Browsing Tag

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

Monthly News

নজরুল বিদ্রোহী হয়েছেন মানুষকে ভালোবেসে-রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের মাসিক পাবলিক লেকচারে ড. গোলাম মুরশিদ

১৭তম মাসিক পাবলিক লেকচার
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামই প্রথম রক্ত-মাংসের মানুষের জয়ধ্বনি ঘোষণা করেছেন “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই” চণ্ডীদাসের এই উক্তি আমাদের সাহিত্যে মানবতার বাণী হিসেবে মহীয়ান হয়ে আছে। কিন্তু এই ‘মানুষ’ হল মনের মানুষ, আরাধ্য দেবতা, রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘নান রূপে নজরুল’ শীর্ষক মাসিক পাবলিক লেকচারে এসব মন্তব্য করেন বিশিষ্ট সমাজ-গবেষক ড. গোলাম মুরশিদ। তিনি বলেন, নজরুল প্রধানত প্রেমিক, তিনি বিদ্রোহী হয়েছেন মানুষকে ভালোবেসে। মানুষের উপর যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন চলছিল তার প্রতিবাদে। তবে তার বিদ্রোহ ও প্রেমের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তার অধিকাংশ কবিতাই প্রেমের কবিতা, দ্রোহের কবিতা কম। তার প্রেম ও মানবপ্রীতি ছিল তুলনারহিত। এই মানবতাবোধই তার কবিতায় প্রধান হয়ে উঠেছিল।

‘বিদ্রোহী কবি’- নজরুল সম্পর্কে প্রচলিত এই একমাত্রিক ধারণা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, এ-পরিচয় জনপ্রিয়, কিন্তু খণ্ডিত। তিনি আগাগোড়া বিদ্রোহী ছিলেন না কিংবা তা-ই তার বড় পরিচয় নয়। তিনি জীবনের একেকটা সময় একেক  রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। বস্তুত কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন নানা নজরুলের একটি মালা। অন্যদিকে, কবি নজরুলের চেয়ে সংগীতকার নজরুল আরও বড়। তার গানের অনেক ধারার মধ্যে প্রেমের ধারাই প্রধান। আবার তিনি একই সঙ্গে রচনা করেছেন শ্যামা, বৈষ্ণব (কীর্তন) ও ইসলামি সংগীত। এই তিনটি ধারা পরষ্পর বিরোধাত্মক। নজরুল তাঁর ভক্তির সূত্র দিয়ে এই তিনটি পরস্পরবিরোধী ধারাকে একই মালায় গেঁথেছেন। এ হচ্ছে বহুর মধ্যে ঐকতান।

আশার ছলনে ভুলি নামে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই বিখ্যাত জীবনীর রূপকার ড. গোলাম মুরশিদ এবার রচনা করছেন নজরুলের জীবনী। এই জীবনী রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা মিথোজীবী জাতি। মিথ আমাদের সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। নজরুলের জীবনও নানা মিথে প্রচ্ছন্ন কুহেলিকায় রূপ নিয়েছে। আমার নজরুল-জীবনী লেখার উদ্দেশ্য সেই কুহেলিকার চাদর সরিয়ে দেয়া।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. এনামুল হক। তিনি বলেন, অসুস্থ কবি নজরুলের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি, তাঁর বিরল ছবি তুলেছি। আজকের আলোচনা থেকে নজরুল সম্পর্কে অনেক গুজব, অসত্য কথনের অবসান হল।

উল্লেখ্য, রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের বিভিন্ন মাসিক পাবলিক লেকচারের বক্তা ও সভাপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, ড. আকবর আলি খান, ড. মিজানুর রহমান শেলী, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, মাহফুজ আনাম, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. আহরার আহমদ, ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদ, ড. আতিউর রহমান, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. জাহিদ হোসেন, ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। এছাড়া, প্রতি শুক্রবার বিকেল ৪টায় জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স হলরুমে ক্লাবের নিয়মিত সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার অনুষ্ঠিত হয়।

News weekly

জ্ঞানের অভাবেই বাংলাদেশে পপুলার আর্ট সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

জ্ঞানগত সংকটের কারণেই আমরা জনপ্রিয় ধারার শিল্পকলা সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে চরম অসচেতনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। সামষ্টিক জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সচলতাই আমাদের এই জাতিগত অপিরণামদর্শিতা থেকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স হলরুমে আয়োজিত রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের  ২৭৭ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে উপরোক্ত মন্তব্য করেন বক্তা শিল্পী শাওন আকন্দ। লেকচারের বিষয় ছিল পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ : স্পেশাল ফোকাস অন রিকশা পেইন্টিং এ্যান্ড সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির বিকাশ-পরবর্তী বিশ্বায়নের পৃথিবীতে শিক্ষিত উচ্চকোটির শিল্পচর্চার বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা-ঘনিষ্ঠ শিল্প-সংস্কৃতির ধারা, তাদের শিল্পবোধ, সংস্কৃতি-সচেতনতা এবং শিল্পকর্মে তাদের জীবনের প্রতিফলন- এই হল পপুলার কালচারের আপাত:পরিধি। কিন্তু সাধারণের সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতার কারণেই সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং এবং রিকশা পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা-গবেষণায় আমরা আগ্রহী নই। অথচ এগুলো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

সিনেমা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সিনেমা পেইন্টিং-এর ইতিহাস প্রায় একশ বছরের। রবি বর্মা, বাবুরাম পেইন্টার প্রমুখ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর হাতে সিনেমা ব্যানার শিল্পের আদি ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের  যাত্রা শুরু হওয়ার পর সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ের বিকাশের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে আসা অবাঙালি মুসলমানরা। নিতুন কুণ্ডের মত প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরা যুক্ত হলেও নিম্নবর্গের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরাই ছিলেন এই শিল্পের প্রাণ। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই অনন্য ধারা আজ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর সংরক্ষণে আমাদের ন্যূনতম উদ্যোগ নেই। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন গবেষণা হয়নি, এর পরে যা হয়েছে তা অপ্রতুল। ন্যাশনাল ফিল্ম  আর্কাইভে সিনেমা ব্যানার পোস্টার সংরক্ষণ করা হয় না। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য নেই কোন উদ্যোগ।

রিকশা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, রিকশা পেইন্টিং গ্রামে দেখা গেলেও তা প্রধানত নাগরিক নিম্নবিত্তের শিল্পকলা। রিক্সার উদ্ভব জাপানে। ১৯৪০-এর দশকে বাংলাদেশে রিক্সার  প্রচলন ঘটে। বিষয় অনুষঙ্গ, রঙের ব্যবহার ইত্যাদি দেখে ধারণা করা যায় রিক্সা আর্টেও অবাঙালি মুসলমানদের অবদানই প্রধান। এই শিল্পের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার কোন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। রিক্সা আর্টের বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ- সিনেমার নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে তাজমহল, বোরাক, মরুভূমি, টাইটানিক, পশু-পাখি, হেলিকপ্টার, সমুদ্র, শহরের ছবি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক অবিচার, আলাদীনের দৈত্য কিংবা ইরাক যুদ্ধ। সমসাময়িক সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও উঠে এসেছে কখনো। যেমন- এরশাদের  স্বৈর শাসনামলে রিক্সায় মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে, রিক্সা আর্টে দেখা গেছে মানুষের বদলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে সিংহ। রিক্সা আর্ট নিয়ে গবেষণায় যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তার কারণ বিদেশিরা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নয়, রিক্সা আর্ট-এর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা জাপানে- এ আমাদের জন্য অপমানজনক।

বক্তব্যের উপসংহারে তিনি বলেন,  সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ও রিক্সা পেইন্টিং- দুটি শিল্পই আজ বিপন্নপ্রায়। অথচ এগুলোর সংরক্ষণ এবং এই বিষয়ক গবেষণায় আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যৎসামান্য। অথচ এই শিল্পগুলো আমাদের সামজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যরকম বয়ান শুধু নয়, তা আমাদের মূলধারার শিল্পচর্চাকেও সমৃদ্ধ করছে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই ঔদাসীন্য, এই আত্মঅবমাননার বীজ আমাদের সংস্কৃতির গভীরে নিহিত। জ্ঞানগত সংকট নিরসনের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভবপর হবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম বলেন, পপুলার আর্ট বা জনপ্রিয় ধারার শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও সংরক্ষণে ব্যর্থতার মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা। একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য এই শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণ জরুরি ।

সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের হেড অব রিসার্চ ও ট্রান্সলেশন ডিভিশন রাশেদ রাহম বলেন, পপুলার কালচার বৃহত্তর অর্থে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। এসব ডিসিপ্লিনে আমাদের অবদান প্রায় শূন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘প্রেসক্রাইব্ড বুকস’-এর ৯৫% উৎপাদিত হয় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হীনম্মন্যতার কারণ তাই আমাদের জাতীয় জ্ঞানকাণ্ডের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিশীল হলেই জাতীয় সমৃদ্ধির পথ রচিত হবে।