weekly

বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৪ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: জুলফিকার ইসলাম

স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ সিনেমার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। আজ এই শিল্পের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করেছে। স্বাধীনতার পর নতুন প্রতিজ্ঞা ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল এই শিল্পের। গুণী নির্মাতা , যুঁতসই গল্প এবং প্রতিভাবান শিল্পীর সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল উপভোগ করার মতো, মনে রাখার মতো চলচ্চিত্র। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র ছিল বরাবরই অস্তিত্ব সংকটে। টেকসই কোনো খাত হিসেবে এই ইন্ডাস্ট্রি এখনো গড়ে উঠতে পারে নি।  কারণ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা এই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতে গোনা।  ৯০ এর দশকে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হলেও এই ধারা অব্যাহত রাখা যায় নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিনোদন শিল্প যেখানে মোট জিডিপির .৫ শতাংশ অবদান রাখছে, নাইজেরিয়ার নলিউড যেখানে অবদান রাখছে জিডিপির ২ শতাংশ সেখানে ঢালিউড রাখছে মাত্র .০০০০৪ ভাগ।

এই চলচ্চিত্র শিল্পে ১০ বছর ধরে প্রযোজনা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দর্শকদের নিকট সিনেমাকে পৌঁছে দেয়। দর্শক কেমন চলচ্চিত্র উপভোগ করে, দর্শকের ডেমোগ্রাফী কেমন, দর্শকের বিনোদন প্রবণতা, রুচি, কোন শ্রেণীর দর্শক কেমন চলচ্চিত্র দেখতে ভালোবাসে, কোন ধরণের চলচ্চিত্র সকল শ্রেণীর দর্শককে বিনোদিত করতে পারে , দর্শক কেমন পরিবেশে সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, সেগুলো কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা  বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ গভীর সংকটে।

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম যাদের বয়স ১৫-৬৪। আর মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি তরুণ প্রধান দেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১৪৬৫ ডলার অর্থাৎ ১ লক্ষ আঠারো হাজার টাকা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার থেকে ৩ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে একজন মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছে যাদের আয় বছরে ৫ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৪ লাখ টাকা বা তার উর্ধ্বে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে ২৫ শতাংশ ২০৩০ সালে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্তে উন্নীত হবেন। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী মানুষের আয় বেড়ে গেলে বিনোদন খাতে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ে। আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধান দর্শক এই তরুণ এবং মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী। বাংলাদেশের হিট সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেসব সিনেমায় মধ্যবিত্তকে আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট উপাদান ছিল।

কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান তরুণ ও মধ্যবিত্তকে বিনোদিত করার মতো সামর্থ্য তৈরি হয় নি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে মোট মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা মাত্র ৬৮ টি । গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১.৩০ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে।  ২০০৫ সালেও এ সংখ্যা ছিল ১০০র কাছাকাছি। অন্যদিকে ২০১৩ সালে নলিউডে ১৮৪৪ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতের তামিল ছবি মুক্তি পেয়েছে ১৯৬ টি। পরিমাণের সাথে চলচ্চিত্রের গুণমানগত বিষয়ও চলে আসে। এই ৬৮ টি সিনেমার মধ্যে ১০ টির বেশি সিনেমার কথা বলা যাবে না যা মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ফলে, ঢালিউডে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।  ঢালিউড কেন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনাকর্ষণীয় খাতে পরিণত হয়েছে তা আরও গভীরভাবে বোঝা যায় যদি এর বাজারটিকে বিশ্লেষণ করা যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজারকে এর চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র থেকে অর্জিত আয়, চলচ্চিত্রের বণ্টন বা হল পরিস্থিতি এবং বিপণন বা প্রচার এর আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১২ সালে। একটি চলচ্চিত্র একই সাথে একটি আর্টওয়ার্ক এবং বাজারের দিক থেকে একটি পণ্য বা সেবা। দর্শক এর গুণগত মান বিচার করেই পণ্য বা সেবাটি ক্রয় করেন।  সিনেমা তৈরির কাজটি পরিচালকের নেতৃত্বে হয়ে থাকে। এর সাথে জড়িত থাকেন অভিনয়শিল্পী, সিনেমাটোগ্রাফার, শব্দ প্রৌকৌশলী, ভিডিও এডিটর, কোরিওগ্রাফার, সঙ্গীত আয়োজক সহ আরও অনেক কলাকুশলী। এগুলোর প্রতিটিই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে এ দেশে বেশ ক’জন গুণী নির্মাতা জন্মেছেন। তারা সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় এই দক্ষতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছেন।  কিন্তু টেকসই ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হলে এই জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকতে হয় যা ২০১২ সালের পূর্বে বাংলাদেশে ছিল না। উল্লেখ্য যে, একজন রাজকুমার হিরানি, শুভাষ ঘাই কিংবা সঞ্জয় লীলা বানসালি তৈরিতে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া,পুনে’র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যান্য কলাকুশলীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা টেলিভিশন নাটক এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণে দক্ষ হয়ে তারপর সিনেমা নির্মাণের পথে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীদের অধিকাংশই আসেন ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। যদি প্রথম ছবি হিট হয় তবেই তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পারেন। তবে মঞ্চে বা টেলিভিশন নাটকে অভিনয় দিয়ে শুরু করে বেশ ক’জন শিল্পী সিনেমাতেও ভালো করেছেন। চঞ্চল চৌধুরীর নাম এখানে উল্লেখযোগ্য।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বলিউডের একটি গড়পড়তা ছবিতেই এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘বাজিরাও মাস্তানি’তেই বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা । ৬০ বছর বয়সী ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ কোটি টাকার উপর আয় করেছে মাত্র ৩ টি সিনেমা।  গড়ে একটি সিনেমা বানাতে বাংলাদেশে গড়ে খরচ হয় ৯৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ সুপারস্টার শাকিব খানের একটি ছবি থেকে গড়ে আয় হয় মাত্র ৩৮-৪০ লাখ টাকা। তাই প্রযোজকরা হাত গুটিয়ে নিয়েছেন এই খাত থেকে। একজন প্রযোজকের ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালে ঈদের সিনেমা এবং আয়নাবাজি সিনেমা ছাড়া কোনো সিনেমাই লাভজনক হয় নি। অন্যদিকে, একটি সিনেমা হলে  সিনেমা প্রদর্শিত হলে মোট আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ আসে প্রযোজকের হাতে, ৪০ শতাংশ থাকে হল মালিকদের হাতে আর বাকি ৪০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ যায় সরকারের কাছে। এই আয়ে ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে চলচ্চিত্র খাতে নতুন কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত হলেও প্রযোজকরা কোনো ব্যাংক ঋণ পান না।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমা প্রদর্শিত হয় সিনেমা হলে। কিন্তু এই সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। কারণ একটি সিনেমা হল চালানোর সুযোগ ব্যয় (অপরচুনিটি কস্ট) সিনেমা হল চালানোর তুলনায় অনেক বেশি। সিনেমা হলের পরিবর্তে একটি সুপারমার্কেট স্থাপন করলে সেখান থেকে ঢের বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। ২০০০ সালে যেখানে হলের সংখ্যা ছিল ১২০০, ২০১০ সালে ছিল ৭২২টি আর ২০১৬ সালে হয়েছে মাত্র ৩৩০ টি । এই হারে কমতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো প্রথাগত সিনেমা হল বাংলাদেশে থাকবে না।

সিনেমার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রেও এফডিসি-কেন্দ্রিক মূলধারার সিনেমাগুলোর প্রথাবদ্ধতা দেখা যায়। প্রচারের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় রঙ্গিন পোস্টার। কোনো ইনোভেশন থাকে না সেই পোস্টারে, ৩০ বছরের পুরনো স্টাইল এখনো অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়নাবাজি’র ৩৬০ ডিগ্রি কমিউনিকেশন বাংলা চলচ্চিত্রের বিপণনে একটি আদর্শ হিসেবে থেকে যাবে। এছাড়া ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাজ মাল্টিমিডিয়ার বিপণন কৌশলেও নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটের পেছনে রয়েছে চলচ্চিত্রের বাজার বা দর্শকদের প্রতি সংবেদনহীনতা, চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারে প্রতিষ্ঠানের অভাব, সুষ্ঠু সাপ্লাই চেইনের অভাব, পেশাগত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং সর্বোপরি সরকারের নীতি দূর্বলতা। বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এ বিষয়গুলোর প্রতিটিতেই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে হবে এবং উদ্যোগ নিতে হবে।

 

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply