Browsing Category

weekly

News weekly

জ্ঞানের অভাবেই বাংলাদেশে পপুলার আর্ট সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

জ্ঞানগত সংকটের কারণেই আমরা জনপ্রিয় ধারার শিল্পকলা সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে চরম অসচেতনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। সামষ্টিক জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সচলতাই আমাদের এই জাতিগত অপিরণামদর্শিতা থেকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স হলরুমে আয়োজিত রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের  ২৭৭ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে উপরোক্ত মন্তব্য করেন বক্তা শিল্পী শাওন আকন্দ। লেকচারের বিষয় ছিল পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ : স্পেশাল ফোকাস অন রিকশা পেইন্টিং এ্যান্ড সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির বিকাশ-পরবর্তী বিশ্বায়নের পৃথিবীতে শিক্ষিত উচ্চকোটির শিল্পচর্চার বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা-ঘনিষ্ঠ শিল্প-সংস্কৃতির ধারা, তাদের শিল্পবোধ, সংস্কৃতি-সচেতনতা এবং শিল্পকর্মে তাদের জীবনের প্রতিফলন- এই হল পপুলার কালচারের আপাত:পরিধি। কিন্তু সাধারণের সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতার কারণেই সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং এবং রিকশা পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা-গবেষণায় আমরা আগ্রহী নই। অথচ এগুলো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

সিনেমা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সিনেমা পেইন্টিং-এর ইতিহাস প্রায় একশ বছরের। রবি বর্মা, বাবুরাম পেইন্টার প্রমুখ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর হাতে সিনেমা ব্যানার শিল্পের আদি ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের  যাত্রা শুরু হওয়ার পর সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ের বিকাশের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে আসা অবাঙালি মুসলমানরা। নিতুন কুণ্ডের মত প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরা যুক্ত হলেও নিম্নবর্গের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরাই ছিলেন এই শিল্পের প্রাণ। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই অনন্য ধারা আজ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর সংরক্ষণে আমাদের ন্যূনতম উদ্যোগ নেই। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন গবেষণা হয়নি, এর পরে যা হয়েছে তা অপ্রতুল। ন্যাশনাল ফিল্ম  আর্কাইভে সিনেমা ব্যানার পোস্টার সংরক্ষণ করা হয় না। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য নেই কোন উদ্যোগ।

রিকশা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, রিকশা পেইন্টিং গ্রামে দেখা গেলেও তা প্রধানত নাগরিক নিম্নবিত্তের শিল্পকলা। রিক্সার উদ্ভব জাপানে। ১৯৪০-এর দশকে বাংলাদেশে রিক্সার  প্রচলন ঘটে। বিষয় অনুষঙ্গ, রঙের ব্যবহার ইত্যাদি দেখে ধারণা করা যায় রিক্সা আর্টেও অবাঙালি মুসলমানদের অবদানই প্রধান। এই শিল্পের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার কোন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। রিক্সা আর্টের বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ- সিনেমার নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে তাজমহল, বোরাক, মরুভূমি, টাইটানিক, পশু-পাখি, হেলিকপ্টার, সমুদ্র, শহরের ছবি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক অবিচার, আলাদীনের দৈত্য কিংবা ইরাক যুদ্ধ। সমসাময়িক সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও উঠে এসেছে কখনো। যেমন- এরশাদের  স্বৈর শাসনামলে রিক্সায় মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে, রিক্সা আর্টে দেখা গেছে মানুষের বদলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে সিংহ। রিক্সা আর্ট নিয়ে গবেষণায় যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তার কারণ বিদেশিরা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নয়, রিক্সা আর্ট-এর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা জাপানে- এ আমাদের জন্য অপমানজনক।

বক্তব্যের উপসংহারে তিনি বলেন,  সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ও রিক্সা পেইন্টিং- দুটি শিল্পই আজ বিপন্নপ্রায়। অথচ এগুলোর সংরক্ষণ এবং এই বিষয়ক গবেষণায় আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যৎসামান্য। অথচ এই শিল্পগুলো আমাদের সামজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যরকম বয়ান শুধু নয়, তা আমাদের মূলধারার শিল্পচর্চাকেও সমৃদ্ধ করছে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই ঔদাসীন্য, এই আত্মঅবমাননার বীজ আমাদের সংস্কৃতির গভীরে নিহিত। জ্ঞানগত সংকট নিরসনের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভবপর হবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম বলেন, পপুলার আর্ট বা জনপ্রিয় ধারার শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও সংরক্ষণে ব্যর্থতার মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা। একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য এই শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণ জরুরি ।

সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের হেড অব রিসার্চ ও ট্রান্সলেশন ডিভিশন রাশেদ রাহম বলেন, পপুলার কালচার বৃহত্তর অর্থে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। এসব ডিসিপ্লিনে আমাদের অবদান প্রায় শূন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘প্রেসক্রাইব্ড বুকস’-এর ৯৫% উৎপাদিত হয় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হীনম্মন্যতার কারণ তাই আমাদের জাতীয় জ্ঞানকাণ্ডের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিশীল হলেই জাতীয় সমৃদ্ধির পথ রচিত হবে।

weekly

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৭তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

বক্তা

শিল্পী শাওন আকন্দ

পরিচালক, যথাশিল্প (সমকালীন ও ঐতিহ্যবাহি শিল্প কেন্দ্র)

সময় ও স্থান

 বিকাল ৪.০০-৬.০০ শনিবার, তারিখ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সিনেপ্লেক্স হলরুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চারুকলার ধারার পাশাপাশি একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাও গড়ে ওঠে। এর নেতৃত্ব দেন পীতলরাম সুর, আর কে দাস, আলাউদ্দিন, আলী নুর, দাউদ উস্তাদ প্রমুখ শিল্পী। এসব প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর মাধ্যমেই বিকশিত হয় এ দেশের সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং, রিকশা আর্ট ইত্যাদি।

সিনেমার ব্যানার বলতে আমরা এখন যা বুঝি অর্থাৎ কাপড়ের উপরে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রায়শই অতিরঞ্জিত প্রোট্রেট কিংবা ফিগার এবং গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সিনেমার নাম ও অন্যান্য তথ্য। এই ধরণের কাজের সূত্রপাত দেশভাগের পর থেকেই হয়েছে।

দেশভাগের আগে ঠিক এই ধরণের সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর প্রচলন না থাকলেও, প্রচারণার তাগিদে প্রেক্ষাগৃহের নির্দিষ্ট দেয়ালে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি ও সিনেমার নাম বড় বড় করে লেখার প্রচলন ছিল। আমরা এই ধরণের কাজকে বলতে পারি সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর আদি রূপ। দেশভাগের আগে তিরিশ ও চল্লিশের দশকে, ঢাকার প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে এই ধরণের ছবি আঁকার কাজে যুক্ত ছিলেন এমন  অন্তত একজন শিল্পীর নাম জানা যায়। তিনি শাঁখারী বাজারের পীতলরাম সুর (১৯০২-১৯৮৭)। ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকায় মায়া (স্টার) সিনেমার হলের কাছাকাছি অঞ্চলে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘আর্ট হাউজ’ ছিল বলে জানা যায়। এমন কি পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। উদাহরণ হিসাবে বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্কর নিতুন কুন্ডু (১৯৩৬-২০০৬) এবং বর্তমানে চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান (জ. ১৯৩৯)-এর নাম উল্লেখ করা যায়।

দেশভাগের পর বিপুল সংখ্যক অবাঙ্গালী মুসলমান কোলকাতা ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এদের অনেকেই কোলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং কিংবা এ ধরণের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত: এদের হাত দিয়েই বাংলাদেশে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর সূত্রপাত। দেশভাগের পর কিংবা ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর কোলকাতা থেকে যারা ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেন তাদের অনেকেই এই স্টুডিও/কারখানাগুলোতে কাজ করতো।

তবে ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর ইতিহাসে আরেকজন পথিকৃৎ এর সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম মোহম্মদ সেলিম (পরে ‘মুনলাইট’ সিনেমা হলের মালিক)। মোহম্মদ সেলিম  এসেছিলেন কোলকাতা থেকে। তার আদি নিবাস ছিল বোম্বে। ১৯৪৮ থেকে তিনি ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর কাজ শুরু করেন তার বাসায়, র‌্যাংকিন স্ট্রীটে। এই সেলিমের কাছ থেকে কাজ শিখে পরবর্তী পর্যায়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন অনেকেই। এদের মধ্যে গুলফামের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। (গুলফাম এবং মোহম্মদ সেলিম দু’জনই মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে চলে যান।)

রিকশা আর্ট

নিজস্ব শিল্পশৈলী, উপস্থাপন রীতি ও বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে সুধীজনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো রিকশা আর্ট। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের সুসজ্জিত ও চিত্রিত রিকশা সংগৃহীত আছে।

মূলত চাকা আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে রিকশা নামের এই বাহনের সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ১৮৭০ সাল নাগাদ। অবিভক্ত বাংলায় প্রথম রিকশার প্রচলন ঘটে কলকাতায়, বিশ শতকের প্রথম ভাগে। কাছাকাছি সময়ে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রিকশার প্রচলন হয় প্রথমে ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে এবং পরে ঢাকায় (১৯৩৮)। তবে বাংলাদেশে প্রচলন ঘটে সাইকেল রিকশার, মানুষে টানা রিকশা নয়। বাহারি ও শৌখিন পরিবহন হিসেবে ঢাকায় রিকশার আগমন ঘটে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর। মূলত রিকশা পেইন্টিংয়ের সূত্রপাত হয় এই সময় থেকেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে রিকশা পেইন্টিং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় হতে থাকে। বাংলাদেশে রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রবীণ ও বিখ্যাত শিল্পী যেমন- আর কে দাস, আলী নূর, দাউদ উস্তাদ, আলাউদ্দিনসহ অন্যরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই রিকশা পেইন্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন।

রিকশা আর্টের মূল লক্ষ্য রিকশাকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করা। সাধারণত শিল্পীরা মহাজন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ছবি এঁকে থাকেন। তবে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে রিকশা পেইন্টিং করা হয়েছে। যেমন- ষাটের দশকে রিকশা পেইন্টিং করা হতো মূলত শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে। আবার সত্তরের দশকে নতুন দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন  কাল্পনিক শহরের দৃশ্য আঁকা হতো রিকশায়। পাশাপাশি সব সময়ই গ্রামের জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও আঁকা হতো, এখনো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টাইলের ফুল, পাখি ইত্যাদি তো আছেই।

 

News weekly

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রেস রিলিজ

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি। গ্রামের ইতিহাস হিসেবে যা লেখা হয়েছে তা মূলত জোতদার শ্রেণি ও ক্ষমতাশালীদের ইতিহাস। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, কৃষকদের ইতিহাস সেখানে উঠে আসেনি যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ডাচ গবেষক ভেল্যাম ভ্যান শেন্ডেলের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণা সম্পর্কিত আলোচনায় তার  বরাতে উপরোক্ত মন্তব্য করেন রিডিং ক্লাবের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের প্রবক্তা আতাউর রহমান মারুফ।

বাংলাকে “সোনার বাংলা” বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে একজন বিদেশী ইবনে বতুতার। তিনি বাংলায় জিনিসপত্রের প্রতুলতা ও এর দাম সস্তা  বলে এই নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় গবেষকগণ অবশ্য সোনার বাংলাকে ‘মিথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রবক্তা ইবনে বতুতার সূত্র ধরে বিদেশী পণ্ডিতদের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর। কিন্তু বঙ্গদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের গবেষণাধর্মী কাজের সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে। স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারের “A Statistical Account of Bengal”-সহ অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থ এখনো বঙ্গদেশ বিষয়ক গবেষকদের জন্য অবিকল্প প্রামান্য গ্রন্থ। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট জি. সেক ১৯০৬-১৯১০ সময়কালীন ফরিদপুরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল- “The Economic Life of a Bengal District”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্বক গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে নেদারল্যান্ডের নাগরিক ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় উপেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাছাড়া, তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামজিক অবস্থা, নৃতাত্বিক বিবর্তনসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

তাঁর “A History of Bangladesh” বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল এ বইটির রিভিউতে বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কাজগুলো হয়েছে তার মধ্যে এটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। ভ্যান শেন্ডেলের ১২টি বই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক বই ছয়টি। তাঁর মৌলিক গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থ সাতটি ।

শেন্ডেল বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের গতিশীলতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। আমাদের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। আমাদের নীল অর্থনীতি (নীল চাষ) সম্পর্কে গবেষণা  করেছেন । পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশে রেশম শিল্প সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে কিন্তু রেশম নীতি সাধারণ মানুষকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে- এ সম্পর্কে কোন গবেষণা হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন।

শেন্ডেলের ১৯৮১ সালে প্রকাশিত  “Peasant mobility : The Odds of Life in Rural Bangladesh Studies of Developing Countries” বইতে আমাদের কৃষক পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কৃষকের পরিবার ও তাদের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা হয়নি । ১৮৮০-১৯৮০ এই একশত বছরের কৃষক গতিশীলতার  ইতিহাস তাঁর বইয়ে আলোচিত হয়েছে।

২০০০ সালে  শেন্ডেলের  “Chittagong Hill Tracts: Living in Borderland”  বইটি প্রকাশিত হয় । বইটিতে তিনি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বইটি লেখার কারণ  হল পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশে সর্বদা উপেক্ষিত হয়েছে। শেন্ডেল এই বইয়ের জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ টি সূত্র থেকে ছবি সংগ্রহে করেছেন ।

শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা অপর্যাপ্ত। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করলে, আরো নতুন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কিন্তু একইভাবে নাইজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ  ব্যর্থ হয়েছে কেন? এ বিষয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে অন্য গণহত্যার সম্পর্ক বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সাধারণ মানুষের ইতিহাস লেখার চেষ্টা তার অন্যতম বড় গুণ।

সবশেষে বক্তা শেন্ডেলের বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদের কথা বলেন। শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি, যারা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র  হিসেবে গড়ে তুলবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম শেন্ডেলের বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ-কেন্দ্রিক গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, তাঁদের গবেষণায় প্রান্তে বসবাসকারী মানুষরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু শেন্ডেল এই প্রান্তিক মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন । তিনি কৃষকদের নিয়ে, আদিবাসী নিয়ে এবং সীমান্ত নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের  সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আদিবাসীদের সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তিনি এও বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবিক তা বোঝা যায়, সেই রাষ্ট্র তার প্রান্তিক জনগণের প্রতি কতটুকু আন্তরিক- তার উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লিপিকা বিশ্বাস অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে জিডিপি-নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, জিডিপি কার বৃদ্ধি পাচ্ছে? ধনী আরো ধনী হচ্ছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সমাজে অর্থনৈতিক  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জামশেদ সাকিব তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা  করেন। রাশিয়ায় ১৩-১৪ বছরের পূর্বে কেউ কৃষির উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত হয় না । কিন্তু বাংলাদেশে ৬ বছর বয়স  পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া শুরু করে । ফলে সে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

শেন্ডেল রচিত বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনালোচিত অনুষঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেন তুহিন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ১৮ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেয়া ত্রিপুরার অবদান অনালোচিত । ত্রিপুরার মেলাঘয়ে সেনাবাহিনী সদস্যেদের প্রশিক্ষণের ঘটনাও অনালোচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করার প্রয়োজনীয়তা কথা বলেন তিনি।

শেন্ডেল বিষয়ক আলোচনার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। আমরা কতটা অথর্ব শেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে তা বোঝা যায় । কারণ একজন বিদেশী আমাদের কাজ করে দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারিনি। সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন । তিনি বলেন, শেন্ডেলের বইয়ের প্রচ্ছদে একজন রিকশাওয়ালার ছবি। তাঁর মতে রিকশাওয়ালারাই বাংলাদেশ । কারণ বাংলাদেশে রিকশাওয়ালারা খণ্ডকালীন বেকারত্ব লাগব করতে শহরে আসে। আবার কৃষি কাজের সময় গ্রামে চলে যায় । অর্থাৎ সে গ্রাম ও শহর দু’জায়গায়ই বসবাস করে। আরিফ খানের মতে, শেন্ডেল রিকশাওয়ালার মাধ্যমেই  Making sense of contemporary Bangladesh বোঝাতে চেয়েছেন । শেন্ডেল তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ঋণী করে ফেলেছেন। কারণ তাঁর কাজগুলো আগামী ৫০-১০০ বছর পরে হলেও আমাদেরকে করতেই হত। কিন্তু শেন্ডেল তা আগেই করে আমাদেরকে ঋণগ্রস্ত করেছেন ।

একটি জাতির বোধোদয় হয় তার ইতিহাস জানার মাধ্যমে। আমাদের ৫২-র ফেব্রুয়ারীর বীজ বেড়ে উঠতে ৮০০ বছরের অধিক সময় লেগেছে। পৃথিবীতে বহু ভাষা, জাতি বিলুপ্ত হয়েছে । বাঙালি জাতির টিকে থাকার রহস্য জানা যায়  শেন্ডেলের কাজের মাধ্যমে। আমাদের দুর্বলতা বোঝার জন্য আমাদেরকে শেন্ডেলের কাজের দিকে তাকাতে হবে।

 

weekly

ভ্যান শেন্ডেল-এর বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাবের ২৭৬ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ
স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

বাংলাদেশের সাথে ভেলাম ভ্যান শেন্ডেলের (জন্ম:১৯৪৯) পরিচয় অনেকটা আকষ্মিকভাবেই। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র (আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস) হিসেবে সেসময় নিয়ম ছিল নিজের সমাজের বাইরে অন্য কোন সমাজ নিয়ে গবেষণা করা। ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশকে নির্বাচন করেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশে আসেন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আক্রোশে অনাহারে মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। এই দুর্ভিক্ষ চট্টগ্রামের অধ্যাপক ড. ইউনূসের চিন্তাজগত পাল্টে দিয়েছে। অর্থনীতির তত্ত্ব ছেড়ে তিনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। সিলেটে, রংপুরে আবেদ ব্র্যাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। রংপুরে গড়ে উঠেছিল স্বনির্ভর আন্দোলন। বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যমী তরুণরা বিভিন্নভাবে কাজ করেছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের প্রকট প্রভাব সত্ত্বেও শেন্ডেল বাংলাদেশের বাতাসে এক ধরণের আশাবাদের, পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের এই দুঃসময়ে শেন্ডেল নিজেও বিপদে পড়েছিলেন। সেসময় সরকার ৫০০ টাকার নোট বাতিল করে দেয়। তার কাছে ছিল সব ৫০০ টাকার নোট। মূহুর্তের মধ্যেই তিনি কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। গ্রামের মানুষেরাই তাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। গ্রামবাসীর আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেমে পড়ে যান। প্রান্তিক জনজীবনের ইতিহাস রচনার উপর তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কারণ তারা সবসময় উপেক্ষিত। অথচ এরাই সমাজের প্রাণ। তিনি বলেন, ইতিহাসের চাকা ঘোরানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি, যা আমরা প্রায়ই অনুধাবন করি না। শেন্ডেল বাংলাদেশী সমাজের শেকড়ের সন্ধান করেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ এবং ইতিহাসের এমন বিষয় নিয়ে চর্চা করেছেন, যা সাধারণভাবেই অনুল্লেখিত। একারণেই আমরা শেন্ডেলের নিকট ঋণী।

শেন্ডেল বাংলাদেশ নিয়ে গোটা দশেক বই লিখেছেন। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ইতিহাস রচনার মাধ্যমে শুরু করেন(Peasant Mobility,1993)। সেখানে চেষ্টা করেন কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ গ্রাম ভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস রচিত হয়নি, হয়েছে মূলত গ্রামের জোতদার, জমিদার, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ইতিহাস। শেন্ডেল তাঁর গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ফলে অবহেলিত-শোষিত মানুষই তার গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। The Chittagong Hill Tracts: Living in the Boarderland (2000,UPL ) নামক পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি আলোকচিত্রভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক বই লিখেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করে এ অঞ্চলের গত একশ বছরের দুঃস্প্রাপ্য ইতিহাস রচনা করেন ।

১৮২৪ সালের দিকে পাগলপন্থি নামক ময়মনসিংহের শেরপুরের একটি সম্প্রদায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। বাংলার ঐ এলাকাটি তখনো ব্রিটিশদের পুরোপুরি শাসনে আসেনি। বড় বড় জোতদার আর ভূস্বামীরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। কৃষকরা স্থানীয় জোতদার আর ব্রিটিশ সৈন্য উভয়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাগলপন্থিদের নেতা টিপু পাগল আর তার মায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ আর নারীনেতৃত্বের ভূমিকা শেন্ডেলকে কৌতুলহলোদ্দীপক করে তোলে (Madmen’ of Mymensingh: peasant resistance and the colonial process in eastern India, 1824-1833, 1985)

১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রানসিস বুকাননকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় পাঠিয়েছিল, এ এলাকাটিতে  আরো লাভজনক মশলা উৎপাদন করা যায় কি না তা সরেজমিনে যাচাই করে দেখতে। বুকানন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। বুকানন ভ্রমণের সময়  এসব অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন, ভাষা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন তার বইতে। এই ডায়েরিটি বাংলাদেশের  দক্ষিণ পূর্ব এলাকার সবচেয়ে পুরনো লিখিত দলিল। কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ এটি জানত এবং কখনো প্রকাশিত হয়নি। শেন্ডেল এই ডায়েরিটি ভূমিকাসহ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৯৯২ সালে এটি প্রকাশিত করেন। (Dokkhinpurbo Banglay Francis Buchanan, 1994)

রেশম শিল্প নিয়ে তাঁর গবেষণায় তিনি বাংলার অতি প্রাচীন এই গ্রামীন শিল্পের সঙ্গে এ দেশের উন্নয়ন নীতিমালার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। সেই হিসেবে এ কাজটিকে এ অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ইতিহাসও বলা যেতে পারে। উন্নয়ন একটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হলেও অবাক ব্যাপার হল, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া নিয়ে এ অঞ্চলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। এই বইয়ে উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ অবধি রেশম শিল্পকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন, কী করে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের পৌনঃপুনিক ভুলের কারণে এ অঞ্চলের এমন একটি সমৃদ্ধশালী শিল্পের পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাঁর একটি গবেষণার বিষয় সময়, যেখানে তিনি বলেন বাংলাদেশ খুব ব্যতিক্রমীভাবে একটি সময়-সমৃদ্ধ (Time-Rich) দেশ। ইউরোপীয় সমাজ যেখানে একটি সময়কাঠামোতে চলে সেখানে বাংলাদেশী সমাজ অনায়াসে তিনটি সময়কাঠামো বজায় রেখেছে। সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামো হলেও এ দেশে বাংলা, ইংরেজি এবং ইসলামি এই তিন রকম ক্যালেন্ডারই ব্যবহৃত হয়। খাসিয়াদের ৮ দিনে সপ্তাহ। বাংলাদেশের মানুষ এই বিভিন্ন ধরণের সময়কাঠামো যেভাবে তাদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ব্যবহার করে, তা  পর্যবেক্ষণ করেলে এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পদ্ধতি , ক্ষমতাকাঠামোর খেলা, পরিচয়ের সংকট এসব নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।

দি বর্ডারল্যান্ড: বিয়ন্ড স্টেট অ্যান্ড নেশন ইন সাউথ এশিয়া’ বইয়ের বিষয়বস্তু হলো ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট বাংলাদেশ, ভারত এবং বার্মার সীমানা। দেশভাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও সীমানার ইতিহাস নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। সীমান্তরেখা সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবনে কী পরিবর্তন হল, কী করে তারা অলক্ষ্যেই প্রভাবিত করলেন রাষ্ট্রকে। তিনি দেখিয়েছেন সীমান্ত এলাকার ইতিহাস রচনা করতে গেলে সীমান্তের দু দিকের দেশ নিয়েই গবেষণা করতে হবে। সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবন এবং কর্মকা- খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নীতিনির্ধারক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সামান্য মনযোগ দেন।

শেন্ডেলের সব কাজের একটি সমন্বিত রুপ পেয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ‘A History of Bangladesh’ বইতে। বইটি ২০১২ সালে চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তিনি মূলত বর্তমান বাংলাদেশকে বুঝতে চেয়েছেন। তার ভাষায় এই বইয়ের উদ্দেশ্য হল- Make sense of Contemporary Bangladesh । এজন্য এ অঞ্চলের ইতিহাস বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। শেন্ডেল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বর্তমান বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এর আগের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ছিল সম্পাদিত এবং ইনসাইক্লোপেডিক ধরনের। কিন্তু এগুলোর সমন্বিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ছিলনা। একই সাথে অধিকাংশ ইতিহাস হয়ত নির্দিষ্ট ঘরানার অথবা জাতীয়তাবদী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই বইয়ের লেখক এসব ত্রুটিমুক্ত হয়ে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখিয়েছেন।

৩৪৭ পৃষ্ঠার মূল বইটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা। এতে ২২টি চ্যাপ্টার রয়েছে। বইটি চারটি বৃহৎ ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইকোলজি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি। প্রথম ভাগে তিনি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠনপ্রক্রিয়া- যেমন মাটি, পানি, বনজঙ্গল, শহর ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।  তিনি এটাকে বলছেন ‘বেঙ্গল ডেলটা’ যার সঙ্গে অনেকাংশে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলের মিল রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ধ্বংসাত্বক এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়ার ফলে এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য তৈরী হয়েছে। রিচার্ড ইটনের ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি এ অঞ্চলের কৃষি, ধর্ম, ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন সীমারেখার (Frontier) বর্ণনা ও তুলনামূলক আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় ভাগে মোগল আমল থেকে বৃটিশ শাসন, ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব এবং পরের ভাগে দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ ভাগে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সর্বশেষ ভাগে তিনি বর্তমান (২০০৭) বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ভ্যান শেন্ডেল মূলত একজন তুলনামূলক ইতিহাসবিদ হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশে এরকম ইতিহাস চর্চা খুবই বিরল। তার মতে, ইতিহাস চর্চার তাত্ত্বিক যে নতুন ধারাগুলো আছে, যা বাংলাদেশে বিশেষ আলোচিত নয়, সেসব ধারায় এখানে গবেষণা হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে যদি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে রেখে একটা তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হলো,  একই সময়ে বায়াফ্রার (নাইজেরিয়া) মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হলো কেন? একাত্তরের গণহত্যার  সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর আর সব গণহতার (রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া) কী তুলনামূলক সম্পর্ক।”

শেন্ডেল মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসের নবদিক উন্মোচনকারী ইতিহাসবিদ। তিনি চেষ্টা করেছেন বড় বড় জাতীয় বীরের বদলে সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে, যাতে বাংলাদেশের জটিল ইতিহাসকে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়। তিনি সবসময় চমকিত হয়েছেন এদেশের মানুষের অঢেল জীবনীশক্তি দেখে। অসম্ভব বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে এখানে সাধারণ মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় কিন্তু এর মাঝেই তারা ধরে রেখেছে অসীম সাহস, আন্তরিকতা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্বল। যেমন ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তা আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে পারেনি। বাংলাদেশের অসাধারণ মানবিক সম্ভাবনা রয়েছে আবার সেই সম্ভাবনার সীমাহীন অপচয়ও হচ্ছে। তবুও সবশেষে তিনি তরুণদের উপর ভরসা রেখেছেন। ইতিহাস নিয়ে তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 সূত্র:

  1. শাহাদুজ্জামান, কথাপরম্পরা, পাঠক সমাবেশ,২০০৭, ভ্যান শেন্ডেলের সাক্ষাৎকার, পৃ: ১১২-১২৫
  2. Willem Van schendel, A history of Bangladesh, Cambridge University Press,2009
  3. Iftekhar Iqbal, “A Long view of Bangladesh”, Economic & political weekly, August 2009, Vol XLIV no 34, p:32-34
weekly

মাহমুদুল ইসলাম:সংবিধানে সমাধিস্থ জীবন

Photo credit: lawpediabd.com

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৫তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

মাহমুদুল ইসলাম (১৯৩৬-২০১৬)

সংবিধানে সমাধিস্থ জীবন

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম, নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক লিগ্যালইস্যু

তারিখ: ০৪ আগস্ট ২০১৭

স্থান: সিনেপ্লেক্স হল, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রভিত্তি নির্মাণে যে সকল মহৎ ব্যক্তিত্ব অলক্ষ্যে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। তিনি শুধু একজন আইনজীবী ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান আইনজ্ঞ। স্বাধীন আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল কিংবা অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে গত পাঁচ দশকের বাংলাদেশের প্রায় সব যুগান্তকারী সাংবিধানিক মামলার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য তৈরি করে দেশে সাংবিধানিক আইন ও সাংবিধানিকতা বিকাশে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাজীবনে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা, আইনি প্রজ্ঞা, দেশ ও জনগণের প্রতি অকুণ্ঠ নিবেদন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণের কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনব্যক্তিত্ব, বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থার প্রতীক।

১৯৩৬ সালের ২৪ জুলাই রংপুরের এক আইনজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাহমুদুল ইসলাম। তাঁর পিতা রংপুরের বিখ্যাত আইনজীবী খান সাহেব আজিজুল ইসলাম ও মাতা জাহানারা ইসলাম। মাহমুদুল ইসলামের প্রপিতামহ মো. আশরাফ উদ্দিন ও মামা আজিজুল হক রংপুর বারের খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবন রংপুরে অতিবাহিত হয়। মাহমুদুল ইসলামের পেশা নির্বাচনে বৃহত্তর পারিবারিক পরিমণ্ডল প্রভাব ফেলেছিল। মাহমুদুল ইসলাম ১৯৫১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি বি.এ. পাস করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ এবং ১৯৫৯ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এলএলবি ডিগ্রি র্অজন করেন। আইনপেশায় প্রতিষ্ঠা অর্জনের বেশ কিছুকাল পরে ১৯৭৯ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অধ্যয়ন করে আইনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এই কোর্সে তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল Estoppels against Government

১৯৫৯ সালে তিনি শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে রংপুর বারে যোগদান করেন। ১৯৬১ সনের জুন মাসে মাহমুদুল ইসলাম আইনজীবী হিসেবে সনদ র্অজন করেন এবং রংপুর জেলা জজ আদালতে আইন প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর আইনজীবী পিতা খান সাহেব আজিজুল ইসলামও সেখানে প্র্যাকটিস করতেন। পিতার পরিচিতির সুবাদে রংপুর বারের প্রবীণ আইনজীবী বিজয় চন্দ্র মৈত্র, শীতল রায় চৌধুরী, শীবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জুনিয়র হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন মাহমুদুল ইসলাম। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে তিনি তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের সনদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি আপীল বিভাগে প্র্যাকটিসের অনুমতি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি সিনিয়র অ্যাডভোকেটের সম্মানে ভূষিত হন এবং আমৃত্যু আইনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের আইনজীবী ক্যারিয়ারে মাহমুদুল ইসলাম অনেক মামলা পরিচালনা করেছেন। তাঁর পরিচালিত অনেক মামলার রায়ে সুপ্রীম কোর্ট আইনের নতুন নীতি নির্ধারণ করেছে। এ ধরনের কয়েকটি মামলা হলো- ড. নুরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ (৩৩ ডিএলআর ১৯৮১ এডি ২০১); শার্পিং মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি বনাম বাংলাদেশ (৩৯ ডিএলআর ১৯৮৭ এডি ৮৫); আনোয়ার হোসেন চেীধুরী বনাম বাংলাদেশ (৪১ ডিএলআর ১৯৮৯ এডি ১৬৫); সংবিধান ৭ম সংশোধনী মামলা (৬৫ ডিএলআর ২০১৩ এডি ৮); আব্দুল মান্নান খান বনাম বাংলাদেশ (৬৪ ডিএলআর ২০১২ এডি ১৬৯, সংবিধান ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলা); কমিশনার অব কাস্টমস বনাম গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী (৫০ ডিএলআর ১৯৯৮ এডি ১২৯) মোস্তফা কামাল নামীয় .. . .. .. ।

মাহমুদুল ইসলাম ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক স্পেশাল প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারিস্টার ইশতিয়াকের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে মাহমুদুল ইসলামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-বদল ঘটে। তিনি পরবর্তীতে ইশতিয়াকের চেম্বারে যোগ দিয়ে একসঙ্গে অনেক বিখ্যাত সাংবিধানিক মামলা পরিচালনা করেন। প্রজ্ঞাবান ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতিস্বরুপ মাহমুদুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আইন-কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশনস (বিএলডি)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গাইডলাইন হিসেবে ১৯৭২ সালে প্রণীত ও গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক শাসনের কারণে দেশে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি সংবিধানের ব্যাখ্যা-ভাষ্য তৈরিতেও তখন কোন আইনজ্ঞ এগিয়ে আসেননি। সংবিধান ও সাংবিধানিক আইন চর্চা ও গবেষণায় আমাদের এই খরা-দশা ঘুচাতে এগিয়ে এসেছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। অষ্টম সংশোধনী মামলা পরিচালনার সময় থেকে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি কম্প্রিহেন্সিভ কমেন্টারি প্রণয়নের পরিকল্পনা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। এরই ফলশ্রুতিতে সংবিধান প্রণয়নের দীর্ঘ ২৩ বছর পর ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের সংবিধানের উপর প্রম পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত কমেন্টারি Constitutional Law of Bangladesh. । তাঁর জীবদ্দশাতেই এই গ্রন্থ ক্ল্যাসিক হিসেবে মর্যাদা লাভ করে এবং মাহমুদুল ইসলাম সাংবিধানিক আইনজ্ঞ হিসেবে ব্ল্যাকস্টোন, হোমস, দূর্গাদাস বসুর কাতারে শামিল হন।

ব্যক্তিজীবনে মাহমুদুল ইসলাম ছিলেন মৃদুভাষী, সদালাপী ও অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব। শেষজীবনে মাহমুদুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে মাহমুদুল ইসলাম ইহকাল ত্যাগ করেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে মাহমুদুল ইসলামের স্মরণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞ বিচারপতি আব্দুল মতিন একটি চমৎকার প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশে আইনের শাসন সুদৃঢ়করণের সংগ্রামের এই মহানায়ক তাঁর কর্মনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজ ও জাতির প্রতি অভাবনীয় প্রতিজ্ঞার জন্যই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের ভিত্তি যতই শক্তিশালী হবে ততই মাহমুদুল ইসলামের অবদান আমাদের স্মরণ করতে হবে।

weekly

বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৪ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: জুলফিকার ইসলাম

স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ সিনেমার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। আজ এই শিল্পের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করেছে। স্বাধীনতার পর নতুন প্রতিজ্ঞা ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল এই শিল্পের। গুণী নির্মাতা , যুঁতসই গল্প এবং প্রতিভাবান শিল্পীর সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল উপভোগ করার মতো, মনে রাখার মতো চলচ্চিত্র। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র ছিল বরাবরই অস্তিত্ব সংকটে। টেকসই কোনো খাত হিসেবে এই ইন্ডাস্ট্রি এখনো গড়ে উঠতে পারে নি।  কারণ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা এই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতে গোনা।  ৯০ এর দশকে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হলেও এই ধারা অব্যাহত রাখা যায় নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিনোদন শিল্প যেখানে মোট জিডিপির .৫ শতাংশ অবদান রাখছে, নাইজেরিয়ার নলিউড যেখানে অবদান রাখছে জিডিপির ২ শতাংশ সেখানে ঢালিউড রাখছে মাত্র .০০০০৪ ভাগ।

এই চলচ্চিত্র শিল্পে ১০ বছর ধরে প্রযোজনা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দর্শকদের নিকট সিনেমাকে পৌঁছে দেয়। দর্শক কেমন চলচ্চিত্র উপভোগ করে, দর্শকের ডেমোগ্রাফী কেমন, দর্শকের বিনোদন প্রবণতা, রুচি, কোন শ্রেণীর দর্শক কেমন চলচ্চিত্র দেখতে ভালোবাসে, কোন ধরণের চলচ্চিত্র সকল শ্রেণীর দর্শককে বিনোদিত করতে পারে , দর্শক কেমন পরিবেশে সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, সেগুলো কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা  বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ গভীর সংকটে।

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম যাদের বয়স ১৫-৬৪। আর মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি তরুণ প্রধান দেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১৪৬৫ ডলার অর্থাৎ ১ লক্ষ আঠারো হাজার টাকা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার থেকে ৩ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে একজন মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছে যাদের আয় বছরে ৫ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৪ লাখ টাকা বা তার উর্ধ্বে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে ২৫ শতাংশ ২০৩০ সালে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্তে উন্নীত হবেন। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী মানুষের আয় বেড়ে গেলে বিনোদন খাতে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ে। আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধান দর্শক এই তরুণ এবং মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী। বাংলাদেশের হিট সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেসব সিনেমায় মধ্যবিত্তকে আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট উপাদান ছিল।

কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান তরুণ ও মধ্যবিত্তকে বিনোদিত করার মতো সামর্থ্য তৈরি হয় নি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে মোট মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা মাত্র ৬৮ টি । গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১.৩০ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে।  ২০০৫ সালেও এ সংখ্যা ছিল ১০০র কাছাকাছি। অন্যদিকে ২০১৩ সালে নলিউডে ১৮৪৪ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতের তামিল ছবি মুক্তি পেয়েছে ১৯৬ টি। পরিমাণের সাথে চলচ্চিত্রের গুণমানগত বিষয়ও চলে আসে। এই ৬৮ টি সিনেমার মধ্যে ১০ টির বেশি সিনেমার কথা বলা যাবে না যা মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ফলে, ঢালিউডে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।  ঢালিউড কেন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনাকর্ষণীয় খাতে পরিণত হয়েছে তা আরও গভীরভাবে বোঝা যায় যদি এর বাজারটিকে বিশ্লেষণ করা যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজারকে এর চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র থেকে অর্জিত আয়, চলচ্চিত্রের বণ্টন বা হল পরিস্থিতি এবং বিপণন বা প্রচার এর আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১২ সালে। একটি চলচ্চিত্র একই সাথে একটি আর্টওয়ার্ক এবং বাজারের দিক থেকে একটি পণ্য বা সেবা। দর্শক এর গুণগত মান বিচার করেই পণ্য বা সেবাটি ক্রয় করেন।  সিনেমা তৈরির কাজটি পরিচালকের নেতৃত্বে হয়ে থাকে। এর সাথে জড়িত থাকেন অভিনয়শিল্পী, সিনেমাটোগ্রাফার, শব্দ প্রৌকৌশলী, ভিডিও এডিটর, কোরিওগ্রাফার, সঙ্গীত আয়োজক সহ আরও অনেক কলাকুশলী। এগুলোর প্রতিটিই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে এ দেশে বেশ ক’জন গুণী নির্মাতা জন্মেছেন। তারা সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় এই দক্ষতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছেন।  কিন্তু টেকসই ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হলে এই জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকতে হয় যা ২০১২ সালের পূর্বে বাংলাদেশে ছিল না। উল্লেখ্য যে, একজন রাজকুমার হিরানি, শুভাষ ঘাই কিংবা সঞ্জয় লীলা বানসালি তৈরিতে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া,পুনে’র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যান্য কলাকুশলীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা টেলিভিশন নাটক এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণে দক্ষ হয়ে তারপর সিনেমা নির্মাণের পথে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীদের অধিকাংশই আসেন ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। যদি প্রথম ছবি হিট হয় তবেই তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পারেন। তবে মঞ্চে বা টেলিভিশন নাটকে অভিনয় দিয়ে শুরু করে বেশ ক’জন শিল্পী সিনেমাতেও ভালো করেছেন। চঞ্চল চৌধুরীর নাম এখানে উল্লেখযোগ্য।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বলিউডের একটি গড়পড়তা ছবিতেই এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘বাজিরাও মাস্তানি’তেই বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা । ৬০ বছর বয়সী ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ কোটি টাকার উপর আয় করেছে মাত্র ৩ টি সিনেমা।  গড়ে একটি সিনেমা বানাতে বাংলাদেশে গড়ে খরচ হয় ৯৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ সুপারস্টার শাকিব খানের একটি ছবি থেকে গড়ে আয় হয় মাত্র ৩৮-৪০ লাখ টাকা। তাই প্রযোজকরা হাত গুটিয়ে নিয়েছেন এই খাত থেকে। একজন প্রযোজকের ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালে ঈদের সিনেমা এবং আয়নাবাজি সিনেমা ছাড়া কোনো সিনেমাই লাভজনক হয় নি। অন্যদিকে, একটি সিনেমা হলে  সিনেমা প্রদর্শিত হলে মোট আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ আসে প্রযোজকের হাতে, ৪০ শতাংশ থাকে হল মালিকদের হাতে আর বাকি ৪০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ যায় সরকারের কাছে। এই আয়ে ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে চলচ্চিত্র খাতে নতুন কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত হলেও প্রযোজকরা কোনো ব্যাংক ঋণ পান না।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমা প্রদর্শিত হয় সিনেমা হলে। কিন্তু এই সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। কারণ একটি সিনেমা হল চালানোর সুযোগ ব্যয় (অপরচুনিটি কস্ট) সিনেমা হল চালানোর তুলনায় অনেক বেশি। সিনেমা হলের পরিবর্তে একটি সুপারমার্কেট স্থাপন করলে সেখান থেকে ঢের বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। ২০০০ সালে যেখানে হলের সংখ্যা ছিল ১২০০, ২০১০ সালে ছিল ৭২২টি আর ২০১৬ সালে হয়েছে মাত্র ৩৩০ টি । এই হারে কমতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো প্রথাগত সিনেমা হল বাংলাদেশে থাকবে না।

সিনেমার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রেও এফডিসি-কেন্দ্রিক মূলধারার সিনেমাগুলোর প্রথাবদ্ধতা দেখা যায়। প্রচারের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় রঙ্গিন পোস্টার। কোনো ইনোভেশন থাকে না সেই পোস্টারে, ৩০ বছরের পুরনো স্টাইল এখনো অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়নাবাজি’র ৩৬০ ডিগ্রি কমিউনিকেশন বাংলা চলচ্চিত্রের বিপণনে একটি আদর্শ হিসেবে থেকে যাবে। এছাড়া ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাজ মাল্টিমিডিয়ার বিপণন কৌশলেও নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটের পেছনে রয়েছে চলচ্চিত্রের বাজার বা দর্শকদের প্রতি সংবেদনহীনতা, চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারে প্রতিষ্ঠানের অভাব, সুষ্ঠু সাপ্লাই চেইনের অভাব, পেশাগত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং সর্বোপরি সরকারের নীতি দূর্বলতা। বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এ বিষয়গুলোর প্রতিটিতেই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে হবে এবং উদ্যোগ নিতে হবে।

 

weekly

গল্পের পৃথিবী

 

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৩তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

গল্পের পৃথিবী

প্রবক্তা : কিঙ্কর আহ্সান

সময় : ২১ জুলাই শুক্রবার, বিকাল ৪.০০ মিনিট

লেকচার সারাংশ

পৃথিবী অসংখ্য ছোট ছোট গল্প দিয়ে তৈরি। মা-বাবার গল্প, ভাই-বোনের গল্প, প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প, বন্ধুত্ব ও বৈরিতার গল্প, রাজনৈতিক কিংবা নিতান্ত শিল্প-সৌন্দর্যের পূজারী গল্প, স্বদেশীয় কিংবা আর্ন্তজাতিক গল্প, কালিক কিংবা ধ্রুপদী গল্প। এই গল্পগুলো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে,  জীবন যাপনের ধারা কেমন হবে তা নির্ধারণ করে। অস্থিরতার পৃথিবীতে একটা ভালো গল্প হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়স্থল। আমরা ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখি। একটা খারাপ গল্প আবার করোটিতে প্রবেশ করে আমাদের অন্ধকার পৃথিবীর দিকে নিয়ে যায়। আমরা অসহায়বোধ করি।

জীবনে আমাদের গল্পের এই প্রভাব দেখে ব্যবসা করছে অনেকেই। দেদারসে চলছে বিকিকিনি। অপ্রয়োজনীয় গল্পের ঝাঁ-চকচকে দোকান খুলে বসেছে দোকানদাররা। এই সব গল্প থেকে শিখে আমরা একটা ধার করা জীবন যাপন করছি। নিজেদেরকে হারিয়ে চকচকে জীবনের নেশায় হীনমন্যতার পরিচয় দিয়ে নিজেকে জাহির করার এক অসম্ভব খেলায় মেতে উঠছি সবাই। বিজ্ঞাপন, সিনেমার খারাপ গল্পের ফাঁদে পড়ে বই পড়ার চেয়ে প্রোফাইল পিকচার বদলানো জরুরী হয়ে উঠেছে, আন্তরিক চুম্বনের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে চেক ইন দেওয়া, আড্ডার চেয়েও প্রয়োজনীয় চ্যাটবক্স, অনলাইন। কেমন একটা মুখোশ পড়ে ঘুরতে হচ্ছে সারাদিন। নিজস্বতা হারিয়ে অপরের বানানো-দেখানো গল্পে ভেসে ভেসে পথ চলছি আমরা,। নষ্ট হচ্ছি। ধ্বংস হচ্ছি। পঁচে যাচ্ছি। পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে কিন্তু টের পাচ্ছিনা। নিজের অজান্তে গল্প কিনে বেড়াচ্ছি আর বখাটে গল্পের জন্ম দিয়ে যাচ্ছি। নতুন কিছু নেই। সেই একই সকাল, একই সন্ধে, একই রাত। ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও বেদনার বেনোজলে ভাসতে ভাসতে ফুরিয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন একটু একটু করে। ভালো গল্প কই? গল্পের পৃথিবীতে এ কাদের আগ্রাসন?

একটা সুন্দর সকাল, ওম ওম গরম, রোদের লুকোচুরি, সূর্যরশ্মির শিশির দানা খুটে খাওয়া, বাটারবন, তিতকুটে রং চা, বাবার ধমক, মায়ের আদর এইসব গল্প বিলুপ্ত। পপকর্ণ, সেলফি, অ্যারোপ্লেনের প্রভাবে কেমন কোনঠাসা পারিবারিক ইমোশান! আলগোছে ছেড়ে দেওয়া শহরের গান, সময় পোড়ানো বন্ধুত্ব, মফস্বল শহরের প্রতিবেশী, ধার করা বই, গ্রামের খড়কুটো সব ফিকে হয়েছে। বড় বেশি শক্তিশালী অপরিচিত বর্ণ, শব্দের গান গ্লোবাল হবার নেশায়। এখন গ্লোবাল নয় বরং সবাই গ্লোকাল (গ্লোবাল + লোকাল = গ্লোকাল) হতে চায়।

নিজের সৎ গল্পের বুনিয়াদ সবচেয়ে মজবুত। তার ওপর দাঁড়ালে আলাদা হওয়া যায়। অথচ আমরা, আমি এলোমেলো গল্পের ভিড়ে খেই হারিয়ে একদম নাস্তানাবুদ শেষে। বইয়ের জায়গা এখন জাদুঘরে। পড়াশোনায় বিশেষ অনুরাগ নেই। ওসব পিছিয়ে পড়া মানুষের কারবার। লাইফস্টাইল প্রয়োজন। প্রয়োজন খুব বেশি গ্ল্যামার। গল্পের পৃথিবীতে নিজের, নিজেদের গল্পগুলো গ্ল্যামারাস হয়ে উঠছে না। কোথায় প্রোডাক্ট ঢুকবে, ব্র্যান্ড-এর সাথে ফিট ইন কিনা সেই যুক্তি বাদ দিয়ে বিক্রির আশায় তুলে দিচ্ছে যাচ্ছেতাই। দিনশেষে সারবত্তা কিছু নেই। দিনশেষে গল্পের প্রবল শক্তি টের পাওয়া যায় না। লড়াই করবার সময় চলে এসেছে। ঝুঁকে আর একদিনও নয়। একটা লোকাল গল্প বলে দেশের বাইরে ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়েছে কিছুদিন আগে শুধু সততার জন্য। ভালো কিছুর সমাদর সব জায়গায়। আমরা কেন জানি বড্ড হীনমন্যতায় মরিচীকার পেছনে ছুটে মরছি। নিজের জীবনটাকে নিজের মতন করে যাপন করা প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজন হয়ে উঠেছে একটু মেডিটেশন, সুস্থির হওয়া। নিজেকে চেনাটা জরুরী। নিজের গল্পেই এর পরিত্রাণ। নিজেদের গল্পেই শেকড়ের কথা আছে। সিন্ডিকেট, লবিং, পিআর, প্রচুর মিডিয়া বায়িং, হুড়োহুড়ি করে মানুষের কাছে যাওয়া যাচ্ছে বটে তবে তার কোনোকিছুই মানুষের অন্তরের কাছে পৌঁছানোর জন্য জরুরী নয়। অযথা গল্প বলে আর অবিশ্বাসের দেয়াল না তোলাই ভালো। ক্ষান্ত দিয়ে অস্থির একটা সময়কে বরং শান্ত করবার সময় চলে এসেছে। তার জন্য গেরিলা-মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে নতুন সব সারপ্রাইজ নিয়ে বাজারে ঢোকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে কিছু হাতেগোনা মানুষ। কেনো করছি, কী করছি সেসব প্রশ্নের উত্তর গল্পের ভেতর দিয়েই গল্পটাকে নিজের সাথে যুক্ত করানোর চেষ্টায় দিনভর সংগ্রাম চলছে। ফলাফল এতে আহামরি না হলেও শূণ্য নয়। মননের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যতটা না নিজের জন্য বাঁচি, তার চেয়েও বেশি অন্যের জন্য বাঁচি। এই বেঁচে থাকা, দিন পার করবার জন্য মানবজাতিকে নিজ নিজ গল্পের কাছে ফিরতেই হবে। নিজের গল্পের কাছে আশ্রয় নিতেই হবে। আর না হলে খুব শীঘ্রই গল্পকাররা হয়ে উঠবেন দুস্প্রাপ্য। গল্পগুলো হয়ে উঠবে বিলুপ্ত। আমরা নিখোঁজ হয়ে তখন অদ্ভূত এক গোলকধাঁধাঁয় আটকা পড়ে যাবো আজীবনের জন্য। সেটা হতে দেওয়া যায় না। গল্প, গল্পকাররা বাঁচুক। মানুষ নিঃশ্বাস নিক গল্পে গল্পে।

News weekly

আবু সাঈদ চৌধুরীর যোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ত্বরান্বিত হয়

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের

২৭০তম  সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

বিষয়: শ্যাডো অব দি চৌধুরী- রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধূরীর জীবনকীর্তির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ

বক্তা: ইফতিখারুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রেস রিলিজ  

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি গৌরবজনক অধ্যায়। দেশের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। অন্যদিকে দেশের বাহিরে ছিল দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নে দুই মোড়লের মধ্যে কোন দেশ স্বাধীন হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। বর্তমানে অনেক জাতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ অনেক সৌভাগ্যবান একটি জাতি। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ সত্ত্বেও কয়েকজন মানুষের প্রগাঢ় বুদ্ধি ও দক্ষতার জন্য, চরম উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপের মধ্যে আবু সাঈদ চৌধুরীর যোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ত্বরান্বিত হয়। তাছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন দুজন দক্ষ নেতা ছিলেন। প্রথমজন দেশের ভেতরে তাজউদ্দিন আহমদ । দ্বিতীয়জন দেশের বাহিরে  আবু সাঈদ চৌধুরী।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় বাহিরের উত্তাপ সম্পর্কে বাংলাদেশে আলোচনা কম। সেজন্য আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের অনালোচিত। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়।

রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

রিডিং ক্লাবের ২৭০তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের বিষয় ছিল “শ্যাডো অব দি চৌধুরী- রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধূরীর জীবনকীর্তির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ”।

মূল আলোচনায় ইফতিখারুল ইসলাম আবু সাঈদ চৌধুরীর জীবনের নানা প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯২১ সালে টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের শাসন ছিল। কিন্তু তার পরিবার ছিল অসাম্প্রদায়িক। যা অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে সাঈদ চৌধুরীকে সহায়তা করে।

মানুষের মনে আঘাত দেওয়া যাবে না, মায়ের উপদেশটি সারাজীবন মনে রেখেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন পদত্যাগ করা, তার ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা ও ক্ষমতার প্রতি লোভহীনতা প্রকাশ করে।

আবু সাঈদ চৌধুরীকে বোঝার জন্য মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ও মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন। তাহলেই আবু সাঈদ চৌধুরী ব্যক্তিকে বোঝা সহজ হবে।

রিডিং ক্লাবের প্রধান গবেষক রাশেদ রাহম শ্রদ্ধাভরে তার কথা স্মরণ করেন। আবু সাঈদ চৌধুরী সম্পর্কে বলেন, তাঁর প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তিনি দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সকল ক্ষমতা ও পাকিস্তান সরকারের হুংকারকে উপেক্ষা করে, দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন।

তাঁর স্বপ্ন সম্পর্কে জানার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন তার সমাবর্তন বক্তৃতা পড়ার কথা বলেন। তরুণ প্রজন্মের উচিত তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য নিজেদের তৈরী করা।

weekly

বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার গুণগত মান বৃদ্ধি করা উচিত

গত ০৭ ই মে ২০১৭ তে ‘বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতার ইতিহাস’ শীর্ষক রিডিং ক্লাবের ২৬৬তম সাপ্তাহিক লেকচারে একথা বলেন প্রবক্তা ও চ্যানের আইয়ের সিনিয়র সাংবাদিক মাশরুর শাকিল। তিনি বলেন ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় টেলিভিশনের প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। উপমহাদেশে এর আগে টেলিভিশনের প্রচলন ছিলনা। সেসময় টেলিভিশনে নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করা হলেও তা নিরপেক্ষ ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলনা।  স্বাধীনতার পর  টেলিভিশন খাত সম্পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতাহীন হয়ে গেলেও  জামিল চৌধূরী এবং কলিম শরাফীদের মত ব্যক্তিত্বদের দৃঢ় প্রত্যয় ও উদ্যোগেই এদেশে টেলিভিশন এবং টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে। তবে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল এবং প্রযুক্তির বিকাশের ফলে টেলিভিশন সাংবাদিকতা এখন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০টির মত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সংবাদভিত্তিক চ্যানেলও রয়েছে। এসি নেলসনের সমীক্ষা থেকে উল্লেখ করে তিনি বলেন দেশের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের কাছে টেলিভিশন সংবাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচন, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধপরাধীদের বিচারসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্তে টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রশংসনীয় ভূমিকা থাকলেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রশিক্ষণের অভাবে বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার মান প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, মূলত যা কিছু প্রতিনিয়ত নতুন করে ঘটছে, তাকে সকলের কাছে পৌঁছে দেয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। টেলিভিশন সাংবাদিকতার মাধ্যমেই সংবাদ সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে খুব দ্রুত ও সহজে পৌঁছে দেয়া যায়। ১৯৬০ এর দশকে কিছু যুগান্তকারী ঘটনা টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে সারাবিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেছে। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডির মৃত্যু, ভিয়েতনামের যুদ্ধ এবং চাঁদে মানুষের অবতরণসহ বিভিন্ন যুগান্তকারী ঘটনা সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর টেলিভিশন সাংবাদিকতার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে।  এছাড়া সংবাদভিত্তিক যেমন বিবিসি, সিএনন, আল জাজিরা এবং এনডিটিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলের আত্মপ্রকাশের ফলে টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিকাশ সারাবিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেলিভিশন সাংবাদিকতা চর্চার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়। বর্তমানে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঁচটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ থাকলেও টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে কম গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে গুরুত্বসহকারে অধ্যয়ন করা হয়।

১২০ মিনিটের অনুষ্ঠানে বক্তার জন্য নির্ধারিত ৪০ মিনিট পর উপস্থিত শ্রোতারা তাদের বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেন।

সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের হেড এন্ড রিসার্চ ডিভিশনের রাশেদ রাহম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাত্রদের মাঝে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরী করা এবং তাদের মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেগ তৈরী করা যেটা সমাজকে উন্নয়নের দিকে পরিবর্তনে ধাবিত করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে  জামিল চৌধুরীদের নামে স্মারক বক্তৃতা চালু করা। তিনি আরো বলেন, ১৯৭০ সালের বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় এবং মুক্তিযুদ্ধের খবর সারাবিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে টেলিভিশন সাংবাদিকতা অভাবনীয় ভূমিকা পালন করেছে।

 

weekly

ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারিসটোক্রেসি ইন বেঙ্গল: দ্য পোস্ট-পার্টিশন ফেনোমেনন

রিডিং ক্লাবের ২৬৫ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম

এপ্রিল ২৯, ২০১৭

স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারিসটোক্রেসি ইন বেঙ্গল

দ্য পোস্ট-পার্টিশন ফেনোমেনন

লেকচার সারাংশ

১৯৪৭ সালের দেশভাগ (বাংলা ভাগ) নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা কিংবা শিল্প-সাহিত্যে তার প্রতিফলন প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক। কারণ, যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম এবং যে প্রক্রিয়ায় বাংলা বিভাজিত হয়েছিল, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসী হতে বাধ্য হওয়া বাঙালিদের জন্য তা ছিল রাজনৈতিক গন্তব্যের শেষ পেরেক। স্বাধীন ভারতের নাগরিক হতে গিয়ে তাদের পিতৃভূমি থেকে উৎপাটিত হতে হয়েছে, সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের কাছে নিজেদের বাঙালি জাতীয়তাবোধকে বিসর্জন দিতে হয়েছে এবং পূর্ববঙ্গের স্বতন্ত্র গ্রামীন সংস্কৃতি থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষত কলকাতার নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে, সমাজ-রাষ্ট্রে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে এবং ফলে তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সাথে নানারকম বোঝাপড়া হলেও তা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটেনি, তার প্রমাণ হলো পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে কিংবা চলচ্চিত্রে এখনো দেশভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে অভিবাসী হয়ে পূর্ববঙ্গে আসা বাঙালি মুসলমানদের জন্য দেশভাগ ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। তুলনামূলক অবিকশিত সমাজে এসে তারা সহজেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছেন। কিন্তু দেশভাগের ক্ষত ভুলতে তাদের জন্য প্রধান ঔষধি হিসেবে কাজ করেছে- পূর্ববঙ্গে বাঙালির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা বিকাশের অমিত সম্ভাবনা নিয়ে আসা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রগামী গোষ্ঠী হিসেবে সেই আন্দোলনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ফলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এখন তাদের জন্য দূরবর্তী ও স্মৃতিতে ধুসর ঐতিহাসিক ঘটনা মাত্র। ফলে, স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেশভাগ নিয়ে আলোচনা-গবেষণা বাংলাদেশে প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভ্যূদয়ের ইতিহাসে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে দেশভাগ। কিন্তু এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোন অ্যাকাডেমিক আলোচনা নেই। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এই বিবেচনা থেকেই আজকের লেকচারের আয়োজন।

সুদীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অধিকারী কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় যাদের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠার প্রধান উৎস ঐতিহ্যিকভাবে আয়ত্ব বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, সাধারণত তাদেরকে বোঝাতে “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত” শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দু বর্ণপ্রথার সর্বোচ্চ স্তর ব্রাহ্মণদের “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত” হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে বিদ্যা অর্জন ও বণ্টনব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের বহু শতাব্দীর একচ্ছত্র আধিপত্য ব্রিটিশ শাসনামলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এসে হাতছাড়া হয়ে যায়। রামমোহন রায় (১৭৭৩-১৮৩৩) প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্ম প্রথম সেই আধিপত্যে আঘাত হানে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রাহ্মধর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিঃশেষিত হয় এবং তা হিন্দুধর্মের একটি শাখা হিসেবে অবলুপ্ত হয়। ব্রাহ্মধর্মের ভূমিকা ঐতিহ্য-সংশ্লিষ্ট ছিল, বিযুক্ত নয়।

কিন্তু ঔপনিবেশিক সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঐতিহ্যিক পেশা ও কুলবৃত্তির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উনিশ শতকের প্রথমার্ধে স্বল্পশিক্ষিত বাণিজ্যনির্ভর ‘বাবু’ শ্রেণি এবং দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানত শিক্ষা-নির্ভর, ‘ভদ্রলোক’ নামে বিশেষায়িত ও ঐতিহ্যবিযুক্ত এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠে, যাদেরকে বৃহত্তর অর্থে নতুন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত‘ শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই নতুন শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণিতে পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য এবং প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের অবাঙালি ও অভিবাসী মুসলিম অভিজাতরাই আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের সাথে যুক্ত হয়েছিলো নবলব্ধ বিদ্যার আভিজাত্য, বঙ্গের সোহরাওয়ার্দী পরিবার যার যথার্থ উদাহারণ। ঐতিহ্যবিযুক্ত ও আধুনিক শিক্ষা-নির্ভর মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়েছিলো বিলম্বিত এবং তাও কলকাতাকে কেন্দ্র করে। কারণ, প্রথম পর্বের শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মানেই ছিলো কলকাতায় শিক্ষিত কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি মুসলমান।

১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতাই ছিলো বঙ্গেদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী, ঔপনিবেশিক কাঠামোর কারণে যা ছিল অতি কেন্দ্রীভূত (over-centralized)| পশ্চাদভূমি পূর্ববঙ্গে উনিশ শতকের নবজাগরণের উদ্দীপনা পৌঁছেছিল প্রধানত ব্রাহ্ম আন্দোলনের পথ ধরে, তাও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল সীমাবদ্ধ। সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগই ছিল অপ্রতুল। অভিজাত মুসলমানদের আবাসভূমিও ছিল না পূর্ববঙ্গ। সর্বোপরি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ একটা অঞ্চলে বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির শর্ত তৈরি হতে পারেনি। ফলে, ৪৭-পূর্ববর্তী পূর্ববঙ্গে কোন ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তৈরি হয়নি। এর একটা প্রমাণ ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বা ‘শিখাগোষ্ঠী’, পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো যার মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই তার অকালমৃত্যু ঘটেছিলো। শুধু তাই নয়; আন্দোলনের প্রবক্তাগণ ষোল শতকের গ্যালিলিওর মতো নিগ্রহের শিকার হয়ে, মুচলেকা দিয়ে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই একই পশ্চাৎভূমিতে দেশভাগের পাঁচ বছরের মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের মতো অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল আন্দোলন কীভাবে সম্ভাবিত হয়েছিলো? এই আন্দোলন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক চিন্তাভিত্তি কীভাবে তৈরি হয়েছিলো? শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার উপর অতি-গুরুত্বারোপ করে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কারণ, ১৯৪৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ১৫০০ প্রায়, যার অধিকাংশ ছিলো হিন্দু। দেশভাগের ফলে হিন্দু শিক্ষকদের ভারতে চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট সংকট এবং নতুন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর অত্যাধিক চাপের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কানা হয়ে গিয়েছিলো। এই প্রেক্ষিতেই আসে পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে পূর্ববঙ্গে অভিবাসী হয়ে আসা বাঙালি মুসলমানদের প্রসঙ্গ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পূর্ববঙ্গের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তাদের কি বিশেষ কোন ভূমিকা ছিলো? যদি থাকে, তবে সেই ভূমিকার বিশ্লেষণ থেকে কি আমাদের উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে? এই লেকচারে এসব প্রশ্নের উত্তর, বিশেষত ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের অভিঘাতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সামগ্রিক চিন্তাকাঠামোতে কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তার অনুসন্ধান করা হবে।