weekly

বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চার ইতিহাস

রিডিং ক্লাবের ১২৫ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম

লেকচার নোট্স

ধর্ম সম্পর্কিত বিষয়গুলোর নাটকীয় ভঙ্গিতে বর্ণনা দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় প্রায় সবার মধ্যেই। আর এই ড্রামাটিক ওয়েতে বর্ণনা করার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ এই ঘটনাগুলো এতো স্বাভাবিক বা এতো সাধারণভাবে ঘটেনি।

বিশেষ করে আমাদের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রেলিজিয়াস ইভোল্যুশন এর একটা প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটেছে প্রায় দের হাজার বছর আগে। এই পরিবর্তন কোথায় ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এর পরবর্তী দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের নাটুকে বক্তারা  অবহিত নন। কারণ এটা বোঝার জন্য মোস্ট সুপ্রিমলি ইন্টেলেক্চুয়াল হতে হয়। বস্তুত এই ব্যাপারগুলোর সাথে বাংলাদেশের কুরআন চর্চার ইতিহাস সম্পর্কিত। মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে শ্রুতিনির্ভর পড়াশুনার প্রবণতা রয়েছে। শোনাও এক ধরণের পড়া কিন্তু সবচেয়ে নিম্নমানের পড়ার উদাহরণ। কারণ এতে মূল ঘটনার বিকৃতি হতে বাধ্য। ইসলাম ধর্মের যখন কোন হাদিস বর্ণনা করা হয় বা কোন নবী বা খলিফার কোন ইভেন্টস এর বর্ণনা দেয়া হয় তখন নাটকীয় ভঙ্গিতে না গিয়ে আবেগের সাথে সাথে এর সাথে জড়িয়ে থাকা রিস্কটাও জানা দরকার।

আর কেন এই নাটকীয় ভঙ্গিটা আসে, কেন এই ধারা প্রচলিত; কারণ হচ্ছে শুনে শুনে কোন ঘটনা বর্ণনা দেয়া, নিজে না পড়া, কোন সিরিয়াস রিডিং হ্যাবিট তৈরি না করা। আর এই শ্রুতি নির্ভর ধর্ম চর্চা প্রকৃত ধর্মের বাইরে গিয়ে অন্য রকম একটা আচার নির্ভর, কুসংস্কার নির্ভর ধর্ম চর্চায় পরিণত হয়। তাই এই ব্যাপারগুলোতে সতর্ক হতে হবে। যেসব গ্রন্থ থেকে হাদিসের কথা জানা যাচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ও অথেন্টিক অনুবাদ বাংলায় আজো হয়নি। কারণ সবাইতো অনুবাদ ঠিকভাবে করতে পারে না। তাছাড়া সবাই বইটাও ঠিকভাবে জানে না।

ইমাম বুখারীর আট খন্ডে এখন পর্যন্ত একটাই ইংরেজী অনুবাদ বের হয়েছে বছর দশেক আগে তাও আবার ঢাকায় অ্যাভেইলেবল না। বুখারী শরীফের বাংলায় যে কয়টা অনুবাদ হয়েছে তার সবগুলো খন্ডিত; বিছিন্ন, কোন পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ নাই। তাছাড়া এমন অনেক ইমাম বুখারীর অনুবাদ বই পাওয়া যায়, যা কোন বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে তার সোর্সটা পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা ভাষা থেকে অন্য আরেকটা ভাষায় অনুবাদে যে একটা ন্যূনতম আদব আছে তার প্রকাশ খুব কমই পাওয়া যায়। কারণ এই কমিউনিটি ইন্টেলেকচুয়ালী পুওর এবং ডিসঅনেষ্ট। রিডিং স্কলারশীপ ডেভেলপ্ড না হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।

মুসলিম কমিউনিটির মোস্ট স্পেকটেকুলার এন্ড আনপ্রেসিডেন্টাল ফেনোমেনা হচ্ছে খাতেমুন-নাবীঈন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী। এর পরে আর কোন নবী আসবেননা। পবিত্র আল-কুরআন শেষ ঐশী-গ্রন্থ। এর পরে আর কোন ঐশী-গ্রন্থ আসবে না। এটাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ফেনোমেনা মুসলমানদের জন্য। কারণ লক্ষ্য লক্ষ্য বছর ধরে যে ধারাবাহিকতায় প্রত্যেক সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর বা ভাষাভাষীর লোকদের জন্য নবী পাঠানোর প্রচলন ছিল তার পরিসমাপ্তি হয়। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর তামাম জনগোষ্ঠীর জন্য, হাজার হাজার ভাষাভাষী লোকদের জন্য এর চর্চার রূপ কিভাবে নির্ধারিত হবে এই নিয়ে ইন্টেলেকচুয়ালি সিরিয়াস কোন গবেষণা, কোন প্রজেক্ট পাওয়া যায় না। যারা চুপি চুপি বেহেশতে চলে যেতে চায় তাদের সাথে কোন তর্ক নয়। কারণ কোন ভাল কিছু, কোন সুন্দর কিছু সবাই চায়। শুধু মনে রাখায় বিষয় হচ্ছে বেহেশতে যাওয়ার পথ এতো সহজ না। এর পদে পদে বিপদ রয়েছে। যে কোন রিলেজিওন কে চর্চার মধ্যে দিয়ে সুপ্রিম পর্যায়ে যাওয়ার যে পথ, সেই পথে গোপনে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এর জন্য প্রয়োজন “সুপ্রিমেসি অব নলেজ।” নলেজকে বেইজ করে যারা সামনে আগাবে তারাই টিকে থাকবে। কারণ অল কাম্স ফ্রম নলেজ। যেহেতু নবী আর আসবে না সেহেতু যে পাথেয় বা পথ নির্দেশ পরবর্তী সময়ের জন্য প্রদান করা হয়েছে তা কেবল একটা ভাষাতেই চর্চা হবে, এর ভিন্ন ভিন্ন ভার্সন থাকবে না তা পুরোপুরি অমূলক। এটি নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা ডিসকোর্স এখনো তৈরি হয় নি।

বৃহত্তম চারটা ধর্মীয় কমিউনিটির অন্যতম ইসলাম এর প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন এখন বৃহত্তম নলেজ ডিসকোর্স হয়ে ওঠেনি। যেহেতু আর কোন নবী আসবে না তাই এর পরবর্তী যে কোন সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে এর ব্যবহারের ধরণটা কী হবে তা ঠিক করা হয় নি। তাই এর অনুসারীদের নবী ছাড়া চলার জন্য এই কুরআনের চর্চার কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে কুরআন চর্চার ক্ষেত্রে যে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়ার দরকার ছিল, সামাজিক ও সামষ্টিক যে অনুপ্রেরণা আমাদের দেখানো দরকার ছিল তাতে আমরা ব্যর্থ- হয়েছি। নবী করিম (সঃ) এর ইন্তেকালের সাড়ে চৌদ্দশ বছর এর মাথায় যদি বাংলায় ইউসুফ-জুলেখা লেখা যেতে পারে তাহলে কুরআনের বিচ্ছিন্ন অনুবাদ কেন হবেনা। ১২০০-১৮০০ সাল পর্যন্ত শত শত পুঁথি, শত শত কবিতার বই বা লিটারেচার পাওয়া যাবে। এর মধ্যে কোরআনের চর্চা অনুপস্থিত। এই ৬০০ বছরের মধ্যে কোরআন চর্চার অনুপস্থিতি (কোরআন এর কোন অনুবাদ না হওয়া বা খুবই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যা সোসাইটাল কোন ইম্প্যাক্ট রাখতে পারে নি)  আমাদের মতো একটা কমিউনিটির জন্য প্রশ্ন আকারে ধরা দেয়। ১৮০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে কাজগুলো হয়েছে তাও সন্তোষজনক বলে ধরে নেয়া যাবে না। কুরআন অনুবাদের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রায় চল্লিশ বছরে উনত্রিশ-ত্রিশটা অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু এর এডিশন তিন-চার টার বেশি না। যে বই এতো গুরুত্ববহ তার বিক্রি অকল্পনীয়ভাবে কম। ধর্ম বিষয়ে আমাদের যে একটা মেকি অহংকার বা দাবী যে আমরা কোরআন পড়ি এই দাবী খুবই ঠুনকো এবং অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অরিজিনাল লাঙ্গুয়েজে তো নয়ই আমাদের নিজস্ব ভাষায়ও এর চর্চার অবস্থা তথৈবচ।

কোরআন এর ওপর বিষয়ভিত্তিক কাজ করতে হবে। এই কাজ প্রথম করেন ১৯৮৪ সালে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ইনডেক্স এর ভিত্তিতে রচনা করেন “কোরানসূত্র”। ২০০৩ সালে চলিত বাংলায় প্রথম কোরআনের অনুবাদ হয়। যা পঁচিশ বার ছাপাতে হয়। এ থেকে বোঝা যায় মানুষ সহজে তার ধর্মকে বুঝতে চায়। যা অন্য কোন বইয়ের ক্ষেত্রে বিশ বারের বেশি হয়নি। কারণ মানুষ তা গ্রহণ করেনি।

ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন যে সাহস আমাদের দেখিয়ে গেছেন এজন্য তিনি বহুলস্মরণীয়। ১৮৮১ সালে তিনি খণ্ডে খণ্ডে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন। বই আকারে প্রকাশ করেন ১৮৮৬ সালে। এর প্রায় একশত বছর পরে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বই বের হয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে বাংলাভাষায় কোরআন চর্চার বিষয়ে প্রথম পি.এইচ.ডি. করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোঃ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় পি.এইচ.ডি. করেন কুষ্টিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ডঃ আব্দুল অদুদ ভূইয়্যা। তার পি.এইচ.ডি. থিসিস শুরু হয় ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে যা শেষ হয় ২০০০ সালে। প্রায় ১০০০ পৃষ্ঠার এই বইটি ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় “বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চার ইতিহাস” নামে। এতো বড় কমিউনিটির জন্য মাত্র দুইটা পি.এইচ.ডি. যা আমাদের দাবী বা গর্বের জায়গাটা নড়বড়ে করে দেয়। যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত তার ওপর আমাদের যে অমনোযোগিতা তার ইতি টানা দরকার। এই আলোচনা বোধ করি সেই শুরুরই একটা ইনডিকেটর হয়ে থাকবে।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply