Browsing Category

weekly

weekly

দেশভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৮৮তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

বিষয়: দেশভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

The Impact and Imprint of Partition-47  on University of Dhaka

বক্তা: রাশেদ রাহম

১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, বিকাল ৪.০০-৬.০০

সিনেপ্লেক্স হলরুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, আকারে-প্রভাবে এর বিকাশ ঘটেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে। ১৯২১ সালে উপমহাদেশের প্রথম আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী (Residential & Teaching) বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম তিন দশক এর খ্যাতি সীমাবদ্ধ ছিল প্রধানত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু দেশভাগের পর উচ্চ-বিদ্যায়তনের পাশাপাশি তা হয়ে উঠে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। এ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের কালানুক্রমিক ও একরৈখিক পাঠ। কিন্তু দেশভাগ তো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া-মাত্র নয়। তা আমাদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মানসিক পরিসরেও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দেশভাগের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ ও সুদূরপ্রসারী। কিন্তু ইতিহাসের কালানুক্রমিক পাঠ তা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞান ও অচেতন করে রাখে। এই পরিস্থিতিকেই অনন্যা জাহানারা কবির তার সাম্প্রতিক গবেষণায় বর্ণনা করেছেন “Partition’s Post-amnesia” হিসেবে।

 দেশভাগের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো, জনমিতিক বৈশিষ্ট্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। এই রূপান্তরের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সত্তর বছরের  ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। দেশভাগের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ যে অভিঘাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণা সংস্কৃতিকে  হঠাৎ পঙ্গু করে তোলে তা হল হিন্দু শিক্ষকদের দেশত্যাগ। ১৯৪৩-১৯৫৫ পর্যন্ত প্রায় ৭০ জন শিক্ষক, যাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০জন আবার বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন। অল্প বেতন, পাকিস্তানে অবসরের বয়স যেখানে ৫৫ ভারতে সেখানে ৬০ বছর-এই সব বিবেচনা কাজ করেছে তা স্বীকার্য, কিন্তু প্রধান কারণ ছিল মুসলমানদের রাষ্ট্রে হিন্দুদের অনিরাপত্তা। উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তখন প্রচার করছে ইসলামী রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি। (দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সালের সমাবর্তন বক্তৃতা)। বিদেশি শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পাশ করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষক সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিল হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু ১৯৪৭ সালেই জগন্নাথ ও ঢাকা হল ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায় ব্যাপক হারে, যার অধিকাংশই মুসলমান, স্থানীয় এবং শরণার্থী। ১৯৪৬-৪৭ সালে যেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ১০৯২ জন,  ১৯৪৭-৪৮ সাল ও ১৯৫১-৫২ সালে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ১৬৯৩ জন ২,৩৭৩ জনে। কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ মুসলমানদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার অবারিত হয়, মুসলমানদের মধ্যে নারীশিক্ষা প্রণোদনা লাভ করে। ১৯৪৬-৪৭ সালে  ছাত্রী সংখ্যা ৭২ জন থেকে ১৯৪৭-৪৮ সালে দাঁড়ায় ১০০ জন। শিক্ষার্থী সংখ্যার এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে ভর্তি প্রক্রিয়া শিথিল হয়ে পড়ে, শিক্ষার্থীর মান নিম্নগামী হয়। উপাচার্য এস. এম. হোসেনকে সমাবর্তনে বলতে হয়- – “… much we desire that more students should enjoy the precious benefit of University education, we shall spoil that education if we continue to admit students without proper selection.” এর সাথে যোগ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো আবাসিক ভবন সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ফলে তীব্র আবাসন সংকট সৃষ্টি হয়। দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক সুবিধা ছিল সর্বসাকুল্যে ১০০০ জনের। এদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা পূর্ববঙ্গের ৫৫টি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যাপক রদল-বদল করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ একটি বিশাল প্রশাসনিক যন্ত্র, বড়জোর শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি কাঠামো- আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়- থেকে তার গন্তব্য পরিবর্তিত হয়।

পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনে রাজনৈতিক পরিধি ছিল সংকুচিত। ফলে, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হয়ে উঠে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যম। এই আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেমি-ঔপনিবেশিক সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক সরবারকেও হার মানায়। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি জাতির জন্মপ্রক্রিয়ায় এই গৌরবজ্জ্বল অবদান রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এর মাধ্যমে তার প্রধান পরিচয় হয়ে উঠে ‘রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়”। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী আত্মদান হল “উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিসর্জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই হতভাগিনী মা, যাকে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার সন্তান ‘স্বাধীন বাংলাদেশে’র প্রসবকালে জীবনদান করতে হয়েছে।

 আবাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাভিত্তি ছিল সাম্প্রদায়িক। ফলে এর আবাসিক হলগুলোও ছিল সম্প্রদায়ভিত্তিতে গঠিত। ৪৭-এর দেশভাগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তানের চরিত্র তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষত ছাত্রসমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছিল। ১৯৭১ সালে তারাই প্রতিষ্ঠিত করেছিল উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। কিন্তু দেশভাগের সাম্প্রদায়িক ভিত্তি এখনো যে ক্রিয়াশীল, তার একটি প্রমাণ বোধহয় এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সম্প্রদায়ভিত্তিক আবাসিকব্যবস্থা।

weekly

বাংলাদেশের কৃত্যমূলক সংগীত-সংস্কৃতি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৮৭ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

বক্তা: ড. সাইমন জাকারিয়া, সহপরিচালক, বাংলা একাডেমি

নিবন্ধ

১. ভূমিকা

বাংলাদেশ বিচিত্র ধর্ম-মতের দেশ। এদেশে বসবাসরত মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বৈষ্ণব, নাথ প্রভৃতি ধর্মানুসারী মানুষের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও সাংগীতিক ঐতিহ্য। এছাড়া, এদেশের মানব-দেহকেন্দ্রিক সাধকগোষ্ঠী বাউল-ফকির ও তান্ত্রিক উপাসকদেরও রয়েছে নিজস্ব সাংগীতিক পরিচয়।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংগীত হলো- বৌদ্ধধর্মীয় সাধকসংগীত চর্যাগীতি বা চর্যাপদ। গবেষকের বিবেচনায়, “বৌদ্ধগান ও দোহা” হিসেবে চর্যাগীতিগুলি ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্মীয় দেহ-সাধক সমাজে প্রচলিত ছিল। বাঙালি পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে, এই “বৌদ্ধগানগুলিই পরবর্তী কালের বৈষ্ণব মহাজন পদাবলী ও মুসলমানি মারফতি গানের পূর্বরূপ (Prototype)। এক সময় নাথগণের চর্যাগীতি সমস্ত ভারতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল।”[শহীদুল্লাহ, ১৯৫৩ : ১৮] শুধু তাই নয়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরও বলেছেন যে, “এদেশের অধিকাংশ মুসলমান যে পূর্বে হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিল, তাহা নিশ্চিত।” [শহীদুল্লাহ, ১৯৫৩ : ১৯] আসলে, আমরা যদি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র এ ধরনের সিদ্ধান্তকে আশ্রয় করি, তাহলে আমাদের পক্ষে বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসের পূর্বাপর বিবেচনা সহজ হবে। কেননা, আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংগীতের কৃত্যের সাথে বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক ব্যবহারের যেমন পূর্ববর্তী ঐতিহ্য রক্ষিত হয়; তেমনি বাণীর বিন্যাসে ও সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

এই প্রবন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মাচারী মানুষ ও সাধকদের সাংগীতিক চর্চার ইতিহাস ও সাম্প্রতিক অবস্থার কিছু চিত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে।

২.

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান। প্রায় এক হাজার বছর ধরে এদেশের মুসলমানগণ নানা ধরনের সাংগীতিক ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত। ইতিহাসে প্রমাণ মিলেছে, এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূলে সংগীতই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দে নেত্রকোণার মদনে আগত হযরত শাহ সুলতান কমরুদ্দিন রুমী থেকে ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুরে আগত বাবা আদম শহীদ, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে আগত শাহ জালাল প্রমুখ সুফি-সাধক ও তাঁদের অনুসারীরা সংগীতের আশ্রয়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা ও অবদান রাখেন।

পরবর্তী কালে বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণে নানা ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস, লৌকিক সংস্কার, লৌকিক মহাপুরুষের ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়। এবং সকল কিছুর সঙ্গেই প্রায় সাংগীতিক ঐতিহ্যের প্রাণবন্তরূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন-

১. ইসলামের বাস্তব ইতিহাসের উপাদান তথা কারবালার ট্রাজেডির সাথে নানা ধরনের লৌকিক সংস্কার ও কল্পনার মিশ্রণে এদেশে জারি-মর্সিয়ার কৃত্যমূলক সংগীতরীতি সৃষ্টি হয়েছে। এই সংগীতরীতিতে মূলত কারবালার প্রান্তরের মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের দুর্গতি ও মর্মান্তিকভাবে শহীদ হবার ঘটনাকে স্মরণ করে শরীরিক ও মানসিকভাবে শোক প্রকাশ করা হয়। সারা বাংলাদেশে নানারূপে জারি-মর্সিয়ার এই সংগীতরীতি চর্চিত হয়। প্রমাণ হিসেবে এখানে নেত্রকোণা অঞ্চলের বিষাদ-জারির একটি পরিবেশনার চিত্র দেখাতে পারি। উল্লেখ্য, নেত্রকোণা অঞ্চলের বিষাদ-জারিতে পুরুষের অংশগ্রহণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে নারীও জারি-মর্সিয়া গান পরিবেশন করেন।

২. বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের মুসলমানরা হিন্দুদের দেব-দেবীর বন্দনামূলক সংগীত পরিবেশন করেন। যেমন-কুষ্টিয়া ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের মুসলমানরা লোকায়ত হিন্দুদের সর্পদেবী মনসার গান পরিবেশন করেন “পদ্মার নাচন” ও “বেহুলার নাচাড়ি” নামে। পাশাপাশি এদেশের মুসলমানগণ বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণে হিন্দুদের দেব-দেবীর মতো অনেক লৌকিক পিরের আখ্যান রচনা করেছেন এবং তাদের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য প্রায় তিন-চার শত বছর ধরে বিভিন্ন লৌকিক পিরের নামে সংগীত ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছেন। যেমন-গাজির গান, মানিকপিরের গান, একদিল পিরের গান, মাদারপিরের গান, খোয়াজখিজিরের গান ইত্যাদি।

৩. বাংলাদেশের লোকায়ত জীবনে অত্যন্ত জনপ্রিয় সাংগীতিক ঐতিহ্য হলো- মারফতি-সুফি সংগীত। মুসলমানদের মারফতি সংগীতের এই ধারা যে প্রাচীন কালের বৌদ্ধগানের ক্রমবিকাশের ফল তা নানাভাবে প্রমাণিত।

বাংলাদেশের মুসলমানদের এই সাংগীতিক ঐতিহ্যের ধারা বিচিত্রভাবে চর্চিত ও বিকাশিত রয়েছে। এদেশের গ্রামীণ জীবনের মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-বৈষ্ণব প্রভৃতি ধর্মের সাধারণ মানুষ, এমনকি শহরকেন্দ্রিক নিম্নবর্গের মানুষ এখনও মনে করেন-গানই জ্ঞানচর্চার প্রধান বাহন।

৩.

বাংলাদেশের হিন্দু ও বৈষ্ণবদের সংগীতের ধারার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো-কীর্তন। বাংলার সংগীতধারা হিসেবে কীর্তন শব্দটি সম্ভবত ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে রচিত গীতিকাব্য “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” থেকে আহরিত হয়েছে। এই গীতিকাব্যে ঈশ্বর উপাসনার অংশ হিসেবে মানব-মানবীর প্রেমলীলার প্রতীকে রাধাকৃষ্ণের প্রেম-কাহিনীর বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রকারের সংগীতে সেই প্রেম-কাহিনীর সাংগীতিক প্রভাব পড়েছে। সেই আদর্শে জন্ম লাভ করেছে-হিন্দু বিবাহের কৃত্যমূলক সাংগীতিক ঐতিহ্য “ধামাইল গান”। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত সেই গানের চর্চা অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশের হিন্দু সমাজে প্রচলিত শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষের এ ধরনের সংগীত পরিবেশনার নানা দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। যথা-অষ্টক গান, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদি। এদেশের হিন্দু সমাজের পূজা-পার্বণ মানেই গানের অকৃত্রিম উৎসব। দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা, জগধাত্রীপূজা, কালীপূজা প্রভৃতিতে রামলীলা, কুশানগান, পদাবলীকীর্তন ইত্যাদির গানের আয়োজনে মুখর থাকে। যদিও এ ধরনের গানের আয়োজনে ধর্মীয় কৃত্য মুখ্য থাকে। কিন্তু এদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন যে, ধর্মাচার কেন্দ্রিক সংগীত মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও মানবিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবদান রাখে।

৪.

বাংলাদেশের মুসলমান ও হিন্দুদের মতো খ্রিষ্টানদের নিজস্ব সাংগীতিক ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু পূর্ববর্তী গবেষকগণ এ বিষয়ে তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের খ্রিষ্টীয় সংগীত সংগ্রহ, সম্পাদনা, গবেষণার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা, এদেশে খ্রিষ্টীয় সংগীত চর্চার ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান যশোরের (প্রাচীন ভূষণার) এক রাজপুত্র হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে আন্তইন দা রোজারিও নাম নিয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। মূলত তিনিই প্রথম বাংলাদেশে খ্রিষ্টীয় সংগীত প্রবর্তন করেন। প্রথম দিকে তিনি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক সাধু আন্তনির জীবনী-কাহিনী নির্ভর আখ্যানগীতি পরিবেশন শুরু করেছিলেন। তার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আজও প্রচলিত। এদেশের ঢাকা, গাজীপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, নাটোর, পাবনাসহ প্রায় সকল অঞ্চলের খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাধু আন্তনির আখ্যানগীতি প্রচলিত রয়েছে। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে গাজীপুরের মঠবাড়িয়াতে অবস্থিত খ্রিষ্টীয় জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র নবজ্যোতি নিকেতনে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধু আন্তনির পালাগানের গায়কদের সম্মিলনে প্রথম জাতীয় আন্তনির পালাগানের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রসিদ্ধ গায়কবৃন্দ সংগীত পরিবেশন করেন। এছাড়া, বাংলাদেশের খ্রিষ্টীয় মণ্ডলীর বিভিন্ন গায়ক আরও বিচিত্র ধরনের সংগীত পরিবেশন করেন।

মুসলমান-হিন্দু জনতার মতো খ্রিষ্টানদের সংগীত পরিবেশনাতেও বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণ প্রত্যক্ষ করা যায়। পাশাপাশি, এদেশের খ্রিষ্টানরা তাঁদের ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেলের বিভিন্ন উপদেশমূলক অংশ নিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন। খ্রিষ্টধর্মীয় বিভিন্ন পর্ব স্টার সান ডে, বড়দিনসহ খ্রিষ্টানরা তাঁদের রোগমুক্তির কামনায় বা কেউ মারা গেলে তাঁর শ্রাদ্ধের অংশ হিসেবে সাধারণত খ্রিষ্টীয় সংগীত পরিবেশন করে থাকে। খ্রিষ্টীয় সংগীতের প্রাণবন্ত চিত্র একবার চোখে দেখলেই বাংলাদেশের খ্রিষ্টীয় সংগীতের ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

খ্রিষ্টানরা তাঁদের সংগীত পরিবেশনের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় চেতনার পাশাপাশি মানুষকে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

৫.

বাংলাদেশ বৌদ্ধধর্ম অনুসারীদের একটি প্রাচীন ভূখণ্ড। এদেশের নওগাঁ জেলার সোমপুর (পাহাড়পুর) বৌদ্ধবিহার, কুমিল্লা জেলার ময়নামতি-লালমাই পাহাড় ও শালবন বৌদ্ধবিহার এবং বিক্রমপুরের অতীশদীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের বৌদ্ধবিহার এদেশের প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের বিদ্যাপীঠ ও সাধনাক্ষেত্র হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিকভাষায় সাক্ষ্য দেয়। বৌদ্ধদের এ সকল তীর্থক্ষেত্র ও বিদ্যাপীঠে সাংগীতিক ঐতিহ্যের চর্চা ছিল।

সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশে বসবাসরত বৌদ্ধরাও বিচিত্রভাবে সাংগীতিক ঐতিহ্য প্রবহমান রেখেছে। বাঙালি ও অবাঙালি বৌদ্ধরা বিভিন্নভাবে বৌদ্ধধর্মীয় সংগীত চর্চা করেন। অবাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে চাকমা, মারমা ইত্যাদি আদিবাসীরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কৃত্যমূলক বৌদ্ধকীর্তন বা বৌদ্ধসংগীত পরিবেশন করেন। বিশেষ করে চাকমা আদিবাসীদের পরিবারের কারো মৃত্যু ঘটলে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বৌদ্ধকীর্তনের আয়োজন করে থাকেন। এ ধরনের কীর্তনে সাধারণত গৌতমবুদ্ধের গৃহত্যাগ বা সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের বিষয়টি গীতিনাট্য রূপে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। এতে প্রতীকীভাবে মানুষের দেহ-অবসানের পর পরমাত্মার সাথে মানবাত্মার মিলনের কথা সুর-বাণী-বাদ্য ও অভিনয়ের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়। বাংলাদেশের আদিবাসী বৌদ্ধদের মধ্যে সংগীতের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের বেশ স্বকীয়তা প্রত্যক্ষ করা যায়। কেননা, আদিবাসীরা নিজের উদ্ভাবিত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর আদিবাসীদের বাদ্যযন্ত্র তৈরি উপকরণ সংগৃহীত হয়-সাধারণত তাঁদের নিজের ভৌগোলিক এলাকায় উৎপাদিত বাঁশ, লাউ, কাঠ বা বন্যপ্রাণির চামড়া থেকে। এক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্রের সুর, ছন্দ ও তালে নিজস্বতা রক্ষিত হয়।

বাংলাদেশের আদিবাসী বৌদ্ধদের তৈরি নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের সুর-তাল ও ধ্বনির মাধুর্য প্রাকৃতিক পরিবেশের মতো যে কোনো মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে। এক্ষেত্রে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের বাঙালি কবি আলাওলের ভাষায় প্রশ্ন হতে পারে-

শোনো শোনো গুণী ভাই শুন কহি সার

কোথা পাইলা বাদ্যযন্ত্র বসতি কাহার।

কোন গুরুর বচনে তুলি লইলা কান্ধে

ভেদ তত্ত্ব কহ ভাই বাহিবা কোন ছন্দে॥

আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে বাঙালি কবি আলাওল দেহসাধনা ও আধ্যাত্মিক উপাসনার সাথে বাদ্যযন্ত্রের সম্পর্ক এবং বাদ্যযন্ত্রের গঠন প্রকৃতি সুরের অনুষঙ্গ বিচার মূলক এ ধরনের কাব্য রচনা করেছিলেন। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রের গঠনপ্রকৃতি, সুরধ্বনি ও তার সাথে সাধনার সম্পর্ক প্রথম বর্ণিত হয়েছিল বৌদ্ধদের গান চর্যাপদে। আগেই বলা হয়েছে যে, আজ থেকে প্রায় এক-দেড় হাজার বছর আগে বৌদ্ধধর্মীয় সাধনসংগীত চর্যাপদ রচিত ও গীত হয়েছিল। সেই চর্যা-সংগীত চিন্তার দিক থেকে মূলত বৌদ্ধধর্মীয় দেহসাধনার কথা প্রকাশ করেছিল। পূর্ববর্তী গবেষক-পণ্ডিতদের কথাসূত্রে এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে-প্রাচীন বাংলার সেই সকল সুরের ধারা ও বাদ্যযন্ত্র পরবর্তীতে বাংলাদেশে আগত ও জন্মনেওয়া অন্যান্য ধর্মের সাংগীতিক ঐতিহ্যের মধ্যে স্থান করে নেয়। তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কালের নানা ধরনের সংগীতিক পরিবেশনায় প্রাচীন বাংলার সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু নিজেদের সময় ও জীবনের সাথে প্রাচীন সুর ও বাদ্যযন্ত্রগুলি এতোটাই নিবিড়ভাবে জড়িত যে, সেই সুর বা বাদ্যযন্ত্রগুলির প্রাচীনত্বের কথা ভুলে যায়। যেমন-প্রাচীন বাংলার চর্যাগানের ধারা ও তার বাদ্যযন্ত্রগুলি ভিন্নভাবে, ভিন্ননামে মিলেমিশে রয়েছে বাংলাদেশের সাধুগুরু (বাউল-ফকির) ও বৈষ্ণবদের সাধনসংগীতের আসরে। বাউলের হাতের যে গুপীযন্ত্র বা একতারা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে আজও বেজে যাচ্ছে সংগীতের আসরে, তা তো কোনো সাম্প্রতিক কালের সৃষ্টি নয়, তা অতি প্রাচীন কালের। আর এই সূত্র ধরেই বাংলাদেশের মাটিতে চর্যার পুনর্জাগরণ ঘটেছে- সঙ্গে লয়ে প্রাচীনকালের গুপীযন্ত্র, খঞ্জনি, প্রেমজুড়ি, করতাল, দোতারা ও আনন্দলহরি। আর সাধুর কণ্ঠে শুনি দেহ-সাধনার কথা: “শরীর গাছে পাঁচটি আছে ডাল, চঞ্চলা মনে পড়ছে ঢুকে কাল। দৃঢ় করে মন সুখ খুঁজে নাও। কেমনে পাবে গুরুকে শুধাও।” চর্যার এই গানে বিস্তৃতভাবে দেহ-সাধনার কথা বলা হয়েছে।

৬.

মনে রাখা দরকার, আমাদের এই আলোচনার বাইরে বাংলাদেশে আরও বহু ধর্মমত ও ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। যেমন-বিষ্ণুপ্রিয় ও মৈতৈ মনিপুরি জনগোষ্ঠী, এই দুটি গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ভাষা-সংস্কৃতি ও সাংগীতিক ঐতিহ্য বিদ্যমান। এছাড়া, গারো, সাঁওতাল, হাজং, মান্দি, ওঁরাও, ত্রিপুরা প্রভৃতি নানা জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্মীয় বা কৃত্যমূলক সংগীত রয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে তাঁদের সাংগীতিক প্রকাশ ঘটে।

অবশ্য, বাংলাদেশের সকল স্থানের সকল ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর কৃত্যমূলক সংগীতের সুর-তাল-বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে যত বৈচিত্র্যই থাক না কেন, তার গভীরের সঞ্চিত চেতনার ভেতর মানবদেহের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এবং জীব প্রেম ও কর্ম-উদ্দীপনার প্রতি বাংলাদেশের সকল ধর্মের কৃত্যমূলক সংগীতে আহ্বান থাকে।

৭. উপসংহার

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের সংগীত কোনো না কোনো ভাবে দেহ-সাধনা, আধ্যাত্মিক উপাসনা, লৌকিক সংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার বা কৃত্যের সাথে সম্পৃক্ত। তাই, এদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বিনোদনমূলক গানের চেয়ে কৃত্যমূলক গানগুলিই অধিক প্রেম ও শ্রদ্ধার সামগ্রী। আমাদের বিশ্বাস, কৃত্যমূলক গানের সংগ্রহ, সম্পাদনা ও পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সাংগীতিক বৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে উপলদ্ধি করা সম্ভব।

 

weekly

সমকালীন বাংলাদেশে সামাজিক বিদ্যা পাঠের সঙ্কট

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৮৪ তম পাবলিক লেকচারে
সমকালীন বাংলাদেশে সামাজিক বিদ্যা পাঠের সঙ্কট 
Contemporary Challenges of Reading  Social Sciences in Bangladesh

বক্তা: মানস চৌধুরী

তারিখ: নভেম্বর ১০, ২০১৭   সময়: বিকেল ৪-৬
স্থান: সিনেপ্লেক্স হলরুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
লেকচার সারাংশ

আমার সামান্য বক্তব্যে সমকালকে অবশ্যই বিগত কয়েক দশকের নানাবিধ তাত্ত্বিক তর্কাতর্কির কালকে যেমন বিবেচনা করেছি, তেমনি অতি সম্প্রতিকালের নয়া-উদারতাবাদী আর্থব্যবস্থার যে একাডেমিক শাসন গড়ে উঠেছে সেটাকেও বিবেচনাতে রেখেছি। সেই অর্থে বাংলাদেশও নেহায়েৎ বাংলাদেশ নয়। কিছু বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুতেই কেবল মাত্রাগত বিষয় নয়, বরং একেবারেই স্থানীয় কিছু পরিস্থিতির স্থপতি সেগুলো। একই সঙ্গে, খানিকটা আমার পেশাগত কারণেও, পাঠের সঙ্কট আর পাঠদানের সঙ্কট সংমিশ্রিত বলেই বিবেচনা করি আমি। ফলে অবিমিশ্রভাবেই আমার বলায় উপলব্ধিগুলো আসবে। কোনো বক্তৃতাতে একটা সংগঠিত রচনা থাকলে শ্রোতাকুলের উপকার হয়। রিডিং ক্লাবের এই বিধিকে আমি অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখি। কিন্তু নিজে আমি বক্তৃতা দিয়ে থাকি আচমকা, তখন যা মনে পড়ে তা দিয়ে। সেটা পদ্ধতি হিসেবে নিশ্চয়ই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নয়, তবে আমার জন্য আয়াসহীন। আজ আমি আমার আলাপ নিচের এই বিষয়গুলোর মধ্যে নিহিত রাখার চেষ্টা করব। এখানে কতকগুলো প্রসঙ্গ দৈবচয়নে আনা, র‌্যান্ডম। ঠিক ক্রমবাছাই হিসেবে বা একটা আরেকটার থেকে গুরুতর হিসেবে, বা বিচ্ছিন্ন হিসেবে আমি দেখছি না।

একটা বিস্মৃত তুলনা

সূত্রটা খুঁজে পাইনি, তবে অনেক বছর আগে ব্রিটিশ এক নৃবিজ্ঞানীর একটা আক্ষেপের কথা শুনেছিলাম আমার শিক্ষক-সহকর্মীর কাছ থেকে। এ্যান হোয়াইটহেড নাম্নী ওই নৃবিজ্ঞানী বলছিলেন নিম্নস্নাতক শ্রেণীতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘সমাজ’ পড়ানো, এমনকি দুরূহ এক কাজে পরিণত হয়েছে। তিনি ৮০র দশকের থ্যাচার শাসনের সময়কালের উপলব্ধির কথা বলছিলেন। তাঁর ভাষায় শিক্ষার্থীরা ব্যক্তি চেনেন, রাষ্ট্র চেনেন, বাজার চেনেন, খরিদ করবার আগ্রহ চেনেন, আইনও চেনেন। সমাজ চেনেন না। বিবরণীটা বলতে গিয়ে এতবছর বাদে ভুল হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতিটা আমাদের জন্য বোধগম্য হবে। একটা সর্বাত্মক বাজারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীক শাসনব্যবস্থার মধ্যে সমাজ সবচেয়ে অচেনা সমগ্র হয়ে পড়তে পারে।

উন্নয়নের রেটরিক

উন্নয়নের সর্বাত্মক রেটরিক একভাবে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে, আর রাষ্ট্রীক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। এমনকি খুব চিত্তাকর্ষকভাবে ব্যাংক থেকে শুরু করে মুনাফাকাঙ্ক্ষী প্রতিষ্ঠানগুলোও খুব দূরে নয়। এদের মধ্যকার পার্থক্য ও তর্কাতর্কি বড়জোর কে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বা আন্তরিকতার সঙ্গে করছেন তা নিয়ে। উন্নয়নের দর্শন বা প্যারামিটার/মাপকাঠি নিয়ে নয়। এই সঙ্কটটিকে এক অর্থে নিও-লিবেরেল অর্থনৈতিক বিশ্বগ্রাসী ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। আমিও সম্পর্কিত করেই দেখছি। তথাপি একে স্বতন্ত্র হিসেবে হাজির করার কারণ হচ্ছে এই যে বাংলাদেশের রাষ্ট্র এবং/বা বাণিজ্যব্যবস্থা নয়া-উদারতাবাদী প্রকল্পের সর্বাত্মক রূপান্তরের আগেই উন্নয়নবাদিতা একটা সর্বগ্রাসী ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এমনকি দেশজ উন্নয়নসংস্থা (এনজিও)র প্রথম কালে কখনো কখনো মার্ক্সবাদী ‘প্রগতি’র সঙ্গেও তা পর্যাপ্ত মিশেল দিতে পেরেছে নানান কর্তৃপক্ষ। উন্নয়নের রেটরিক যুগপৎ সাংখ্যিক তথা পরিসংখ্যানেরও শাসন কায়েম করে ফেলেছে প্রায়। সামাজিক বিদ্যা ভীষণভাবে এসবের চাপের মধ্যে থাকে। এমনকি পাঠ্যসূচি প্রায়শ ‘এনজিও’র মোডিউলধর্মী হয়ে পড়তে থাকে।

পরিসংখ্যান ও সাফল্য

সরকার সাফল্য নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কেবল তাই নয় সেসব সাফল্যের ডিভাইসগুলোতে সরকারকে লাগাতার সহযোগিতা করে আসছে আন্তর্জাতিক ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলো। এর সবচেয়ে কুৎসিত কর্কশ উদাহরণ হতে পারে গত কয়েক বছরের বাংলাদেশে পরপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। সরকার এগুলোকে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বলে থাকে। যাই হোক, কাগজে কলমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার কারণে সাফল্যের পারিসংখ্যানিক মাপকাঠি অর্জিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত কাঠামো, নিয়োগ ব্যবস্থা, পাঠদানের হাল, শিক্ষকদের প্রস্তুতি ইত্যাদি কোনো গুণগত বিষয়েই ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। সামাজিক বিদ্যা পাঠ চারপাশের নিরন্তর সাংখ্যিক চাপের প্রিমাইজ বহন করে। পাঠদান এমনকি আরও বড় সঙ্কট তৈরি করে। সাফল্যের প্রচলিত প্যারামিটার চ্যালেঞ্জ করা তো দূরের কথা, সেগুলোই স্বাভাবিক হয়ে শিক্ষাদানকারীর মাথা আচ্ছন্ন করে।

নিওলিবেরেল দৃষ্টিভঙ্গি

যেমনটা আগেও বলেছি, এই উপাদানগুলো পরস্পরবিযুক্ত নয়। খোদ নয়া-উদারতাবাদ অনেকগুলো ব্যবস্থার একটা সমষ্টি। যেমন এ নিয়ে নানান আলাপ হচ্ছে, আবার এ নিয়ে গড়ে আমাদের বোঝাবুঝির সমস্যাও প্রকট। অন্যান্য জিনিসের বাইরে যে দুটো জিনিসের দিকে আমি মনোযোগ আরোপ করব তা হলো নানাবিধ সামাজিক পরিষেবাকেও কর্পোরেটের হাতে দিয়ে দেবার দর্শন। আর সামরিক বাহিনী কিংবা যেসব শাসনকে কিছুকাল আগেও লিবেরেল মূল্যবোধে ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘স্বৈরশাসন’ বলা হতো সেসবের বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্রয়দান। বস্তুত, এমনকি প্রকাশ্যে ও পরোক্ষে বিভিন্ন রাষ্ট্রেই, বাংলাদেশসমেত, সামরিক বাহিনী খোদ একটা বিশাল বাণিজ্য শক্তি। নয়া উদারতাবাদ একে লালন করে বলেই আমার উপলব্ধি। ফলত, রাষ্ট্রসমাজে এসব বিষয় প্রশ্নাতীতভাবে বিরাজমান থাকার কারণে সামাজিক বিদ্যা পাঠের ক্ষেত্রে তা গুরুতর পক্ষবিভ্রাট তৈরি করছে।

জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদ

সবচেয়ে বোধগম্য উদাহরণ হবে এরকম: বাংলাদেশের বাঙালি ভিন্ন অন্য কোনো জাতিকে নিয়ে, যার মধ্যে পার্বত্য ও সমতলের কেবল সরকার যাকে যথাক্রমে ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলে তাঁরাই নন, আমি বিহারী, ধাঙড় বা এংলো জাতিসমূহের কথাও বলছি, কোনোরকম ক্রিটিক্যাল গরিমাবিহীন উপলব্ধি তৈরি হবার পরিস্থিতি নেই। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রায়ত্ব মিডিয়া, এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন মিডিয়া সকলে একাট্টা হয়ে ‘প্রধান জাতি’সর্বস্ব একটা রাষ্ট্র কাঠামোর আদল তৈরি করতে সচল আছে। এই জাতীয়তাবাদের বিশাল চাপের মধ্যে দেশপ্রেম খোদ পতাকা, মানচিত্র, উন্নয়নের প্যারামিটারসমূহ, আর অতি অবশ্যই মিলিটারীর মধ্যে অন্তর্নিহিত হয়েছে। ফলত, দেশপ্রেমে জনগণ সামান্যই উপস্থিত আর তা কড়া জাতীয়তাবাদের সমতুল্য। এর চাপে রাষ্ট্র ও প্রবল জাতি বিষয়ে কোনো পর্যালোচনা কার্যত গড়ে উঠছে না। প্রথমত ভীতিজনিত কারণে। কিন্তু আরও পরিতাপের হলো খোদ সেল্ফ-সেন্সরশিপের কারণে এবং পরিশেষে খোদ দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়বার কারণে।

আমি শেষ করব সামাজিক বিদ্যা পাঠ ও পাঠদানের ক্ষেত্রে বৃহত্তর কলাশাস্ত্র ও দর্শনের পাঠের বনিয়াদের উপর। চলতি ভাষায় যাকে গুণগত বা কোয়ালিটিটিভ বলা হয় কেবল সেই অর্থেই নয়, সামাজিক বিদ্যার বনিয়াদ নিজ অঞ্চলীয় সাহিত্য-শিল্পকলা-দর্শনের নিবিড় অনুধাবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখি আমি। এই মুহূর্তের বাংলাদেশে তা দূরকল্পনা।

 

মানস চৌধুরী: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক, বিশ্লেষক, গল্পকার।

 

News weekly

জ্ঞানের অভাবেই বাংলাদেশে পপুলার আর্ট সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

জ্ঞানগত সংকটের কারণেই আমরা জনপ্রিয় ধারার শিল্পকলা সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে চরম অসচেতনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। সামষ্টিক জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সচলতাই আমাদের এই জাতিগত অপিরণামদর্শিতা থেকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স হলরুমে আয়োজিত রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের  ২৭৭ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে উপরোক্ত মন্তব্য করেন বক্তা শিল্পী শাওন আকন্দ। লেকচারের বিষয় ছিল পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ : স্পেশাল ফোকাস অন রিকশা পেইন্টিং এ্যান্ড সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির বিকাশ-পরবর্তী বিশ্বায়নের পৃথিবীতে শিক্ষিত উচ্চকোটির শিল্পচর্চার বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা-ঘনিষ্ঠ শিল্প-সংস্কৃতির ধারা, তাদের শিল্পবোধ, সংস্কৃতি-সচেতনতা এবং শিল্পকর্মে তাদের জীবনের প্রতিফলন- এই হল পপুলার কালচারের আপাত:পরিধি। কিন্তু সাধারণের সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতার কারণেই সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং এবং রিকশা পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা-গবেষণায় আমরা আগ্রহী নই। অথচ এগুলো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

সিনেমা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সিনেমা পেইন্টিং-এর ইতিহাস প্রায় একশ বছরের। রবি বর্মা, বাবুরাম পেইন্টার প্রমুখ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর হাতে সিনেমা ব্যানার শিল্পের আদি ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের  যাত্রা শুরু হওয়ার পর সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ের বিকাশের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে আসা অবাঙালি মুসলমানরা। নিতুন কুণ্ডের মত প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরা যুক্ত হলেও নিম্নবর্গের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরাই ছিলেন এই শিল্পের প্রাণ। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই অনন্য ধারা আজ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর সংরক্ষণে আমাদের ন্যূনতম উদ্যোগ নেই। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন গবেষণা হয়নি, এর পরে যা হয়েছে তা অপ্রতুল। ন্যাশনাল ফিল্ম  আর্কাইভে সিনেমা ব্যানার পোস্টার সংরক্ষণ করা হয় না। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য নেই কোন উদ্যোগ।

রিকশা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, রিকশা পেইন্টিং গ্রামে দেখা গেলেও তা প্রধানত নাগরিক নিম্নবিত্তের শিল্পকলা। রিক্সার উদ্ভব জাপানে। ১৯৪০-এর দশকে বাংলাদেশে রিক্সার  প্রচলন ঘটে। বিষয় অনুষঙ্গ, রঙের ব্যবহার ইত্যাদি দেখে ধারণা করা যায় রিক্সা আর্টেও অবাঙালি মুসলমানদের অবদানই প্রধান। এই শিল্পের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার কোন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। রিক্সা আর্টের বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ- সিনেমার নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে তাজমহল, বোরাক, মরুভূমি, টাইটানিক, পশু-পাখি, হেলিকপ্টার, সমুদ্র, শহরের ছবি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক অবিচার, আলাদীনের দৈত্য কিংবা ইরাক যুদ্ধ। সমসাময়িক সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও উঠে এসেছে কখনো। যেমন- এরশাদের  স্বৈর শাসনামলে রিক্সায় মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে, রিক্সা আর্টে দেখা গেছে মানুষের বদলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে সিংহ। রিক্সা আর্ট নিয়ে গবেষণায় যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তার কারণ বিদেশিরা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নয়, রিক্সা আর্ট-এর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা জাপানে- এ আমাদের জন্য অপমানজনক।

বক্তব্যের উপসংহারে তিনি বলেন,  সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ও রিক্সা পেইন্টিং- দুটি শিল্পই আজ বিপন্নপ্রায়। অথচ এগুলোর সংরক্ষণ এবং এই বিষয়ক গবেষণায় আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যৎসামান্য। অথচ এই শিল্পগুলো আমাদের সামজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যরকম বয়ান শুধু নয়, তা আমাদের মূলধারার শিল্পচর্চাকেও সমৃদ্ধ করছে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই ঔদাসীন্য, এই আত্মঅবমাননার বীজ আমাদের সংস্কৃতির গভীরে নিহিত। জ্ঞানগত সংকট নিরসনের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভবপর হবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম বলেন, পপুলার আর্ট বা জনপ্রিয় ধারার শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও সংরক্ষণে ব্যর্থতার মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা। একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য এই শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণ জরুরি ।

সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের হেড অব রিসার্চ ও ট্রান্সলেশন ডিভিশন রাশেদ রাহম বলেন, পপুলার কালচার বৃহত্তর অর্থে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। এসব ডিসিপ্লিনে আমাদের অবদান প্রায় শূন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘প্রেসক্রাইব্ড বুকস’-এর ৯৫% উৎপাদিত হয় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হীনম্মন্যতার কারণ তাই আমাদের জাতীয় জ্ঞানকাণ্ডের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিশীল হলেই জাতীয় সমৃদ্ধির পথ রচিত হবে।

weekly

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৭তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

বক্তা

শিল্পী শাওন আকন্দ

পরিচালক, যথাশিল্প (সমকালীন ও ঐতিহ্যবাহি শিল্প কেন্দ্র)

সময় ও স্থান

 বিকাল ৪.০০-৬.০০ শনিবার, তারিখ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সিনেপ্লেক্স হলরুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চারুকলার ধারার পাশাপাশি একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাও গড়ে ওঠে। এর নেতৃত্ব দেন পীতলরাম সুর, আর কে দাস, আলাউদ্দিন, আলী নুর, দাউদ উস্তাদ প্রমুখ শিল্পী। এসব প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর মাধ্যমেই বিকশিত হয় এ দেশের সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং, রিকশা আর্ট ইত্যাদি।

সিনেমার ব্যানার বলতে আমরা এখন যা বুঝি অর্থাৎ কাপড়ের উপরে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রায়শই অতিরঞ্জিত প্রোট্রেট কিংবা ফিগার এবং গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সিনেমার নাম ও অন্যান্য তথ্য। এই ধরণের কাজের সূত্রপাত দেশভাগের পর থেকেই হয়েছে।

দেশভাগের আগে ঠিক এই ধরণের সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর প্রচলন না থাকলেও, প্রচারণার তাগিদে প্রেক্ষাগৃহের নির্দিষ্ট দেয়ালে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি ও সিনেমার নাম বড় বড় করে লেখার প্রচলন ছিল। আমরা এই ধরণের কাজকে বলতে পারি সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর আদি রূপ। দেশভাগের আগে তিরিশ ও চল্লিশের দশকে, ঢাকার প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে এই ধরণের ছবি আঁকার কাজে যুক্ত ছিলেন এমন  অন্তত একজন শিল্পীর নাম জানা যায়। তিনি শাঁখারী বাজারের পীতলরাম সুর (১৯০২-১৯৮৭)। ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকায় মায়া (স্টার) সিনেমার হলের কাছাকাছি অঞ্চলে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘আর্ট হাউজ’ ছিল বলে জানা যায়। এমন কি পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। উদাহরণ হিসাবে বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্কর নিতুন কুন্ডু (১৯৩৬-২০০৬) এবং বর্তমানে চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান (জ. ১৯৩৯)-এর নাম উল্লেখ করা যায়।

দেশভাগের পর বিপুল সংখ্যক অবাঙ্গালী মুসলমান কোলকাতা ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এদের অনেকেই কোলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং কিংবা এ ধরণের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত: এদের হাত দিয়েই বাংলাদেশে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর সূত্রপাত। দেশভাগের পর কিংবা ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর কোলকাতা থেকে যারা ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেন তাদের অনেকেই এই স্টুডিও/কারখানাগুলোতে কাজ করতো।

তবে ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর ইতিহাসে আরেকজন পথিকৃৎ এর সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম মোহম্মদ সেলিম (পরে ‘মুনলাইট’ সিনেমা হলের মালিক)। মোহম্মদ সেলিম  এসেছিলেন কোলকাতা থেকে। তার আদি নিবাস ছিল বোম্বে। ১৯৪৮ থেকে তিনি ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর কাজ শুরু করেন তার বাসায়, র‌্যাংকিন স্ট্রীটে। এই সেলিমের কাছ থেকে কাজ শিখে পরবর্তী পর্যায়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন অনেকেই। এদের মধ্যে গুলফামের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। (গুলফাম এবং মোহম্মদ সেলিম দু’জনই মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে চলে যান।)

রিকশা আর্ট

নিজস্ব শিল্পশৈলী, উপস্থাপন রীতি ও বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে সুধীজনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো রিকশা আর্ট। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের সুসজ্জিত ও চিত্রিত রিকশা সংগৃহীত আছে।

মূলত চাকা আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে রিকশা নামের এই বাহনের সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ১৮৭০ সাল নাগাদ। অবিভক্ত বাংলায় প্রথম রিকশার প্রচলন ঘটে কলকাতায়, বিশ শতকের প্রথম ভাগে। কাছাকাছি সময়ে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রিকশার প্রচলন হয় প্রথমে ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে এবং পরে ঢাকায় (১৯৩৮)। তবে বাংলাদেশে প্রচলন ঘটে সাইকেল রিকশার, মানুষে টানা রিকশা নয়। বাহারি ও শৌখিন পরিবহন হিসেবে ঢাকায় রিকশার আগমন ঘটে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর। মূলত রিকশা পেইন্টিংয়ের সূত্রপাত হয় এই সময় থেকেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে রিকশা পেইন্টিং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় হতে থাকে। বাংলাদেশে রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রবীণ ও বিখ্যাত শিল্পী যেমন- আর কে দাস, আলী নূর, দাউদ উস্তাদ, আলাউদ্দিনসহ অন্যরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই রিকশা পেইন্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন।

রিকশা আর্টের মূল লক্ষ্য রিকশাকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করা। সাধারণত শিল্পীরা মহাজন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ছবি এঁকে থাকেন। তবে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে রিকশা পেইন্টিং করা হয়েছে। যেমন- ষাটের দশকে রিকশা পেইন্টিং করা হতো মূলত শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে। আবার সত্তরের দশকে নতুন দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন  কাল্পনিক শহরের দৃশ্য আঁকা হতো রিকশায়। পাশাপাশি সব সময়ই গ্রামের জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও আঁকা হতো, এখনো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টাইলের ফুল, পাখি ইত্যাদি তো আছেই।

 

News weekly

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রেস রিলিজ

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি। গ্রামের ইতিহাস হিসেবে যা লেখা হয়েছে তা মূলত জোতদার শ্রেণি ও ক্ষমতাশালীদের ইতিহাস। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, কৃষকদের ইতিহাস সেখানে উঠে আসেনি যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ডাচ গবেষক ভেল্যাম ভ্যান শেন্ডেলের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণা সম্পর্কিত আলোচনায় তার  বরাতে উপরোক্ত মন্তব্য করেন রিডিং ক্লাবের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের প্রবক্তা আতাউর রহমান মারুফ।

বাংলাকে “সোনার বাংলা” বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে একজন বিদেশী ইবনে বতুতার। তিনি বাংলায় জিনিসপত্রের প্রতুলতা ও এর দাম সস্তা  বলে এই নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় গবেষকগণ অবশ্য সোনার বাংলাকে ‘মিথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রবক্তা ইবনে বতুতার সূত্র ধরে বিদেশী পণ্ডিতদের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর। কিন্তু বঙ্গদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের গবেষণাধর্মী কাজের সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে। স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারের “A Statistical Account of Bengal”-সহ অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থ এখনো বঙ্গদেশ বিষয়ক গবেষকদের জন্য অবিকল্প প্রামান্য গ্রন্থ। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট জি. সেক ১৯০৬-১৯১০ সময়কালীন ফরিদপুরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল- “The Economic Life of a Bengal District”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্বক গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে নেদারল্যান্ডের নাগরিক ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় উপেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাছাড়া, তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামজিক অবস্থা, নৃতাত্বিক বিবর্তনসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

তাঁর “A History of Bangladesh” বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল এ বইটির রিভিউতে বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কাজগুলো হয়েছে তার মধ্যে এটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। ভ্যান শেন্ডেলের ১২টি বই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক বই ছয়টি। তাঁর মৌলিক গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থ সাতটি ।

শেন্ডেল বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের গতিশীলতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। আমাদের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। আমাদের নীল অর্থনীতি (নীল চাষ) সম্পর্কে গবেষণা  করেছেন । পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশে রেশম শিল্প সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে কিন্তু রেশম নীতি সাধারণ মানুষকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে- এ সম্পর্কে কোন গবেষণা হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন।

শেন্ডেলের ১৯৮১ সালে প্রকাশিত  “Peasant mobility : The Odds of Life in Rural Bangladesh Studies of Developing Countries” বইতে আমাদের কৃষক পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কৃষকের পরিবার ও তাদের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা হয়নি । ১৮৮০-১৯৮০ এই একশত বছরের কৃষক গতিশীলতার  ইতিহাস তাঁর বইয়ে আলোচিত হয়েছে।

২০০০ সালে  শেন্ডেলের  “Chittagong Hill Tracts: Living in Borderland”  বইটি প্রকাশিত হয় । বইটিতে তিনি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বইটি লেখার কারণ  হল পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশে সর্বদা উপেক্ষিত হয়েছে। শেন্ডেল এই বইয়ের জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ টি সূত্র থেকে ছবি সংগ্রহে করেছেন ।

শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা অপর্যাপ্ত। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করলে, আরো নতুন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কিন্তু একইভাবে নাইজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ  ব্যর্থ হয়েছে কেন? এ বিষয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে অন্য গণহত্যার সম্পর্ক বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সাধারণ মানুষের ইতিহাস লেখার চেষ্টা তার অন্যতম বড় গুণ।

সবশেষে বক্তা শেন্ডেলের বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদের কথা বলেন। শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি, যারা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র  হিসেবে গড়ে তুলবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম শেন্ডেলের বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ-কেন্দ্রিক গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, তাঁদের গবেষণায় প্রান্তে বসবাসকারী মানুষরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু শেন্ডেল এই প্রান্তিক মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন । তিনি কৃষকদের নিয়ে, আদিবাসী নিয়ে এবং সীমান্ত নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের  সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আদিবাসীদের সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তিনি এও বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবিক তা বোঝা যায়, সেই রাষ্ট্র তার প্রান্তিক জনগণের প্রতি কতটুকু আন্তরিক- তার উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লিপিকা বিশ্বাস অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে জিডিপি-নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, জিডিপি কার বৃদ্ধি পাচ্ছে? ধনী আরো ধনী হচ্ছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সমাজে অর্থনৈতিক  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জামশেদ সাকিব তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা  করেন। রাশিয়ায় ১৩-১৪ বছরের পূর্বে কেউ কৃষির উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত হয় না । কিন্তু বাংলাদেশে ৬ বছর বয়স  পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া শুরু করে । ফলে সে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

শেন্ডেল রচিত বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনালোচিত অনুষঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেন তুহিন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ১৮ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেয়া ত্রিপুরার অবদান অনালোচিত । ত্রিপুরার মেলাঘয়ে সেনাবাহিনী সদস্যেদের প্রশিক্ষণের ঘটনাও অনালোচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করার প্রয়োজনীয়তা কথা বলেন তিনি।

শেন্ডেল বিষয়ক আলোচনার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। আমরা কতটা অথর্ব শেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে তা বোঝা যায় । কারণ একজন বিদেশী আমাদের কাজ করে দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারিনি। সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন । তিনি বলেন, শেন্ডেলের বইয়ের প্রচ্ছদে একজন রিকশাওয়ালার ছবি। তাঁর মতে রিকশাওয়ালারাই বাংলাদেশ । কারণ বাংলাদেশে রিকশাওয়ালারা খণ্ডকালীন বেকারত্ব লাগব করতে শহরে আসে। আবার কৃষি কাজের সময় গ্রামে চলে যায় । অর্থাৎ সে গ্রাম ও শহর দু’জায়গায়ই বসবাস করে। আরিফ খানের মতে, শেন্ডেল রিকশাওয়ালার মাধ্যমেই  Making sense of contemporary Bangladesh বোঝাতে চেয়েছেন । শেন্ডেল তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ঋণী করে ফেলেছেন। কারণ তাঁর কাজগুলো আগামী ৫০-১০০ বছর পরে হলেও আমাদেরকে করতেই হত। কিন্তু শেন্ডেল তা আগেই করে আমাদেরকে ঋণগ্রস্ত করেছেন ।

একটি জাতির বোধোদয় হয় তার ইতিহাস জানার মাধ্যমে। আমাদের ৫২-র ফেব্রুয়ারীর বীজ বেড়ে উঠতে ৮০০ বছরের অধিক সময় লেগেছে। পৃথিবীতে বহু ভাষা, জাতি বিলুপ্ত হয়েছে । বাঙালি জাতির টিকে থাকার রহস্য জানা যায়  শেন্ডেলের কাজের মাধ্যমে। আমাদের দুর্বলতা বোঝার জন্য আমাদেরকে শেন্ডেলের কাজের দিকে তাকাতে হবে।

 

weekly

ভ্যান শেন্ডেল-এর বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাবের ২৭৬ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ
স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

বাংলাদেশের সাথে ভেলাম ভ্যান শেন্ডেলের (জন্ম:১৯৪৯) পরিচয় অনেকটা আকষ্মিকভাবেই। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র (আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস) হিসেবে সেসময় নিয়ম ছিল নিজের সমাজের বাইরে অন্য কোন সমাজ নিয়ে গবেষণা করা। ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশকে নির্বাচন করেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশে আসেন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আক্রোশে অনাহারে মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। এই দুর্ভিক্ষ চট্টগ্রামের অধ্যাপক ড. ইউনূসের চিন্তাজগত পাল্টে দিয়েছে। অর্থনীতির তত্ত্ব ছেড়ে তিনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। সিলেটে, রংপুরে আবেদ ব্র্যাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। রংপুরে গড়ে উঠেছিল স্বনির্ভর আন্দোলন। বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যমী তরুণরা বিভিন্নভাবে কাজ করেছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের প্রকট প্রভাব সত্ত্বেও শেন্ডেল বাংলাদেশের বাতাসে এক ধরণের আশাবাদের, পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের এই দুঃসময়ে শেন্ডেল নিজেও বিপদে পড়েছিলেন। সেসময় সরকার ৫০০ টাকার নোট বাতিল করে দেয়। তার কাছে ছিল সব ৫০০ টাকার নোট। মূহুর্তের মধ্যেই তিনি কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। গ্রামের মানুষেরাই তাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। গ্রামবাসীর আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেমে পড়ে যান। প্রান্তিক জনজীবনের ইতিহাস রচনার উপর তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কারণ তারা সবসময় উপেক্ষিত। অথচ এরাই সমাজের প্রাণ। তিনি বলেন, ইতিহাসের চাকা ঘোরানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি, যা আমরা প্রায়ই অনুধাবন করি না। শেন্ডেল বাংলাদেশী সমাজের শেকড়ের সন্ধান করেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ এবং ইতিহাসের এমন বিষয় নিয়ে চর্চা করেছেন, যা সাধারণভাবেই অনুল্লেখিত। একারণেই আমরা শেন্ডেলের নিকট ঋণী।

শেন্ডেল বাংলাদেশ নিয়ে গোটা দশেক বই লিখেছেন। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ইতিহাস রচনার মাধ্যমে শুরু করেন(Peasant Mobility,1993)। সেখানে চেষ্টা করেন কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ গ্রাম ভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস রচিত হয়নি, হয়েছে মূলত গ্রামের জোতদার, জমিদার, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ইতিহাস। শেন্ডেল তাঁর গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ফলে অবহেলিত-শোষিত মানুষই তার গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। The Chittagong Hill Tracts: Living in the Boarderland (2000,UPL ) নামক পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি আলোকচিত্রভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক বই লিখেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করে এ অঞ্চলের গত একশ বছরের দুঃস্প্রাপ্য ইতিহাস রচনা করেন ।

১৮২৪ সালের দিকে পাগলপন্থি নামক ময়মনসিংহের শেরপুরের একটি সম্প্রদায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। বাংলার ঐ এলাকাটি তখনো ব্রিটিশদের পুরোপুরি শাসনে আসেনি। বড় বড় জোতদার আর ভূস্বামীরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। কৃষকরা স্থানীয় জোতদার আর ব্রিটিশ সৈন্য উভয়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাগলপন্থিদের নেতা টিপু পাগল আর তার মায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ আর নারীনেতৃত্বের ভূমিকা শেন্ডেলকে কৌতুলহলোদ্দীপক করে তোলে (Madmen’ of Mymensingh: peasant resistance and the colonial process in eastern India, 1824-1833, 1985)

১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রানসিস বুকাননকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় পাঠিয়েছিল, এ এলাকাটিতে  আরো লাভজনক মশলা উৎপাদন করা যায় কি না তা সরেজমিনে যাচাই করে দেখতে। বুকানন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। বুকানন ভ্রমণের সময়  এসব অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন, ভাষা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন তার বইতে। এই ডায়েরিটি বাংলাদেশের  দক্ষিণ পূর্ব এলাকার সবচেয়ে পুরনো লিখিত দলিল। কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ এটি জানত এবং কখনো প্রকাশিত হয়নি। শেন্ডেল এই ডায়েরিটি ভূমিকাসহ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৯৯২ সালে এটি প্রকাশিত করেন। (Dokkhinpurbo Banglay Francis Buchanan, 1994)

রেশম শিল্প নিয়ে তাঁর গবেষণায় তিনি বাংলার অতি প্রাচীন এই গ্রামীন শিল্পের সঙ্গে এ দেশের উন্নয়ন নীতিমালার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। সেই হিসেবে এ কাজটিকে এ অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ইতিহাসও বলা যেতে পারে। উন্নয়ন একটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হলেও অবাক ব্যাপার হল, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া নিয়ে এ অঞ্চলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। এই বইয়ে উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ অবধি রেশম শিল্পকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন, কী করে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের পৌনঃপুনিক ভুলের কারণে এ অঞ্চলের এমন একটি সমৃদ্ধশালী শিল্পের পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাঁর একটি গবেষণার বিষয় সময়, যেখানে তিনি বলেন বাংলাদেশ খুব ব্যতিক্রমীভাবে একটি সময়-সমৃদ্ধ (Time-Rich) দেশ। ইউরোপীয় সমাজ যেখানে একটি সময়কাঠামোতে চলে সেখানে বাংলাদেশী সমাজ অনায়াসে তিনটি সময়কাঠামো বজায় রেখেছে। সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামো হলেও এ দেশে বাংলা, ইংরেজি এবং ইসলামি এই তিন রকম ক্যালেন্ডারই ব্যবহৃত হয়। খাসিয়াদের ৮ দিনে সপ্তাহ। বাংলাদেশের মানুষ এই বিভিন্ন ধরণের সময়কাঠামো যেভাবে তাদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ব্যবহার করে, তা  পর্যবেক্ষণ করেলে এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পদ্ধতি , ক্ষমতাকাঠামোর খেলা, পরিচয়ের সংকট এসব নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।

দি বর্ডারল্যান্ড: বিয়ন্ড স্টেট অ্যান্ড নেশন ইন সাউথ এশিয়া’ বইয়ের বিষয়বস্তু হলো ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট বাংলাদেশ, ভারত এবং বার্মার সীমানা। দেশভাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও সীমানার ইতিহাস নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। সীমান্তরেখা সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবনে কী পরিবর্তন হল, কী করে তারা অলক্ষ্যেই প্রভাবিত করলেন রাষ্ট্রকে। তিনি দেখিয়েছেন সীমান্ত এলাকার ইতিহাস রচনা করতে গেলে সীমান্তের দু দিকের দেশ নিয়েই গবেষণা করতে হবে। সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবন এবং কর্মকা- খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নীতিনির্ধারক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সামান্য মনযোগ দেন।

শেন্ডেলের সব কাজের একটি সমন্বিত রুপ পেয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ‘A History of Bangladesh’ বইতে। বইটি ২০১২ সালে চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তিনি মূলত বর্তমান বাংলাদেশকে বুঝতে চেয়েছেন। তার ভাষায় এই বইয়ের উদ্দেশ্য হল- Make sense of Contemporary Bangladesh । এজন্য এ অঞ্চলের ইতিহাস বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। শেন্ডেল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বর্তমান বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এর আগের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ছিল সম্পাদিত এবং ইনসাইক্লোপেডিক ধরনের। কিন্তু এগুলোর সমন্বিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ছিলনা। একই সাথে অধিকাংশ ইতিহাস হয়ত নির্দিষ্ট ঘরানার অথবা জাতীয়তাবদী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই বইয়ের লেখক এসব ত্রুটিমুক্ত হয়ে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখিয়েছেন।

৩৪৭ পৃষ্ঠার মূল বইটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা। এতে ২২টি চ্যাপ্টার রয়েছে। বইটি চারটি বৃহৎ ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইকোলজি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি। প্রথম ভাগে তিনি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠনপ্রক্রিয়া- যেমন মাটি, পানি, বনজঙ্গল, শহর ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।  তিনি এটাকে বলছেন ‘বেঙ্গল ডেলটা’ যার সঙ্গে অনেকাংশে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলের মিল রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ধ্বংসাত্বক এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়ার ফলে এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য তৈরী হয়েছে। রিচার্ড ইটনের ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি এ অঞ্চলের কৃষি, ধর্ম, ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন সীমারেখার (Frontier) বর্ণনা ও তুলনামূলক আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় ভাগে মোগল আমল থেকে বৃটিশ শাসন, ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব এবং পরের ভাগে দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ ভাগে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সর্বশেষ ভাগে তিনি বর্তমান (২০০৭) বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ভ্যান শেন্ডেল মূলত একজন তুলনামূলক ইতিহাসবিদ হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশে এরকম ইতিহাস চর্চা খুবই বিরল। তার মতে, ইতিহাস চর্চার তাত্ত্বিক যে নতুন ধারাগুলো আছে, যা বাংলাদেশে বিশেষ আলোচিত নয়, সেসব ধারায় এখানে গবেষণা হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে যদি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে রেখে একটা তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হলো,  একই সময়ে বায়াফ্রার (নাইজেরিয়া) মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হলো কেন? একাত্তরের গণহত্যার  সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর আর সব গণহতার (রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া) কী তুলনামূলক সম্পর্ক।”

শেন্ডেল মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসের নবদিক উন্মোচনকারী ইতিহাসবিদ। তিনি চেষ্টা করেছেন বড় বড় জাতীয় বীরের বদলে সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে, যাতে বাংলাদেশের জটিল ইতিহাসকে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়। তিনি সবসময় চমকিত হয়েছেন এদেশের মানুষের অঢেল জীবনীশক্তি দেখে। অসম্ভব বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে এখানে সাধারণ মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় কিন্তু এর মাঝেই তারা ধরে রেখেছে অসীম সাহস, আন্তরিকতা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্বল। যেমন ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তা আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে পারেনি। বাংলাদেশের অসাধারণ মানবিক সম্ভাবনা রয়েছে আবার সেই সম্ভাবনার সীমাহীন অপচয়ও হচ্ছে। তবুও সবশেষে তিনি তরুণদের উপর ভরসা রেখেছেন। ইতিহাস নিয়ে তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 সূত্র:

  1. শাহাদুজ্জামান, কথাপরম্পরা, পাঠক সমাবেশ,২০০৭, ভ্যান শেন্ডেলের সাক্ষাৎকার, পৃ: ১১২-১২৫
  2. Willem Van schendel, A history of Bangladesh, Cambridge University Press,2009
  3. Iftekhar Iqbal, “A Long view of Bangladesh”, Economic & political weekly, August 2009, Vol XLIV no 34, p:32-34
weekly

মাহমুদুল ইসলাম:সংবিধানে সমাধিস্থ জীবন

Photo credit: lawpediabd.com

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৫তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

মাহমুদুল ইসলাম (১৯৩৬-২০১৬)

সংবিধানে সমাধিস্থ জীবন

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম, নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক লিগ্যালইস্যু

তারিখ: ০৪ আগস্ট ২০১৭

স্থান: সিনেপ্লেক্স হল, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রভিত্তি নির্মাণে যে সকল মহৎ ব্যক্তিত্ব অলক্ষ্যে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। তিনি শুধু একজন আইনজীবী ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান আইনজ্ঞ। স্বাধীন আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল কিংবা অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে গত পাঁচ দশকের বাংলাদেশের প্রায় সব যুগান্তকারী সাংবিধানিক মামলার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য তৈরি করে দেশে সাংবিধানিক আইন ও সাংবিধানিকতা বিকাশে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাজীবনে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা, আইনি প্রজ্ঞা, দেশ ও জনগণের প্রতি অকুণ্ঠ নিবেদন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণের কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনব্যক্তিত্ব, বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থার প্রতীক।

১৯৩৬ সালের ২৪ জুলাই রংপুরের এক আইনজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাহমুদুল ইসলাম। তাঁর পিতা রংপুরের বিখ্যাত আইনজীবী খান সাহেব আজিজুল ইসলাম ও মাতা জাহানারা ইসলাম। মাহমুদুল ইসলামের প্রপিতামহ মো. আশরাফ উদ্দিন ও মামা আজিজুল হক রংপুর বারের খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবন রংপুরে অতিবাহিত হয়। মাহমুদুল ইসলামের পেশা নির্বাচনে বৃহত্তর পারিবারিক পরিমণ্ডল প্রভাব ফেলেছিল। মাহমুদুল ইসলাম ১৯৫১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি বি.এ. পাস করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ এবং ১৯৫৯ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এলএলবি ডিগ্রি র্অজন করেন। আইনপেশায় প্রতিষ্ঠা অর্জনের বেশ কিছুকাল পরে ১৯৭৯ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অধ্যয়ন করে আইনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এই কোর্সে তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল Estoppels against Government

১৯৫৯ সালে তিনি শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে রংপুর বারে যোগদান করেন। ১৯৬১ সনের জুন মাসে মাহমুদুল ইসলাম আইনজীবী হিসেবে সনদ র্অজন করেন এবং রংপুর জেলা জজ আদালতে আইন প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর আইনজীবী পিতা খান সাহেব আজিজুল ইসলামও সেখানে প্র্যাকটিস করতেন। পিতার পরিচিতির সুবাদে রংপুর বারের প্রবীণ আইনজীবী বিজয় চন্দ্র মৈত্র, শীতল রায় চৌধুরী, শীবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জুনিয়র হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন মাহমুদুল ইসলাম। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে তিনি তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের সনদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি আপীল বিভাগে প্র্যাকটিসের অনুমতি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি সিনিয়র অ্যাডভোকেটের সম্মানে ভূষিত হন এবং আমৃত্যু আইনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের আইনজীবী ক্যারিয়ারে মাহমুদুল ইসলাম অনেক মামলা পরিচালনা করেছেন। তাঁর পরিচালিত অনেক মামলার রায়ে সুপ্রীম কোর্ট আইনের নতুন নীতি নির্ধারণ করেছে। এ ধরনের কয়েকটি মামলা হলো- ড. নুরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ (৩৩ ডিএলআর ১৯৮১ এডি ২০১); শার্পিং মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি বনাম বাংলাদেশ (৩৯ ডিএলআর ১৯৮৭ এডি ৮৫); আনোয়ার হোসেন চেীধুরী বনাম বাংলাদেশ (৪১ ডিএলআর ১৯৮৯ এডি ১৬৫); সংবিধান ৭ম সংশোধনী মামলা (৬৫ ডিএলআর ২০১৩ এডি ৮); আব্দুল মান্নান খান বনাম বাংলাদেশ (৬৪ ডিএলআর ২০১২ এডি ১৬৯, সংবিধান ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলা); কমিশনার অব কাস্টমস বনাম গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী (৫০ ডিএলআর ১৯৯৮ এডি ১২৯) মোস্তফা কামাল নামীয় .. . .. .. ।

মাহমুদুল ইসলাম ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক স্পেশাল প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারিস্টার ইশতিয়াকের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে মাহমুদুল ইসলামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-বদল ঘটে। তিনি পরবর্তীতে ইশতিয়াকের চেম্বারে যোগ দিয়ে একসঙ্গে অনেক বিখ্যাত সাংবিধানিক মামলা পরিচালনা করেন। প্রজ্ঞাবান ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতিস্বরুপ মাহমুদুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আইন-কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশনস (বিএলডি)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গাইডলাইন হিসেবে ১৯৭২ সালে প্রণীত ও গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক শাসনের কারণে দেশে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি সংবিধানের ব্যাখ্যা-ভাষ্য তৈরিতেও তখন কোন আইনজ্ঞ এগিয়ে আসেননি। সংবিধান ও সাংবিধানিক আইন চর্চা ও গবেষণায় আমাদের এই খরা-দশা ঘুচাতে এগিয়ে এসেছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। অষ্টম সংশোধনী মামলা পরিচালনার সময় থেকে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি কম্প্রিহেন্সিভ কমেন্টারি প্রণয়নের পরিকল্পনা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। এরই ফলশ্রুতিতে সংবিধান প্রণয়নের দীর্ঘ ২৩ বছর পর ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের সংবিধানের উপর প্রম পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত কমেন্টারি Constitutional Law of Bangladesh. । তাঁর জীবদ্দশাতেই এই গ্রন্থ ক্ল্যাসিক হিসেবে মর্যাদা লাভ করে এবং মাহমুদুল ইসলাম সাংবিধানিক আইনজ্ঞ হিসেবে ব্ল্যাকস্টোন, হোমস, দূর্গাদাস বসুর কাতারে শামিল হন।

ব্যক্তিজীবনে মাহমুদুল ইসলাম ছিলেন মৃদুভাষী, সদালাপী ও অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব। শেষজীবনে মাহমুদুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে মাহমুদুল ইসলাম ইহকাল ত্যাগ করেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে মাহমুদুল ইসলামের স্মরণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞ বিচারপতি আব্দুল মতিন একটি চমৎকার প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশে আইনের শাসন সুদৃঢ়করণের সংগ্রামের এই মহানায়ক তাঁর কর্মনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজ ও জাতির প্রতি অভাবনীয় প্রতিজ্ঞার জন্যই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের ভিত্তি যতই শক্তিশালী হবে ততই মাহমুদুল ইসলামের অবদান আমাদের স্মরণ করতে হবে।

weekly

বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৪ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: জুলফিকার ইসলাম

স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ সিনেমার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। আজ এই শিল্পের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করেছে। স্বাধীনতার পর নতুন প্রতিজ্ঞা ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল এই শিল্পের। গুণী নির্মাতা , যুঁতসই গল্প এবং প্রতিভাবান শিল্পীর সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল উপভোগ করার মতো, মনে রাখার মতো চলচ্চিত্র। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র ছিল বরাবরই অস্তিত্ব সংকটে। টেকসই কোনো খাত হিসেবে এই ইন্ডাস্ট্রি এখনো গড়ে উঠতে পারে নি।  কারণ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা এই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতে গোনা।  ৯০ এর দশকে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হলেও এই ধারা অব্যাহত রাখা যায় নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিনোদন শিল্প যেখানে মোট জিডিপির .৫ শতাংশ অবদান রাখছে, নাইজেরিয়ার নলিউড যেখানে অবদান রাখছে জিডিপির ২ শতাংশ সেখানে ঢালিউড রাখছে মাত্র .০০০০৪ ভাগ।

এই চলচ্চিত্র শিল্পে ১০ বছর ধরে প্রযোজনা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দর্শকদের নিকট সিনেমাকে পৌঁছে দেয়। দর্শক কেমন চলচ্চিত্র উপভোগ করে, দর্শকের ডেমোগ্রাফী কেমন, দর্শকের বিনোদন প্রবণতা, রুচি, কোন শ্রেণীর দর্শক কেমন চলচ্চিত্র দেখতে ভালোবাসে, কোন ধরণের চলচ্চিত্র সকল শ্রেণীর দর্শককে বিনোদিত করতে পারে , দর্শক কেমন পরিবেশে সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, সেগুলো কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা  বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ গভীর সংকটে।

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম যাদের বয়স ১৫-৬৪। আর মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি তরুণ প্রধান দেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১৪৬৫ ডলার অর্থাৎ ১ লক্ষ আঠারো হাজার টাকা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার থেকে ৩ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে একজন মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছে যাদের আয় বছরে ৫ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৪ লাখ টাকা বা তার উর্ধ্বে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে ২৫ শতাংশ ২০৩০ সালে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্তে উন্নীত হবেন। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী মানুষের আয় বেড়ে গেলে বিনোদন খাতে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ে। আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধান দর্শক এই তরুণ এবং মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী। বাংলাদেশের হিট সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেসব সিনেমায় মধ্যবিত্তকে আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট উপাদান ছিল।

কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান তরুণ ও মধ্যবিত্তকে বিনোদিত করার মতো সামর্থ্য তৈরি হয় নি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে মোট মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা মাত্র ৬৮ টি । গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১.৩০ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে।  ২০০৫ সালেও এ সংখ্যা ছিল ১০০র কাছাকাছি। অন্যদিকে ২০১৩ সালে নলিউডে ১৮৪৪ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতের তামিল ছবি মুক্তি পেয়েছে ১৯৬ টি। পরিমাণের সাথে চলচ্চিত্রের গুণমানগত বিষয়ও চলে আসে। এই ৬৮ টি সিনেমার মধ্যে ১০ টির বেশি সিনেমার কথা বলা যাবে না যা মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ফলে, ঢালিউডে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।  ঢালিউড কেন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনাকর্ষণীয় খাতে পরিণত হয়েছে তা আরও গভীরভাবে বোঝা যায় যদি এর বাজারটিকে বিশ্লেষণ করা যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজারকে এর চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র থেকে অর্জিত আয়, চলচ্চিত্রের বণ্টন বা হল পরিস্থিতি এবং বিপণন বা প্রচার এর আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১২ সালে। একটি চলচ্চিত্র একই সাথে একটি আর্টওয়ার্ক এবং বাজারের দিক থেকে একটি পণ্য বা সেবা। দর্শক এর গুণগত মান বিচার করেই পণ্য বা সেবাটি ক্রয় করেন।  সিনেমা তৈরির কাজটি পরিচালকের নেতৃত্বে হয়ে থাকে। এর সাথে জড়িত থাকেন অভিনয়শিল্পী, সিনেমাটোগ্রাফার, শব্দ প্রৌকৌশলী, ভিডিও এডিটর, কোরিওগ্রাফার, সঙ্গীত আয়োজক সহ আরও অনেক কলাকুশলী। এগুলোর প্রতিটিই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে এ দেশে বেশ ক’জন গুণী নির্মাতা জন্মেছেন। তারা সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় এই দক্ষতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছেন।  কিন্তু টেকসই ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হলে এই জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকতে হয় যা ২০১২ সালের পূর্বে বাংলাদেশে ছিল না। উল্লেখ্য যে, একজন রাজকুমার হিরানি, শুভাষ ঘাই কিংবা সঞ্জয় লীলা বানসালি তৈরিতে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া,পুনে’র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যান্য কলাকুশলীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা টেলিভিশন নাটক এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণে দক্ষ হয়ে তারপর সিনেমা নির্মাণের পথে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীদের অধিকাংশই আসেন ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। যদি প্রথম ছবি হিট হয় তবেই তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পারেন। তবে মঞ্চে বা টেলিভিশন নাটকে অভিনয় দিয়ে শুরু করে বেশ ক’জন শিল্পী সিনেমাতেও ভালো করেছেন। চঞ্চল চৌধুরীর নাম এখানে উল্লেখযোগ্য।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বলিউডের একটি গড়পড়তা ছবিতেই এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘বাজিরাও মাস্তানি’তেই বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা । ৬০ বছর বয়সী ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ কোটি টাকার উপর আয় করেছে মাত্র ৩ টি সিনেমা।  গড়ে একটি সিনেমা বানাতে বাংলাদেশে গড়ে খরচ হয় ৯৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ সুপারস্টার শাকিব খানের একটি ছবি থেকে গড়ে আয় হয় মাত্র ৩৮-৪০ লাখ টাকা। তাই প্রযোজকরা হাত গুটিয়ে নিয়েছেন এই খাত থেকে। একজন প্রযোজকের ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালে ঈদের সিনেমা এবং আয়নাবাজি সিনেমা ছাড়া কোনো সিনেমাই লাভজনক হয় নি। অন্যদিকে, একটি সিনেমা হলে  সিনেমা প্রদর্শিত হলে মোট আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ আসে প্রযোজকের হাতে, ৪০ শতাংশ থাকে হল মালিকদের হাতে আর বাকি ৪০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ যায় সরকারের কাছে। এই আয়ে ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে চলচ্চিত্র খাতে নতুন কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত হলেও প্রযোজকরা কোনো ব্যাংক ঋণ পান না।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমা প্রদর্শিত হয় সিনেমা হলে। কিন্তু এই সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। কারণ একটি সিনেমা হল চালানোর সুযোগ ব্যয় (অপরচুনিটি কস্ট) সিনেমা হল চালানোর তুলনায় অনেক বেশি। সিনেমা হলের পরিবর্তে একটি সুপারমার্কেট স্থাপন করলে সেখান থেকে ঢের বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। ২০০০ সালে যেখানে হলের সংখ্যা ছিল ১২০০, ২০১০ সালে ছিল ৭২২টি আর ২০১৬ সালে হয়েছে মাত্র ৩৩০ টি । এই হারে কমতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো প্রথাগত সিনেমা হল বাংলাদেশে থাকবে না।

সিনেমার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রেও এফডিসি-কেন্দ্রিক মূলধারার সিনেমাগুলোর প্রথাবদ্ধতা দেখা যায়। প্রচারের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় রঙ্গিন পোস্টার। কোনো ইনোভেশন থাকে না সেই পোস্টারে, ৩০ বছরের পুরনো স্টাইল এখনো অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়নাবাজি’র ৩৬০ ডিগ্রি কমিউনিকেশন বাংলা চলচ্চিত্রের বিপণনে একটি আদর্শ হিসেবে থেকে যাবে। এছাড়া ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাজ মাল্টিমিডিয়ার বিপণন কৌশলেও নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটের পেছনে রয়েছে চলচ্চিত্রের বাজার বা দর্শকদের প্রতি সংবেদনহীনতা, চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারে প্রতিষ্ঠানের অভাব, সুষ্ঠু সাপ্লাই চেইনের অভাব, পেশাগত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং সর্বোপরি সরকারের নীতি দূর্বলতা। বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এ বিষয়গুলোর প্রতিটিতেই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে হবে এবং উদ্যোগ নিতে হবে।

 

weekly

গল্পের পৃথিবী

 

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৩তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

গল্পের পৃথিবী

প্রবক্তা : কিঙ্কর আহ্সান

সময় : ২১ জুলাই শুক্রবার, বিকাল ৪.০০ মিনিট

লেকচার সারাংশ

পৃথিবী অসংখ্য ছোট ছোট গল্প দিয়ে তৈরি। মা-বাবার গল্প, ভাই-বোনের গল্প, প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প, বন্ধুত্ব ও বৈরিতার গল্প, রাজনৈতিক কিংবা নিতান্ত শিল্প-সৌন্দর্যের পূজারী গল্প, স্বদেশীয় কিংবা আর্ন্তজাতিক গল্প, কালিক কিংবা ধ্রুপদী গল্প। এই গল্পগুলো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে,  জীবন যাপনের ধারা কেমন হবে তা নির্ধারণ করে। অস্থিরতার পৃথিবীতে একটা ভালো গল্প হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়স্থল। আমরা ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখি। একটা খারাপ গল্প আবার করোটিতে প্রবেশ করে আমাদের অন্ধকার পৃথিবীর দিকে নিয়ে যায়। আমরা অসহায়বোধ করি।

জীবনে আমাদের গল্পের এই প্রভাব দেখে ব্যবসা করছে অনেকেই। দেদারসে চলছে বিকিকিনি। অপ্রয়োজনীয় গল্পের ঝাঁ-চকচকে দোকান খুলে বসেছে দোকানদাররা। এই সব গল্প থেকে শিখে আমরা একটা ধার করা জীবন যাপন করছি। নিজেদেরকে হারিয়ে চকচকে জীবনের নেশায় হীনমন্যতার পরিচয় দিয়ে নিজেকে জাহির করার এক অসম্ভব খেলায় মেতে উঠছি সবাই। বিজ্ঞাপন, সিনেমার খারাপ গল্পের ফাঁদে পড়ে বই পড়ার চেয়ে প্রোফাইল পিকচার বদলানো জরুরী হয়ে উঠেছে, আন্তরিক চুম্বনের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে চেক ইন দেওয়া, আড্ডার চেয়েও প্রয়োজনীয় চ্যাটবক্স, অনলাইন। কেমন একটা মুখোশ পড়ে ঘুরতে হচ্ছে সারাদিন। নিজস্বতা হারিয়ে অপরের বানানো-দেখানো গল্পে ভেসে ভেসে পথ চলছি আমরা,। নষ্ট হচ্ছি। ধ্বংস হচ্ছি। পঁচে যাচ্ছি। পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে কিন্তু টের পাচ্ছিনা। নিজের অজান্তে গল্প কিনে বেড়াচ্ছি আর বখাটে গল্পের জন্ম দিয়ে যাচ্ছি। নতুন কিছু নেই। সেই একই সকাল, একই সন্ধে, একই রাত। ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও বেদনার বেনোজলে ভাসতে ভাসতে ফুরিয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন একটু একটু করে। ভালো গল্প কই? গল্পের পৃথিবীতে এ কাদের আগ্রাসন?

একটা সুন্দর সকাল, ওম ওম গরম, রোদের লুকোচুরি, সূর্যরশ্মির শিশির দানা খুটে খাওয়া, বাটারবন, তিতকুটে রং চা, বাবার ধমক, মায়ের আদর এইসব গল্প বিলুপ্ত। পপকর্ণ, সেলফি, অ্যারোপ্লেনের প্রভাবে কেমন কোনঠাসা পারিবারিক ইমোশান! আলগোছে ছেড়ে দেওয়া শহরের গান, সময় পোড়ানো বন্ধুত্ব, মফস্বল শহরের প্রতিবেশী, ধার করা বই, গ্রামের খড়কুটো সব ফিকে হয়েছে। বড় বেশি শক্তিশালী অপরিচিত বর্ণ, শব্দের গান গ্লোবাল হবার নেশায়। এখন গ্লোবাল নয় বরং সবাই গ্লোকাল (গ্লোবাল + লোকাল = গ্লোকাল) হতে চায়।

নিজের সৎ গল্পের বুনিয়াদ সবচেয়ে মজবুত। তার ওপর দাঁড়ালে আলাদা হওয়া যায়। অথচ আমরা, আমি এলোমেলো গল্পের ভিড়ে খেই হারিয়ে একদম নাস্তানাবুদ শেষে। বইয়ের জায়গা এখন জাদুঘরে। পড়াশোনায় বিশেষ অনুরাগ নেই। ওসব পিছিয়ে পড়া মানুষের কারবার। লাইফস্টাইল প্রয়োজন। প্রয়োজন খুব বেশি গ্ল্যামার। গল্পের পৃথিবীতে নিজের, নিজেদের গল্পগুলো গ্ল্যামারাস হয়ে উঠছে না। কোথায় প্রোডাক্ট ঢুকবে, ব্র্যান্ড-এর সাথে ফিট ইন কিনা সেই যুক্তি বাদ দিয়ে বিক্রির আশায় তুলে দিচ্ছে যাচ্ছেতাই। দিনশেষে সারবত্তা কিছু নেই। দিনশেষে গল্পের প্রবল শক্তি টের পাওয়া যায় না। লড়াই করবার সময় চলে এসেছে। ঝুঁকে আর একদিনও নয়। একটা লোকাল গল্প বলে দেশের বাইরে ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়েছে কিছুদিন আগে শুধু সততার জন্য। ভালো কিছুর সমাদর সব জায়গায়। আমরা কেন জানি বড্ড হীনমন্যতায় মরিচীকার পেছনে ছুটে মরছি। নিজের জীবনটাকে নিজের মতন করে যাপন করা প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজন হয়ে উঠেছে একটু মেডিটেশন, সুস্থির হওয়া। নিজেকে চেনাটা জরুরী। নিজের গল্পেই এর পরিত্রাণ। নিজেদের গল্পেই শেকড়ের কথা আছে। সিন্ডিকেট, লবিং, পিআর, প্রচুর মিডিয়া বায়িং, হুড়োহুড়ি করে মানুষের কাছে যাওয়া যাচ্ছে বটে তবে তার কোনোকিছুই মানুষের অন্তরের কাছে পৌঁছানোর জন্য জরুরী নয়। অযথা গল্প বলে আর অবিশ্বাসের দেয়াল না তোলাই ভালো। ক্ষান্ত দিয়ে অস্থির একটা সময়কে বরং শান্ত করবার সময় চলে এসেছে। তার জন্য গেরিলা-মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে নতুন সব সারপ্রাইজ নিয়ে বাজারে ঢোকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে কিছু হাতেগোনা মানুষ। কেনো করছি, কী করছি সেসব প্রশ্নের উত্তর গল্পের ভেতর দিয়েই গল্পটাকে নিজের সাথে যুক্ত করানোর চেষ্টায় দিনভর সংগ্রাম চলছে। ফলাফল এতে আহামরি না হলেও শূণ্য নয়। মননের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যতটা না নিজের জন্য বাঁচি, তার চেয়েও বেশি অন্যের জন্য বাঁচি। এই বেঁচে থাকা, দিন পার করবার জন্য মানবজাতিকে নিজ নিজ গল্পের কাছে ফিরতেই হবে। নিজের গল্পের কাছে আশ্রয় নিতেই হবে। আর না হলে খুব শীঘ্রই গল্পকাররা হয়ে উঠবেন দুস্প্রাপ্য। গল্পগুলো হয়ে উঠবে বিলুপ্ত। আমরা নিখোঁজ হয়ে তখন অদ্ভূত এক গোলকধাঁধাঁয় আটকা পড়ে যাবো আজীবনের জন্য। সেটা হতে দেওয়া যায় না। গল্প, গল্পকাররা বাঁচুক। মানুষ নিঃশ্বাস নিক গল্পে গল্পে।