Book Review

জেমস জে নোভাকের বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাবের ১২৩ তম পাবলিক লেকচার
প্রবক্তা: তৌফিক আমীর সৌরভ

 

জেমস্ জে নোভাক এর ‘ বাংলাদেশ’ ইজ-আ-গ্রেট-এ্যাডভারটাইজমেন্ট ফর-বাংলাদেশ। নোভাক যেভাবে বাংলাদেশকে বর্ণনা করেছেন তা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সত্যিই অনেক বড় প্রাপ্তি। প্রশংসা অনেক কঠিন কাজ আর এতে অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। এক দেশের হয়ে অন্য দেশের প্রশংসা করলে আপনাকে বলা হবে ঐ দেশের গুপ্তচর। বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়ার কোন অবদানের কথা স্বীকার করলে বলা হবে ইন্ডিয়ান চর। প্রশংসা করতে যেমন উদারতা লাগে তেমনি রিস্ক ও রয়েছে। নোভাক এর সবচেয়ে বড় দুর্নাম হলো, তাকে বলা হতো ’ সি আই এ’র গুপ্তচর। এটা প্রশংসার একটা বাই- লেটারাল প্রবলেম। যাই হোক, নোভাক এর ’ বাংলাদেশ’ হল- বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিচিতি মূলক বই।
এর উদ্দেশ্য হলো, এ দেশের বাইরে থেকে কাজ করতে আসা লোকদেরকে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানানো। এদেশের একটা বড় ক্রাইসিস হলো বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিচিতি মূলক বই (যারা বাইরে থেকে এদেশকে জানতে চায় তাদের জন্য) একজন বিদেশীর লেখা। বাংলাদেশকে নিয়ে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক গবেষণা হয়েছে ”ইউনিভার্সিটি অফ- ক্যালিফোর্নিয়াতে। বাংলাদেশকে কিভাবে চিনতে হবে, বাংলাদেশ সম্পর্কে সবচেয়ে সুন্দর, ও সংক্ষেপে লিখতে পারবে কোন বিদেশী পর্যবেক্ষকই, এদেশের কেউ না- এটা একটা ক্রাইসিস। নোভাক যে কাজটি করেছে এটা যে ভুল হয়েছে তা না, সে মূলত বাংলাদেশে প্রকৃত জন্মগ্রহণকারীর ভূমিকা পালন করেছে। এ কারণে তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এ্যাট দ্যা সেইম টাইম আমাদেরকে বের করতে হবে কেন আমরা এই জায়গাতে ব্যর্থ?

জীবনানন্দকে নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষনামূলক লেখা কোন বাংলাদেশীর নয় একজন আমেরিকানের। ক্লিনটন বি সিলি। সেই বই লেখার চার বছর পর তা অনুবাদ করেছে ’প্রথমা’। অনুবাদ করার ও লোক নাই। দ্যা নেশন ইজ-পুওর। কেবল যে ইকোনোমিক্যাল পুওর তা নয়। ইন্টেলেকচুয়ারি এই নেশন ট্রুলি পুওর।

১৯৪৭ সালে নোভাক এর মেজো ভাই ঐ দেশের নটরড্যাম কলেজের সেমিনারিতে ভর্তি হতে যান। ঐ কলেজের সামনে ম্যুরাল দেখে মাত্র আঁট বছর বয়সে নোভাকের মনে ছাপ পড়ে যায়। যে ম্যুরাল এর সাথে বেঙ্গলের ঐত্যিহ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আট বছর বয়সেই বেঙ্গলের একটা চিন্তা ঢুকে গেল। পরবর্তীতে ঐ মেজো ভাই এই তৎকালীন ইষ্টপাকিস্তানে কাজের জন্য আসেন যার পরোক্ষভাবে মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মপ্রচার। নোভাক এর ’বাংলাদেশের উপর যে ইনভেষ্টমেন্ট এই-ইনভেষ্টমেন্ট এর জন্য হি ইজ দ্যা বেষ্ট পার্সন টু রাইট “বাংলাদেশ”। নোভাকের ভাই রিচার্ডকে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে ১৯৬৪ সালে। আধ্যাত্মিক ও বাস্তবতার এক অদ্ভুত মিশেল পাওয়া যায় নোভাকের মধ্যে। নোভাক প্রমাণ করেছেন জন্ম গ্রহণ করলেই দেশ নিজের দেশ হয় না। জন্ম গ্রহণ করলেই দেশকে ভালবাসা যায় না। নোভাকের বাবা রিচার্ডের ছুরিতে আহত হওয়ার স্বপ্ন আগেই দেখেছিলেন। ১৯৬৪ সালে যখন সত্যি তার ভাইকে ছুরি দিয়ে মারা হয় তারা বাবা তখন ফোন করে নোভাককে জানায়। নোভাকে আগেই রিপ¬াই করে তাকে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে কিনা যা তার বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন। একটা প্যারসাইকোলোজিকাল কানেকশন ছিল তাদের মধ্যে।
আমাদের মতো বিছিন্ন এবং প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠীর সাথে মেইনস্ট্রিম এর একজন মানুষের আ্যাসোসিয়েটেড হয়ে যাওয়ার ঘটনা অভিভূত হওয়ার মত। পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আসা, টানা ত্রিশ বছর ব্যাপী প্রতিবছর একবার আসা, এসে তিন-চার মাস থাকা। এভাবেই কানেকশন তৈরি হয়ে গেছে। এবং তারই ভাইয়ের ছেলে ১৯৯২ সালে ইউএস এ্যাম্বাসির হয়ে নতুন চাকুরী নিয়ে এসেছে। একই ফ্যামিলির দুইটা জেনারেশনের তিনটা প্রজন্ম কোন একটা দেশের সাথে জড়িত হয়ে গেল। এই জন্য বলা যায় নোভাক যে চোখে বাংলাদেশকে দেখেছে তা কোন অরডিনারি ফরেইনারের চোখে দেখা বাংলাদেশ নয়, একটা দেশে জন্ম না নিয়েও ঐ দেশের ভেতরগত যে অনুভূতি দিয়ে নিজে অবগাহিত হওয়া বা অনুভব করা সেই অনুভবের যে স্মৃতি তাই ফুটে উঠেছে ” বাংলাদেশ” এ। আমরা যারা দেশপ্রেমকে নিজেদের রাইট মনে করি তাদের জানা উচিত যে দেশপ্রেম জন্মগত কোন অর্জন নয়। ঐ দেশকে ভালবাসা ঐ ল্যান্ড কে ভালাবাসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে ভালবাসা মানে হচ্ছে এর প্রত্যেকটা পরতকে জানা, এর স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, জনগোষ্টীর মিথকে জানা, নোভাক এর ”বাংলাদেশে” এ পরতে পরতে এই জানারই চেষ্টা চলেছে।
আধুনিক কালে আমাদের বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যতের সুন্দর জীনব যাপন নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন কিছুর জন্য এক্সট্রিমিটি না। সব বিষয়ে একটা ইনটেলেক্চুয়াল এ্যানালাইসিস এবং একটা ইসক্রুটিনিটির পর সবচেয়ে বেষ্ট মেথড টা বেছে নেয়া। ফলে নোভাকের এই বাংলাদেশকে হাইলি রেকমেন্ডেট বই বলা যায়। বাংলাদেশ সম্পর্কে যারা ইন্ট্রোডাকশন পেতে চায় তাদের জন্য এটা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশকে খুব ভালভাবে বোঝা যায় যারা বাংলাদেশের না তাদের লেখা পড়ে, প্রায় পঞ্চাশটা বইয়ের মধ্যে মূলত তিনটা বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশকে বিভিন্ন এ্যাঙ্গেল থেকে বোঝার জন্য। বাংলাদেশের মানুষ, এর বিবর্তন এর উত্থান পতনকে বোঝার জন্য নোভাক এর ’ বাংলাদেশ’। এর পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি কিভাবে তৈরি হয়েছে, বিবর্তন হয়েছে তাহলে লরেন্স জায়ারিং এর ’ “বাংলাদেশ, ফ্রম মুজিব টু এরশাদ এরা” আর একটা হল ২০০৭ সালে প্রকাশিত ভিলেম ভ্যান শেন্ডেল এর ”বাংলাদেশ আ শর্ট হিষ্ট্রি। এটা একটা প্রাইমারী এবং পাঠ্যপস্তক হওয়া উচিত। কারণ এটাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে এতো সুন্দর ভাবে প্রাইমারি টেক্সট আকারে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন এর চেয়ে সহজ সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি আর হয় না একটা দেশকে বোঝার জন্য।

আরিফ খানের বক্তব্য

নোট নিয়েছেন: তাসমিয়া জাহান তন্বী

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply