত পাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে। নবযুক্ত মৃৎপাত্র ও নবযুক্ত ইট-নির্মিত বিশেষ ধরনের কুন্ড বা পুকুর উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার কথা বলে। এতদাঞ্চলে অষ্টম শতকের পদ্ম-মন্দির ও বিহারিকা-র আবিষ্কার দীর্ঘসময়ব্যাপী বিকশিত বৌদ্ধধর্ম চর্চার স্বাক্ষ্য বহন করে।

ধাতব অলংকার, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি একটি সমৃদ্ধ সমাজের পরিচয় বহন করে। বহুসংখ্যক ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা এবং নয়নাভিরাম বাটখারা ব্যবস্থা বাণিজ্যের পরিচায়ক। উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি নদী বন্দর। অভ্যন্তরীণ ও আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল উয়ারী-বটেশ্বর। অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার চক্রবর্তী উয়ারী-বটেশ্বর ও টলেমি উল্লিখিত সৌনাগড়াকে অভিন্ন মনে করেন। ২৩০০ বছরের প্রাচীন ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্ববিখ্যাত সিল্ক রুটের সাথে উয়ারী-বটেশ্বর সংযুক্ত ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। দ্বিগবিজয়ী আলেকজান্ডার বিপাশা নদী পর্যন্ত অগ্রসর হলে পূর্ব ভারতের গঙ্গাঋদ্ধি জাতি বা রাজ্যের সামরিক শক্তির কথা শুনে ভীত হয়ে ফিরে যান। অনুমিত হচ্ছে সেই গঙ্গাঋদ্ধি ছিল উয়ারী-বটেশ্বর। দ্বিস্তর বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা প্রাচীর, সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত প্রাচীন বসতি, আড়াই হাজার বছর সময়কাল ও পূর্বভারতে উয়ারী-বটেশ্বরের ভৌগোলিক অবস্থান প্রভৃতি একে গঙ্গাঋদ্ধি ভাবতে রসদ যোগায়।

উয়ারী-বটেশ্বরে আবিষ্কৃত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাচীনতম চিত্র শিল্প। মৃৎপাত্র, পাথর ও কাচের পুঁতিতে বিচিত্র চিত্র-শিল্প ফুটে উঠেছে। উয়ারী-বটেশ্বরের মানুষ উন্নত শিল্পবোধ ও দর্শনের অধিকারী ছিল। প্রাচীনকালে উয়ারী-বটেশ্বরের মানুষ অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে বন্যামুক্ত প্লাইস্টোসিন ভূমিতে বসতি গড়ে তুলেছে।

উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে নগর পর্যায়ের পূর্বের একটি স্তরে গর্ত-বসতি ও কৃষ্ণ-এবং-রক্তিম মৃৎপাত্র পাওয়া গিয়েছে। তাই মনে করা হয় উয়ারী-বটেশ্বরে একদিনে নগর গড়ে ওঠেনি। আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তু প্রমাণ করে যে, উয়ারী-বটেশ্বর তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির অধিকারী ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে ফসিল-উড ও পাথরের হাতিয়ার পাওয়া যায় যা প্রাগৈতিহাসিক যুগের। হাতিয়ার আবিষ্কারগুলে দৈবাৎ প্রাপ্ত এবং এ পর্যন্ত কোনো প্রাগৈতিহাসিক বসতি স্থান সুনির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা যায়নি। তবে বহু সংখ্যক প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার আবিষ্কার এ অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানব বসতির ইঙ্গিত প্রদান করে। নিবিড় অনুসন্ধান পরিচালনা করলে হয়ত একদিন প্রাগৈতিহাসিক বসতি আবিষ্কার করা সম্ভব হবে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল থেকে। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা চলমান। প্রতি উৎখননে আবিষ্কৃত হচ্ছে অমূল্য তথ্যসূত্র, সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস।
দেশে-বিদেশে একাধিক প্রবন্ধ ছাড়াও এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তু ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ নামে এবং প্রথমা কর্তৃক ‘উয়ারী-বটেশ্বর শেকড়ের সন্ধানে’ নামে।

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান
অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply