Browsing Tag

বাংলাদেশ

News weekly

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রেস রিলিজ

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি। গ্রামের ইতিহাস হিসেবে যা লেখা হয়েছে তা মূলত জোতদার শ্রেণি ও ক্ষমতাশালীদের ইতিহাস। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, কৃষকদের ইতিহাস সেখানে উঠে আসেনি যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ডাচ গবেষক ভেল্যাম ভ্যান শেন্ডেলের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণা সম্পর্কিত আলোচনায় তার  বরাতে উপরোক্ত মন্তব্য করেন রিডিং ক্লাবের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের প্রবক্তা আতাউর রহমান মারুফ।

বাংলাকে “সোনার বাংলা” বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে একজন বিদেশী ইবনে বতুতার। তিনি বাংলায় জিনিসপত্রের প্রতুলতা ও এর দাম সস্তা  বলে এই নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় গবেষকগণ অবশ্য সোনার বাংলাকে ‘মিথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রবক্তা ইবনে বতুতার সূত্র ধরে বিদেশী পণ্ডিতদের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর। কিন্তু বঙ্গদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের গবেষণাধর্মী কাজের সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে। স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারের “A Statistical Account of Bengal”-সহ অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থ এখনো বঙ্গদেশ বিষয়ক গবেষকদের জন্য অবিকল্প প্রামান্য গ্রন্থ। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট জি. সেক ১৯০৬-১৯১০ সময়কালীন ফরিদপুরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল- “The Economic Life of a Bengal District”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্বক গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে নেদারল্যান্ডের নাগরিক ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় উপেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাছাড়া, তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামজিক অবস্থা, নৃতাত্বিক বিবর্তনসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

তাঁর “A History of Bangladesh” বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল এ বইটির রিভিউতে বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কাজগুলো হয়েছে তার মধ্যে এটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। ভ্যান শেন্ডেলের ১২টি বই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক বই ছয়টি। তাঁর মৌলিক গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থ সাতটি ।

শেন্ডেল বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের গতিশীলতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। আমাদের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। আমাদের নীল অর্থনীতি (নীল চাষ) সম্পর্কে গবেষণা  করেছেন । পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশে রেশম শিল্প সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে কিন্তু রেশম নীতি সাধারণ মানুষকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে- এ সম্পর্কে কোন গবেষণা হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন।

শেন্ডেলের ১৯৮১ সালে প্রকাশিত  “Peasant mobility : The Odds of Life in Rural Bangladesh Studies of Developing Countries” বইতে আমাদের কৃষক পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কৃষকের পরিবার ও তাদের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা হয়নি । ১৮৮০-১৯৮০ এই একশত বছরের কৃষক গতিশীলতার  ইতিহাস তাঁর বইয়ে আলোচিত হয়েছে।

২০০০ সালে  শেন্ডেলের  “Chittagong Hill Tracts: Living in Borderland”  বইটি প্রকাশিত হয় । বইটিতে তিনি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বইটি লেখার কারণ  হল পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশে সর্বদা উপেক্ষিত হয়েছে। শেন্ডেল এই বইয়ের জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ টি সূত্র থেকে ছবি সংগ্রহে করেছেন ।

শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা অপর্যাপ্ত। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করলে, আরো নতুন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কিন্তু একইভাবে নাইজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ  ব্যর্থ হয়েছে কেন? এ বিষয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে অন্য গণহত্যার সম্পর্ক বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সাধারণ মানুষের ইতিহাস লেখার চেষ্টা তার অন্যতম বড় গুণ।

সবশেষে বক্তা শেন্ডেলের বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদের কথা বলেন। শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি, যারা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র  হিসেবে গড়ে তুলবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম শেন্ডেলের বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ-কেন্দ্রিক গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, তাঁদের গবেষণায় প্রান্তে বসবাসকারী মানুষরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু শেন্ডেল এই প্রান্তিক মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন । তিনি কৃষকদের নিয়ে, আদিবাসী নিয়ে এবং সীমান্ত নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের  সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আদিবাসীদের সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তিনি এও বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবিক তা বোঝা যায়, সেই রাষ্ট্র তার প্রান্তিক জনগণের প্রতি কতটুকু আন্তরিক- তার উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লিপিকা বিশ্বাস অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে জিডিপি-নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, জিডিপি কার বৃদ্ধি পাচ্ছে? ধনী আরো ধনী হচ্ছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সমাজে অর্থনৈতিক  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জামশেদ সাকিব তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা  করেন। রাশিয়ায় ১৩-১৪ বছরের পূর্বে কেউ কৃষির উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত হয় না । কিন্তু বাংলাদেশে ৬ বছর বয়স  পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া শুরু করে । ফলে সে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

শেন্ডেল রচিত বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনালোচিত অনুষঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেন তুহিন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ১৮ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেয়া ত্রিপুরার অবদান অনালোচিত । ত্রিপুরার মেলাঘয়ে সেনাবাহিনী সদস্যেদের প্রশিক্ষণের ঘটনাও অনালোচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করার প্রয়োজনীয়তা কথা বলেন তিনি।

শেন্ডেল বিষয়ক আলোচনার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। আমরা কতটা অথর্ব শেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে তা বোঝা যায় । কারণ একজন বিদেশী আমাদের কাজ করে দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারিনি। সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন । তিনি বলেন, শেন্ডেলের বইয়ের প্রচ্ছদে একজন রিকশাওয়ালার ছবি। তাঁর মতে রিকশাওয়ালারাই বাংলাদেশ । কারণ বাংলাদেশে রিকশাওয়ালারা খণ্ডকালীন বেকারত্ব লাগব করতে শহরে আসে। আবার কৃষি কাজের সময় গ্রামে চলে যায় । অর্থাৎ সে গ্রাম ও শহর দু’জায়গায়ই বসবাস করে। আরিফ খানের মতে, শেন্ডেল রিকশাওয়ালার মাধ্যমেই  Making sense of contemporary Bangladesh বোঝাতে চেয়েছেন । শেন্ডেল তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ঋণী করে ফেলেছেন। কারণ তাঁর কাজগুলো আগামী ৫০-১০০ বছর পরে হলেও আমাদেরকে করতেই হত। কিন্তু শেন্ডেল তা আগেই করে আমাদেরকে ঋণগ্রস্ত করেছেন ।

একটি জাতির বোধোদয় হয় তার ইতিহাস জানার মাধ্যমে। আমাদের ৫২-র ফেব্রুয়ারীর বীজ বেড়ে উঠতে ৮০০ বছরের অধিক সময় লেগেছে। পৃথিবীতে বহু ভাষা, জাতি বিলুপ্ত হয়েছে । বাঙালি জাতির টিকে থাকার রহস্য জানা যায়  শেন্ডেলের কাজের মাধ্যমে। আমাদের দুর্বলতা বোঝার জন্য আমাদেরকে শেন্ডেলের কাজের দিকে তাকাতে হবে।

 

weekly

ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারিসটোক্রেসি ইন বেঙ্গল: দ্য পোস্ট-পার্টিশন ফেনোমেনন

রিডিং ক্লাবের ২৬৫ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম

এপ্রিল ২৯, ২০১৭

স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

ইন্টেলেকচুয়াল অ্যারিসটোক্রেসি ইন বেঙ্গল

দ্য পোস্ট-পার্টিশন ফেনোমেনন

লেকচার সারাংশ

১৯৪৭ সালের দেশভাগ (বাংলা ভাগ) নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা কিংবা শিল্প-সাহিত্যে তার প্রতিফলন প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক। কারণ, যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম এবং যে প্রক্রিয়ায় বাংলা বিভাজিত হয়েছিল, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসী হতে বাধ্য হওয়া বাঙালিদের জন্য তা ছিল রাজনৈতিক গন্তব্যের শেষ পেরেক। স্বাধীন ভারতের নাগরিক হতে গিয়ে তাদের পিতৃভূমি থেকে উৎপাটিত হতে হয়েছে, সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের কাছে নিজেদের বাঙালি জাতীয়তাবোধকে বিসর্জন দিতে হয়েছে এবং পূর্ববঙ্গের স্বতন্ত্র গ্রামীন সংস্কৃতি থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষত কলকাতার নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে, সমাজ-রাষ্ট্রে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে এবং ফলে তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সাথে নানারকম বোঝাপড়া হলেও তা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটেনি, তার প্রমাণ হলো পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে কিংবা চলচ্চিত্রে এখনো দেশভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে অভিবাসী হয়ে পূর্ববঙ্গে আসা বাঙালি মুসলমানদের জন্য দেশভাগ ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। তুলনামূলক অবিকশিত সমাজে এসে তারা সহজেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছেন। কিন্তু দেশভাগের ক্ষত ভুলতে তাদের জন্য প্রধান ঔষধি হিসেবে কাজ করেছে- পূর্ববঙ্গে বাঙালির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা বিকাশের অমিত সম্ভাবনা নিয়ে আসা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রগামী গোষ্ঠী হিসেবে সেই আন্দোলনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ফলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এখন তাদের জন্য দূরবর্তী ও স্মৃতিতে ধুসর ঐতিহাসিক ঘটনা মাত্র। ফলে, স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেশভাগ নিয়ে আলোচনা-গবেষণা বাংলাদেশে প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভ্যূদয়ের ইতিহাসে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে দেশভাগ। কিন্তু এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোন অ্যাকাডেমিক আলোচনা নেই। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এই বিবেচনা থেকেই আজকের লেকচারের আয়োজন।

সুদীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অধিকারী কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় যাদের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠার প্রধান উৎস ঐতিহ্যিকভাবে আয়ত্ব বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, সাধারণত তাদেরকে বোঝাতে “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত” শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দু বর্ণপ্রথার সর্বোচ্চ স্তর ব্রাহ্মণদের “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত” হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে বিদ্যা অর্জন ও বণ্টনব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের বহু শতাব্দীর একচ্ছত্র আধিপত্য ব্রিটিশ শাসনামলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এসে হাতছাড়া হয়ে যায়। রামমোহন রায় (১৭৭৩-১৮৩৩) প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্ম প্রথম সেই আধিপত্যে আঘাত হানে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রাহ্মধর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিঃশেষিত হয় এবং তা হিন্দুধর্মের একটি শাখা হিসেবে অবলুপ্ত হয়। ব্রাহ্মধর্মের ভূমিকা ঐতিহ্য-সংশ্লিষ্ট ছিল, বিযুক্ত নয়।

কিন্তু ঔপনিবেশিক সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঐতিহ্যিক পেশা ও কুলবৃত্তির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উনিশ শতকের প্রথমার্ধে স্বল্পশিক্ষিত বাণিজ্যনির্ভর ‘বাবু’ শ্রেণি এবং দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানত শিক্ষা-নির্ভর, ‘ভদ্রলোক’ নামে বিশেষায়িত ও ঐতিহ্যবিযুক্ত এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠে, যাদেরকে বৃহত্তর অর্থে নতুন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত‘ শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই নতুন শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণিতে পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য এবং প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের অবাঙালি ও অভিবাসী মুসলিম অভিজাতরাই আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের পারিবারিক আভিজাত্যের সাথে যুক্ত হয়েছিলো নবলব্ধ বিদ্যার আভিজাত্য, বঙ্গের সোহরাওয়ার্দী পরিবার যার যথার্থ উদাহারণ। ঐতিহ্যবিযুক্ত ও আধুনিক শিক্ষা-নির্ভর মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়েছিলো বিলম্বিত এবং তাও কলকাতাকে কেন্দ্র করে। কারণ, প্রথম পর্বের শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মানেই ছিলো কলকাতায় শিক্ষিত কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি মুসলমান।

১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতাই ছিলো বঙ্গেদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী, ঔপনিবেশিক কাঠামোর কারণে যা ছিল অতি কেন্দ্রীভূত (over-centralized)| পশ্চাদভূমি পূর্ববঙ্গে উনিশ শতকের নবজাগরণের উদ্দীপনা পৌঁছেছিল প্রধানত ব্রাহ্ম আন্দোলনের পথ ধরে, তাও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল সীমাবদ্ধ। সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগই ছিল অপ্রতুল। অভিজাত মুসলমানদের আবাসভূমিও ছিল না পূর্ববঙ্গ। সর্বোপরি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ একটা অঞ্চলে বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির শর্ত তৈরি হতে পারেনি। ফলে, ৪৭-পূর্ববর্তী পূর্ববঙ্গে কোন ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তৈরি হয়নি। এর একটা প্রমাণ ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বা ‘শিখাগোষ্ঠী’, পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো যার মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই তার অকালমৃত্যু ঘটেছিলো। শুধু তাই নয়; আন্দোলনের প্রবক্তাগণ ষোল শতকের গ্যালিলিওর মতো নিগ্রহের শিকার হয়ে, মুচলেকা দিয়ে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই একই পশ্চাৎভূমিতে দেশভাগের পাঁচ বছরের মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের মতো অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল আন্দোলন কীভাবে সম্ভাবিত হয়েছিলো? এই আন্দোলন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক চিন্তাভিত্তি কীভাবে তৈরি হয়েছিলো? শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার উপর অতি-গুরুত্বারোপ করে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কারণ, ১৯৪৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ১৫০০ প্রায়, যার অধিকাংশ ছিলো হিন্দু। দেশভাগের ফলে হিন্দু শিক্ষকদের ভারতে চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট সংকট এবং নতুন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর অত্যাধিক চাপের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কানা হয়ে গিয়েছিলো। এই প্রেক্ষিতেই আসে পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে পূর্ববঙ্গে অভিবাসী হয়ে আসা বাঙালি মুসলমানদের প্রসঙ্গ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পূর্ববঙ্গের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তাদের কি বিশেষ কোন ভূমিকা ছিলো? যদি থাকে, তবে সেই ভূমিকার বিশ্লেষণ থেকে কি আমাদের উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে? এই লেকচারে এসব প্রশ্নের উত্তর, বিশেষত ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের অভিঘাতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সামগ্রিক চিন্তাকাঠামোতে কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তার অনুসন্ধান করা হবে।

Monthly

বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র

রিডিং ক্লাবের ৭ম মাসিক পাবলিক লেকচার

বিষয়: বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র

বক্তা: আরিফ খান

সভাপতি: ড. মিজানুর রহমান শেলী

তারিখ: ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৪টা

স্থান: জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ

লেকচার সারাংশ

অবিভক্ত পাকিস্তান আমলে চব্বিশ বছরের সকল সংগ্রাম ও আন্দোলন মূলতঃ একটি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর সংবিধানের দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে দুই যুগেও (১৯৪৭-১৯৭১) যখন তিন তিনবার একটি কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবিকল্প সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। ১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল জারিকৃত মাত্র পাঁচশত দশ শব্দের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে অসাধারণভাবে কেমন ও কোন পরিস্থিতিতে এ দেশের জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে তাদের রাজনৈতিক আকাঙক্ষা বাস্তবায়নের শেষ চেষ্টা হিসেবে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের শপথ গ্রহণ করেছে তা অনন্যসাধারণ ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় প্রথম আইনি দলিল। ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত মাত্র তিনটি শব্দ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে যে, “বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম…” অর্থাৎ গণবিমুখ ও নিপীড়নকামী পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর মডেল ছুঁড়ে ফেলে যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নির্ণয় করা হয়েছে- বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। এই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা। এই চেতনার সফল ও সার্থক বাস্তবায়ন হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

সুদীর্ঘ দুই যুগেও নিজেদের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের পাকিস্তানী ব্যর্থতার স্মৃতি নিশ্চয়ই নবসৃষ্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ফলে, অগণিত প্রাণ-ক্ষয়, বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট, চরম বিশৃঙ্খল প্রশাসন-ব্যবস্থা, নাজুক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদির মধ্যেও তাঁরা সবার আগে একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছেন এবং মাত্র ২০৯ দিনের মধ্যে একটি অদ্বিতীয় ও অসামান্য আইনি দলিল তারা জাতিকে উপহার দিতে পেরেছিলেন। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সেই দলিলের গড়ে উঠার ইতিহাস আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বাংলাদেশের সংবিধান মূলত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ও বাস্তবায়নের পথ নির্দেশক সুবিস্তৃত দলিল।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল ৫০ থেকে ৭০ ডলার। ২০১৬ সালে সেই আয় দাঁড়িয়েছে ১৪৬৬ ডলারে। সাত কোটি মানুষ নিয়ে যে-নতুন রাষ্ট্রের জন্ম সেই রাষ্ট্রের বর্তমান জনসংখ্যা ষোলো কোটির উপরে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার, আর ২০১৬ সালে আমাদের জাতীয় বাজেট হয়েছে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকার উপরে। ১৯৭৪ সালে দেশে শিক্ষার হার ছিল ২৫ শতাংশের কিছু বেশি, বর্তমানে এই হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। ১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুজন গবেষক (যেমন জাস্ট ফাল্যান্ড ও রিচার্ড পার্কিনসন) বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অবকাঠামোর সীমাহীন দুর্বল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নতুন রাষ্ট্রকে ‘উন্নয়নের টেস্ট কেস’ অভিহিত করে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। আবার আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (যেমন হেনরি কিসিঞ্জার) একে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামে আখ্যায়িত করেছিল। এখন সেই বিশ্লেষকগণই অসংখ্য রিপোর্ট ও গবেষণাপত্রে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবিত সাফল্য অর্জনকারী এক বিষ্ময়কর ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করছেন। উপরের তুলনামূলক প্রতিটি পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করে যে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার পূরণে আমাদের অর্জন অনেক তবে আশানুরূপ নয় ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই সুমহান সংবিধানকে সবসময় কেন্দ্রে রাখা হয়নি। গত পঁয়তাল্লিশ বছরে দুই দুইবার সামরিক স্বৈরাচারের থাবা এই সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে এবং তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার রূপকল্পের নিরিখে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে দেয়নি। তবে, শত ঘাত-প্রতিঘাত স্বত্বেও শহীদের রক্তের কালিতে লিখিত এই সংবিধান তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি, কোন দিন হারাবেও না। এই দলিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাক্ষাত লিখিতরূপ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বিজয়ের পর সুমহান উদ্দেশ্যে ও নিখাদ আনুগত্যের সঙ্গে আমরা এই দলিল প্রণয়ন করেছিলাম। ঠিক একই নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সকল কর্মযজ্ঞ সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও অধিকারসমূহকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠার ও বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করতে হবে। তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র’।

News

সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করাই মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা

প্রেস রিলিজ

৭ম মাসিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র
প্রধান বক্তা: আরিফ খান
সভাপতি: মিজানুর রহমান শেলী
ভেন্যু: জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ
সময়: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ শনিবার বিকাল ৪ টা

মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত হবে এরকম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সেটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা। গতকাল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ রিডিং ক্লাব ও আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ আায়োজিত “বাংলাদেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র” শীর্ষক এক পাবলিক লেকচারে এ কথা বলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল স্টাডিজ (বিক্স)-এর পরিচালক জনাব আরিফ খান। তিনি আরো বলেন, “অবিভক্ত পাকিস্তান আমলে চব্বিশ বছরের সকল সংগ্রাম ও আন্দোলন মূলতঃ একটি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর সংবিধানের দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে দুই যুগেও (১৯৪৭-১৯৭১) যখন তিন তিনবার একটি কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবিকল্প সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।”

রিডিং ক্লাব ও আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ যৌথভাবে এ লেকচারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও সাবেক তথ্যপ্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইদ বলেন; নাগরিক দায়িত্ব কি, বাংলাদেশের সংবিধানে তা উল্লেখ করা নেই। সেগুলো স্পষ্টভাবে সংবিধানে উল্লেখ করা উচিত। আমাদের সংবিধানে অনেকগুলো আইন প্রণয়ণের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো অতিসত্ত্বর প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত।

অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর ডেভেলেপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি)-এর চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান শেলী। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান সুন্দর। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এ সংবিধান কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে। আসলে এ সংবিধান এখনো পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এ সংবিধান বাস্তবায়ন করতে হলে সামাজিক শক্তি ও জনগণের শক্তিকে একত্রিতভাবে জেগে উঠতে হবে, তাহলেই সংবিধান বাস্তবায়ন হবে। শাসনক্ষমতায় যারা থাকেন, সংবিধান অনুযায়ী তাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। যদি তারা দায়িত্ববান না হন তাহলে সমাজ বিনষ্ট হয়ে যাবে। ক্ষমতায় থেকে যারা দায়িত্ব পালন করেনি, জনগণ তাদের কখনো ক্ষমা করবেনা।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান রিডিং ক্লাব ধারাবাহিকভাবে মাসিক লেকচার আয়োজন করে আসছে। এটা ছিল ৭ম মাসিক পাবলিক লেকচার। রিডিং ক্লাবের সর্বশেষ মাসিক লেকচার অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি অডিটোরিয়ামে। “নতুন বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক এই লেকচারে বক্তা ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

Uncategorized

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনঃ তাজউদ্দীন আহমদের অবদান

লেখক: সৈকত বিশ্বাস

বিশ্বের ইতিহাসে কয়েকটা রাষ্ট্র সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। এদের প্রত্যেকটা রাষ্ট্রই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করে।  যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেনারেল চার্লস দ্য গলের স্বাধীন ফরাসি সরকার। কিংবা পোল্যান্ডের প্রবাসী সরকার যার কার্যালয় ছিল লন্ডন।[1] তাছাড়া আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধও (১৭৭৫-১৭৮৩) পরিচালিত হয়েছে একটি বিপ্লবী সরকারের অধীনে[2]। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বেশ মিল পাওয়া যায়। তুলনামূলক ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। একই সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন জাতীয় নেতৃত্বের ভূমিকাকেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে একটি সার্বভৌম বিপ্লবী সরকারের অধীনে। বাংলাদেশেরও তাই। মার্কিনীদের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সহযোগিতা করে ফ্রান্স তেমনি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করে ভারত[3]। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা ও সরকার গঠন ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় যেমন সে দেশের জাতীয় নেতা  থমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬) ও আর কজন নেতা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে তেমনি, বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধের এই তাত্ত্বিক গুরু যেমন থমাস জেফারসন ডিকলারেশন অব ইনডেপেনডেন্স  সনদ ঘোষণা করেন[4] তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সহযোগিতায় তাজউদ্দীন আহমেদ।

তবে পৃথিবীর অন্যান্য প্রবাসী সরকারের তুলনায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার খুব দ্রুত সময়ে মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন করে। কারণ এই সরকার ছিল কাজে নিষ্ঠাবান, কূটনৈতিক সম্পর্কে ছিল খুবই তৎপর, পরিকল্পিত ও ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ছিল সুসংগঠিত। আর এই সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন ঠান্ডা মাথার ধীরস্থির চিন্তাশীল মানুষ, অপরিমেয় দূরদর্শী, আদর্শবান, আপোষহীন নেতা তাজউদ্দীন আহমদ।

এ প্রসঙ্গে এইচ টি ইমাম বলেন, প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যে এই সরকার গঠন করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একদিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ত্ব অন্যদিকে এক কোটির ওপর শরণার্থীর জন্য ত্রাণব্যবস্থা, দেশের অভ্যন্তর থেকে লক্ষ লক্ষ মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা, যুবাদেরকে যুবশিবিরে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন করে পাকিস্থানিদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি, স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ রাখা এবং সাথে সাথে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি- এ সবই ছিল প্রবাসী সরকারের অবিস্মরণীয় কীর্তি যা সমকালীন ইতিহাসের বিচারে অতুলনীয়।[5] কিন্তু আমেরিকা স্বাধীনতার পর জেফারসনের যেমন মূল্যায়ন হয়েছে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদকে তেমন মূল্যায়ন করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ড. আনিসুজ্জামানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে গনতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপরে নেমে আসে পাকিস্থান সামরিক বাহিনীর অমানুষিক আক্রমণ। বঙ্গবন্ধু তাদের হাতে বন্দি হন। তখন দেশবাসীকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাজউদ্দীন। দক্ষতার সঙ্গে সকল প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এই উদ্দেশ্য সাধনে তিনি সমর্থ হন।[6] তিনি আরও বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের কাছে এই জাতির ঋণের স্বীকৃতি আমরা যথাযথভাবে দেইনি’।[7]

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ করেও স্বাধীনতা ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালে অনেকটা রাজনৈতিক মীমাংসার মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা পাকিস্থানের সাথে রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানলে ১৯৫২ সালের চূড়ান্ত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি প্রথম বারের মতো ‘স্বদেশ যাত্রা’করে। এর পরে একে একে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণ অভুথানের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্ত্বার উন্মেষ ঘটে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনঅনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তান বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অসম্মত হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খান পূর্ব নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। ফলে পূর্ব পাকিস্থানের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়ে। এবং কার্যত এর পর থেকেই পূর্ব পাকিস্থান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্থান এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না করে সামরিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্থানকে সমূলে উৎপাটন করতে মনঃস্থির করে। ইয়াহিয়া আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে, অন্য দিকে বাঙালির উপরে হামলার জন্য সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে থাকে। এদিকে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয় এবং ৭ মার্চ সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে স্বাধীনতার ইঙ্গিত প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি আলোচনার দরজা খোলা রাখেন। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ গভীর রাতে নিরস্ত্র বাঙালির উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ইতিহাসের নারকীয় হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনতা ঘোষণার জন্যে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যেতে সম্মত না হলে তাজউদ্দীন আহমদ রুষ্ট হয়ে সাত মসজিদ রোডের বাসায় ফিরে আসেন।[8] কিছুক্ষণ পরে আমীর-উল ইসলাম ও কামাল হোসেন তাজউদ্দীনের বাসায় যান। এরই মধ্যে যখন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ মোজাফফর সাহেব পাকিস্থানি বাহিনী ইপিআরকে নিরস্ত্র করার খবর দেন তখন তাজউদ্দীন খুবই আশান্বিত হন। সাথে সাথে রাজারবাগের পুলিশের প্রতিরোধ আন্দোলনের কথা শুনতে পান। তখন তাজউদ্দীন ভাবেন ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বাঙালি আজ যুদ্ধের জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত। তাই তিনি অনেকটা সশন্ত্র অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যান অজানার পথে। ২৭ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে অবহিত হন। ২৫ মার্চ রাতেই ওয়ারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পর দিন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানসহ অনেকেই বেতারে পাঠ করেন এবং লিফলেট বিলি করে প্রচার করা হয়।

সরকার গঠন করা কেন প্রয়োজন ছিলঃ

তাজউদ্দীন আহমদ ২৫ মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে ফরিদপুর হয়ে কুষ্টিয়া সীমান্তে ৩০ মার্চ আসেন আমীর-উল ইসলামকে সাথে নিয়ে। এ সময় তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করেন এবং যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করবেন তার পরিকল্পনা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ আন্দোলন দেখে খুব উদ্বুদ্ধ হন। সাধারণ মানুষ গুলোকে হঠাৎ অসাধারণ হয়ে উঠতে দেখে তিনি ৭ কোটি বাঙালির মুক্তির পথ তৈরি করতে থাকলেন।

৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। তাজউদ্দীন উপলব্ধি করেন এখন এই যুদ্ধকে পরিকল্পিত জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে হবে। অপরিকল্পিত যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করা যাবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করতে হবে তার জন্যে চাই একটি সরকারের। তাছাড়া আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করতে একটি সামরিক বাহিনী গঠন করার খুব প্রয়োজন। অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক রসদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদানে ভারতীয় সহযোগিতা লাভ। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা ও এই মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা তখন খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহনের জন্যে ভারতের সহযোগিতার জন্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সরকার অবশ্যক হয়ে পড়ে।

সরকার গঠন করা যে কতটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে তা মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের লেখায় বোঝা যায়। তিনি লেখেন, “পরিকল্পনা করার জন্য প্রতিনিধি স্থানীয় কিছু যোদ্ধাকে নিয়ে আলোচনায় বসলাম। সৈনিকদের সবারই বক্তব্য, আমরা একটি দেশের সৈনিক। কিন্তু দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে এবং বিবেকের ডাকে বিদ্রোহ করেছি। এর পেছনে আমাদের যত মানসিক শক্তি এবং যুক্তিই থাকুক না কেন আমাদের শক্তি কিন্তু তেমন নেই। আমরা পাকিস্তানিদের দ্বারা প্রায় অবরুদ্ধ। যে কোন মুহূর্তে ওরা আমাদের ধরে ফেলতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি আসে তা হলে আমরা আইনানুগ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবো। কারণ এখানও প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্য। ওরা আমাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে বিচার করতে পারে। আর এই বিচারের রায় হবে জঘন্যতম মৃত্যু। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার গঠন অপরিহার্য। আমাদের যদি কেউ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তাহলে অন্তত প্রতিপক্ষ যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারবে এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবে।”[9] এমতাবস্থায় যদি সরকার গঠন করতে বিলম্ব করা হতো, তাহলে একাধিক আঞ্চলিক সরকার কিংবা বিপ্লবী কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। আর যদি সত্যি তা হতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কোন পথে যেতো তা বলা শক্ত। এই সকল গুরুত্ব অনুধাবন করে তাজউদ্দীন আহমদ দ্রুত সরকার গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

 ১৯৭২ সালে তাজউদ্দিন আহমদ একটি স্মৃতিচারণে বলেন, “যাবার পথে এদেশের মানুষের স্বাধীনতা লাভের যে চেতনার উন্মেষ দেখে গিয়েছিলাম সেটাই আমাকে আমার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে অনিবার্য সুযোগ দিয়েছিল। জীবননগরের কাছে সীমান্তবর্তী টঙ্গি নামক স্থানে একটি সেতুর নিচে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলোঃ একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।”[10]

যদিও তিনি জানতেন মুজিববিহীন আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দ্বন্দ্ব রয়েছে। কোন কোন নেতা তার সরকার গঠনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে পারেন। সত্যি সত্যি কিছু নেতা বিরোধিতা করেও ছিলেন। এ সংকটের আশঙ্কা থাকার পরও তাজউদ্দীন আহমদ কাল বিলম্ব না করে, বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সরকার গঠনের জন্য মনস্থির করেন। এ ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন গবেষক কামাল হোসেনের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে তিনি  ‘রিয়েল পলিটিক্স’ এর পরিচয় দেন”।[11]

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন ও তাজউদ্দীন আহমদের অবদানঃ

৩০ মার্চ তাজউদ্দীন ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে প্রবেশ করেন একজন আওয়ামী লীগের উচ্চপদস্থ নেতা হিসেবে। তিনি প্রথমে বিএসএফ এর আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার ও পরে বিএসএফ প্রধান রুস্তমজীর সাথে দেখা করেন। মার্চ মাসে ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্তের সাথে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাজউদ্দীনের আলোচনা হয়। আলোচনায় বলা হয় পাকিস্তান যদি বাঙালির উপর হামলা করে বাংলাদেশকে ভারত সরকার সাহায্য করবে কিনা। তাজউদ্দীন ভারতে প্রবেশ করে ভারতের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা বুঝতে পারেন সে আলোচনা কোন অগ্রগতি পায় নি। ভারত সরকারও কোন সাহায্য করার জন্য রাজনৈতিকভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। মূলত ৩০ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদের ভারতে প্রবেশের পরপরই ভারত সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তারা কি ধরনের সহযোগিতা করবে তা ভাবতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ÔTajuddin and his colleagues, on their arrival in India, had to establish their credentials as the genuine representatives of the party as well as their capacity to lead a war of liberation’।[12]

এ পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তাজউদ্দীন দ্রুত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে উদ্যোগী হন এবং ৩ এপ্রিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। দেখা করার আগে উচ্চপদস্থ ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন তারা মূলত জানতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ কোন সরকার গঠন করেছে কিনা। তাছাড়া সাক্ষাৎকারের পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কোন পদাধিকার ব্যক্তি হিসেবে সাক্ষাৎ করবেন? তিনি উপস্থিত বুদ্ধির জোরে ত্বরিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে  ভারত সরকারকে জানাতে বলেন, ২৫-২৬ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করেছেন এবং  স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগ  হাইকমান্ডের সদস্যরা মন্ত্রীপরিষদের সদস্য। একটি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতীয় সরকারের সাথে  সাক্ষাৎ করলে রাজনৈতিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতার পথ তৈরি হয় এবং বিশ্ব দরবারে গ্রহণযোগ্যতা পায়  তাই তাজউদ্দীন আহমদ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এতে আলোচনা  অবিস্মরণীয়ভাবে ফলপ্রসূ হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, সামরিক রসদপত্র, শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয়দান ইত্যাদি বিষয়ে ভারতীয় সরকারের সহযোগিতা চান। তাজউদ্দীনের আহমদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চিন্তা-ভাবনার সূক্ষ্মতা ও দূরদর্শিতা ইন্দিরা গান্ধীর মনোযোগ আকর্ষণ করে।[13] এবং কার্যত এই আলোচনার পরপরই ভারত সরকার প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্যে মুক্তিবাহিনীকে স্বল্প পরিমাণে অস্ত্র-শস্ত্র প্রদান করে। দিল্লীতে অবস্থান কালেই তাজউদ্দীন আহমদ রেহমান সোবহান ও আমীর-উল-ইসলামকে দিয়ে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেন। দিল্লীতে থেকে ফিরে এসে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগ নেতাদের খুঁজে বের করেন।

দিল্লী প্রসঙ্গ নিয়ে এবং ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা ঠিক করার জন্যে ৮ এপ্রিল কলকাতার ভবানীপুর এলাকার একটি বাড়িতে মিটিংয়ে বসেন। মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামান, যুবা নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান ও অন্যান্য নেতারা। সভায় শেখ ফজলুল হক মনি মন্ত্রীসভা গঠনের বিরোধিতা করে বলেন দেশ যুদ্ধরত ও বঙ্গবন্ধু শত্রুর হাতে বন্দি, এখন মন্ত্রিত্ব নিয়ে কলহ না করে বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করা উচিত। তখন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম মনির প্রস্তাবে বিরোধিতা করে এবং সরকার গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, “বিপ্লবী কাউন্সিল যদি বিভিন্ন মতাবলম্বী দুটি, পাঁচটি বা সাতটি গঠন করে তাহলে জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা কোনটির আদেশ মেনে চলবেন? কোন কাউন্সিলের সাথে বিদেশের সরকার সহযোগিতা করবে? এ ক্ষেত্রে একাধিক কাউন্সিল গঠনের সম্ভবনা নাই। কোন বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হলে জনগণের মৌলিক অধিকার অবমাননা করা হবে।”[14]

তারপর তাজউদ্দীন সার্বিক পরিস্থিতির ওপরে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বক্তৃতা দিয়ে শেখ ফজলুল হক মনি ব্যতীত সবাইকে সরকার গঠনের তাৎপর্য বোঝাতে সক্ষম হন। মনি পরে জুন-জুলাই মাসে অন্যান্য যুবানেতাদের নিয়ে মুজিববাহিনী গঠন করে যা সরকারের কোন নির্দেশ পালন করতো না। এই সব সত্ত্বেও তাজউদ্দীন দক্ষতার সাথে সরকার পরিচালনা করে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আসে। খন্দকার মোশতাক আহমদও প্রধানমন্ত্রী পদ না পেয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করে যদিও পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ গ্রহণ করে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাজউদ্দীন আহমদের কর্ম তৎপরতা ও বিচক্ষণতার বলে এ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।

অতঃপর শেখ ফজলুল হক মনির বিরোধিতা সত্ত্বেও ১০ এপ্রিল রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা আকাশবাণীর একটি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এ ঘোষণার পরপরই মুক্তিযুদ্ধ একটি নতুন মাত্রা পায়। মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে গতিশীল হয়ে ওঠে, মুক্তিযোদ্ধারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হয়। কতোটা উৎসাহিত হয় তা মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের লেখায় বোঝা যায়। তিনি লেখেন, ‘এই ঘোষণা সর্বস্তরের মানুষ শুনতে না পেলেও আমাদের মনোবল বেড়ে যায় প্রচণ্ড রকম। এই ঘোষণা শোনার পর আমাদের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঐ সময় আমরা যে কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তা আজও প্রকাশ করতে পারবো না। মনে হয়েছিলো ওই মুহূর্ত থেকেই প্রকৃত অর্থে আমি একজন বাঙালি, একজন স্বাধীন নাগরিক। আমার প্রাণপ্রিয় দেশটির নাম বাংলাদেশ।”[15]

১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বদ্যনাথতলার আম্রকাননে প্রথম বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতির কারণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনসুর আলী, অর্থমন্ত্রী হিসেবে এ এইচ এম কামারুজ্জামান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও সেনাপ্রধান হিসেবে আতাউল গনি ওসমানী শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শে আমীর-উল ইসলাম ও আব্দুল মান্নান ৫০-৬০টি গাড়ি করে বিদেশী সাংবাদিকদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নিয়ে আসেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে ব্যাপক সাহায্য করে। যার পুরো কৃতিত্বের দাবীদার তাজউদ্দীন আহমদ।

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা থমাস জেফারসন তাদের বিপ্লবী সরকার গঠনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “when in the course of events, its becomes necessary for one people to dissolve the political bonds which have connected them with another, and to assume among the powers of the earth, the separate and equal station to which the laws of nature and of nature’s God entitle them a decent respect to the opinions of mankind requires that they should declare the causes which impel them to the separation।”[16]

তেমনি তাজউদ্দীন আহমদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেন, “তাদের বোঝা উচিত যে, পাকিস্তান আজ মৃত এবং ইয়াহিয়া নিজেই পাকিস্তানের হত্যাকারী। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ একটা বাস্তব সত্য। ” [17]তিনি আরও বলেন, “কারো তাঁবেদারে পরিণত হওয়ার জন্য আত্ম-নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ সংগ্রামে আমাদের মানুষ এত রক্ত দেয়নি, এত ত্যাগ স্বীকার করছে না।”[18]

মন্ত্রীপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরপরই কলকাতাস্থ পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলী তার সকল স্তরের বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে যোগদান করলে বিশ্বে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ যেমন  আলোড়ন সৃষ্টি তেমন বাংলাদেশের কূটনীতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আর এই তাৎপর্যপূর্ণ কাজটা মূলত তাজউদ্দীন আহমদের কূটনৈতিক জ্ঞানের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার দক্ষতার সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে মন্ত্রীপরিষদ সচিবালয় গঠন, দেশকে ১১ সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা, ৯টি প্রশাসনিক জোন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কমিটি, উদ্বাস্তু কল্যাণ বোর্ড, কৃষি বিভাগ, পরিকল্পনা সেল, বানিজ্য বোর্ড ইত্যাদি গঠন করেন।  এভাবেই তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ৯ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত বিজয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে।

বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু এই হাজার বছরের মধ্যে বাঙালির জাতীয় জীবনে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস। এই সময় বাংলাদেশকে নেতৃত্ব প্রদান করতে সরকার গঠন করে তাজউদ্দীন আহমদ। এই সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং পলাশীর প্রান্তরে যেই বাঙালি স্বাধীনতা হারায় তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে বাঙালি সেই স্বাধীনতা আবার অর্জন করে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে। ৭১ এর সেই উত্তাল সময়ে, কঠিন সময়ে তাজউদ্দীন ব্যতীত আর কেউ সেই সময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারতো কিনা বলা শক্ত।

এ ক্ষেত্রে মুহাম্মদ নূরুল কাদেরের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিতে চেয়েছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর রাতে এর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হতে সাহায্য করে, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের একচ্ছত্র নেতা বানিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের জায়গায় অন্য কেউ, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থাকলেও, অত সুষ্ঠুভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়তো বা, পারতেন না। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন স্তরে যে সকল কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, সেই সকল পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করে, সব কিছু ঠাণ্ডা মাথায় বিচার, বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নের জন্যে নেতৃত্বের যে দৃঢ়তা ও কঠোরতার প্রয়োজন ছিল, তা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেখতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু, হয়তো বা, অত কঠোর হতে পারতেন না। কারণ বঙ্গবন্ধু মনের দিক দিয়ে অত্যন্ত কোমল, স্নেহপ্রবণ ও আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন।”[19]

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জেফারসন কে জাতির পিতায় আখ্যায়িত করা হয়।[20] বাংলাদেশে  তাজউদ্দীন আহমদকে জাতীয় নেতায় আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু আমেরিকায় জেফারসন এর জীবন ও  কর্মকে নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে যেভাবে আলোচনা হয়, তাজউদ্দীন আহমদের জীবন-কর্ম ও স্বদেশ ভাবনা  নিয়ে তেমন আলোচনা বা গবেষণা হয় না। রাষ্ট্রীয় ভাবে চর্চা করা হয় না তাজউদ্দীনের জীবন ও কর্ম  নিয়ে। ফলে বাংলাদেশে আজ আর তাজউদ্দীন আহমদের মতো আদর্শ নেতা বেড়ে উঠছে না। তাই  আমরা যদি সত্যি একটি সোনার বাংলাদেশ চাই, তাহলে তাজউদ্দীন আহমদের মতো আদর্শ নেতা  আজ আমাদের বড়ই দরকার। তাই এমন আদর্শ নেতা পেতে আমাদের তাজউদ্দীন আহমদের  জীবন-দর্শন পাঠ অত্যাবশ্যক।

তথ্যসূত্রঃ

[1] এইচ টি ইমাম, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, (ঢাকাঃ আগামী প্রকাশ, ২০০৪), পৃ-৬২।

[2] সিরাজুল ইসলাম, ঐতিহাসিকের নোটবুক, (ঢাকাঃ কথা প্রকাশ, ২০১০), পৃ-১৭২ ।

[3] সিরাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ-১৭২।

[4] কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদঃ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর, (ঢাকাঃ অঙ্কুর প্রকাশ, ২০০৮), পৃ-২৮৮।

[5] এইচ টি ইমাম, প্রাগুক্ত, পৃ-৬৩ ।

[6] কামাল হোসেন,তাজউদ্দীন আহমদঃ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর, এই বইয়ের মুখবন্ধ লেখেছেন ড আনিসুজ্জামান। সেখানে তিনি তাজউদ্দীন স¤পর্কে মন্তব্য করেছেন, পৃ-XV ।

[7] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-XV ।

[8] মঈদুল হাসান, মূলধারা ৭১, (ঢাকাঃ ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৬), পৃ-০৯।

[9] মুহাম্মদ নুরুল কাদের, একাত্তর আমার, (ঢাকাঃ সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯), পৃ-৪০।

[10] দৈনিক পূর্বদেশ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২।

[11] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-২৭৪।

[12] Nurul Islam, Making of a Nation-Bangladesh: An Economist’s tale (Dhaka: The University Press Limited, ২০০৩), p-১১৫।

[13] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-২৭৬।

[14] হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত স্বাধীনতার দলিলপত্র, ১৫শ খ-, পৃ-১১১।

[15] নুরুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ-৪২।

[16] মাযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, পৃ-৬৭১।

[17] শারমিন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদঃ নেতা ও পিতা, (ঢাকাঃ ঐতিহ্য প্রকাশ, ২০১৪), পৃ-৩১৯।

[18] শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ-৩২০।

[19] মোহাম্মদ নুরুল কাদের, ২৬৬ দিনে স্বাধীনতা, (ঢাকাঃ মুক্ত প্রকাশ, ২০০৭), পৃ-৬৭।

[20] সিরাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ-১৬৯।

(তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড এর আয়োজনে তাজউদ্দীন আহমদের ওপর রচনা প্রতিযোগিতা-২০১৬- এ তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে এই প্রবন্ধটি। )

ফটোক্রেডিট: দি ডেইলি স্টার।

weekly

বাংলাদেশ: নদী মাতা যার

রিডিং ক্লাবের ২৪৪ তম পাবলিক লেকচার

বাংলাদেশ: নদী মাতা যার

Role of Water Resources in socio-economic development of Bangladesh

বক্তা: জুলফিকার ইসলাম

weekly

বাজেট কীভাবে কাজ করে

রিডিং ক্লাবের ২২৯ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ

বাজেটের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের একটি পরিকল্পিত হিসাব তৈরি করা। এটা করা হয় সুষ্ঠু উপায়ে জনগণের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। পূর্বে রাষ্ট্র শুধু আয়ের উৎসের হিসাব রাখত। সেটাকে বলা হতো রাজস্ব আয়। ১৭৩৩ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংসদে উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী রবাার্ট ওয়ালপোল (১৬৭৬-১৭৪৫)। ক্রমান্বয়ে এ ব্যবস্থাটি ‘বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। ভারতবর্ষ ব্রিটেনের অধীন থাকার সুবাদে বেশ আগেভাগেই বাজেট ব্যবস্থার সাথে তার পরিচয় ঘটে। ভারতবর্ষে প্রথম বাজেট প্রথার প্রচলন হয় ১৮৬০ সালে । প্রথম অর্থমন্ত্রী হিসেবে জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০ খ্রি.) এ বাজেট উপস্থাপন করেন। এরপর ভারতবর্ষে এ ধারার প্রচলন অব্যাহত থাকে। দেশভাগের পর পাকিস্তানের প্রথম বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী (১৯৪৭-১৯৫১) মালিক গোলাম মোহাম্মদ (১৮৯৫-১৯৫৬)। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বাজেট উপস্থাপিত হয় ১৯৭২ সালে। অর্থমন্ত্রী (১৯৭২-১৯৭৪) তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের তখন ভয়ানক নাজুক অবস্থা। ওই বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠনের জন্য।

রাষ্ট্রীয় বাজেটে সাধারণত ব্যয় বুঝে আয়ের হিসাব করা হয়। সেক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ধরা হয়। রবার্ট ওয়ালপোল মূলত ধনীদের কাছ থেকে কর নিয়ে রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্যই ১৭৩৩ সালের ওই বাজেটটি তৈরি করেন। বর্তমানে সাধারণত, উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে প্রত্যক্ষ করের ব্যাপক প্রচলন আছে। কিন্তু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে পরোক্ষ করের প্রচলন বেশি। বাংলাদেশে করের গড়ে প্রায় ৮০ শতাংশই পরোক্ষ কর। দেশের সাধারণ জনগণের জন্য এটা হয় দুঃসহ বোঝাস্বরূপ। নাগরিকরা প্রত্যক্ষ কর দিতে তখনই উৎসাহিত হয় যখন এর প্রতিদানে প্রয়োজনীয় উপকার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। সুইডেনে একজন নাগরিক স্বতঃস্ফূর্ত হয়েই কর দিতে এগিয়ে আসে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়।

বাংলাদেশের নাগরিকরা কর দিতে উৎসাহী হয় না। কারণ তারা এ সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। ফলে এখানে কর আদায়ের হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে গড়ে প্রায় অর্ধেকেরও কম। ১৬ কোটি মানুষের দেশে আয়কর দেন মাত্র দেড় লাখের মতো মানুষ। সরকারি হিসাবে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার। প্রকৃত সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এনবিআর এর সূত্রমতে, ১ কোটি টাকার বেশি আয়কর দেয়ার সক্ষমতা আছে ৫০ হাজার লোকের। কিন্তু ১ কোটি টাকার আয়কর দেন মাত্র ৪৬ জন।
বাংলাদেশে সম্পদের অপচয় এবং দুর্নীতির ব্যাপক প্রচলনের কারণে লোকজন কর দিতে অনীহ হয়ে ওঠে। তাছাড়া করের ব্যাপারে নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা দেয়া হয় না। সে কারণে দেখা যায় করের পরিবর্তে ব্যবসায়ী বা ধনিক গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রকে বিভিন্নভাবে চাঁদা দেয় এবং এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সুবিধা লাভ করে। এভাবে তারা করের খাতা এড়িয়ে যায়। আমাদের দেশে জিডিপিতে করের অবদান মাত্র ১০.৩ শতাংশ, যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে এ হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশে ‘প্রগ্রেসিভ কর’ ব্যবস্থার প্রচলন নেই, যাতে করে ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর এবং গরিবদের কাছ থেকে কম কর নেয়া যায়। ফলে কর আহরণের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা হয় না। এতে করে সম্পদের পুনর্বণ্টন হয় না এবং অর্থনীতি পরিকল্পনামাফিক এগোয় না। এসব কারণে বাজেট তার উদ্দেশ্যানুযায়ী ঠিকমতো কাজ  করে না।

দুই.
বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৫তম বাজেট ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। অঙ্কে এবার বাজেটের পরিমাণ ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ১ লাখ কোটির কোটায় পৌঁছতে প্রথম সময় লাগে ৩৯ বছর (১৯৭২-২০০৯)। এরপর ২ লাখ কোটির কৌটায় পৌঁছে মাত্র ৪ বছরে (২০১০-২০১৪)। সর্বশেষ ৩ লাখ কোটির কোটায় পৌঁছতে সময় নেয় মাত্র ২ বছর (২০১৫-২০১৬)। অর্থমন্ত্রী ২০১৮ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৫ লাখ কোটিতে পৌঁছার স্বপ্ন দেখেন। ম্যালথাসের তত্ত্ব জনসংখ্যার বদলে আমাদের বাজেটে প্রয়োগ হচ্ছে বেশি।

এর মাধ্যমে বুঝা যায় যে, আমাদের টাকা অতি দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু টাকা যাচ্ছে কোথায়? টাকা-পয়সা আর সম্পদের প্রাচুর্যের জন্য প্রাচীনকাল থেকে বাংলার সুনাম রয়েছে। বাংলাকে বলা হতো জান্নাতাবাদ। যদিও টাকার অভাবে এর বাসিন্দারা নরকের জীবনযাপন করত।৫ এ কারণে অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ বলেছেন : “একটি দেশের অর্থনীতি বোঝার জন্য জিডিপি খুব ভালো উপায় নয়। এমনকি ভালো আছি কিনা সেটি বিচারের ভালো উপায় নয় জিডিপি।” এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ নরডিক রাষ্ট্রগুলো। তাদের জিডিপির আকার খুব বেশি বড় না হলেও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এরা পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট জাতি।
বাংলাদেশ গত কয়েক বছর বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করছে ঋণের সুদ পরিশোধে। এই খাতটি একেবারেই অনুৎপাদনশীল এবং অকল্যাণকর। এবারও তৃতীয় সর্বোচ্চ বাজেট ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে এই খাতে। সবচেয়ে উৎপাদনশীল খাত হিসেবে ধরা হয় শিক্ষা খাতকে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকীতে একটা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। গত কয়েক বছর অবহেলা করলেও এবার শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ২.৫ শতাংশ। যদিও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়। তাছাড়া ইউনেস্কো বলছে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। ভুটানে এ হার ৫.৫ শতাংশ এবং নেপালে এটা ৪.৪ শতাংশ। শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের দক্ষ ও কার্যকর মানব সম্পদ তৈরি করা সম্ভব। মাত্র ১৩ হাজার বিদেশি শ্রমিক দেশের বস্ত্রশিল্পে কাজ করে যে বেতন পায়, তা একই শিল্পে দেশি ৩ লাখ শ্রমিকের বেতনের সমান। বিদেশি শ্রমিকরা শুধু তাদের দক্ষতার কারণে প্রায় ২৩ গুণ বেশি বেতন পাচ্ছে।

দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির পাশাপাশি নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়ে বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের জন্য বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ৫.১ শতাংশ। এ ব্যয় বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৮৯তম। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎকসহ মাত্র ছয়জন সেবাকর্মী আছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে এ সংখ্যা হওয়া উচিত ২৭। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে তাদের বাজেটের ২৭ শতাংশ ধার্য করেছিল স্বাস্থ্য খাতে এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ করেছিল ৩৩ শতাংশ। আমাদের এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৫.৮ শতাংশ। এদেশের প্রায় পৌনে ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি কৃষি পরিবার আছে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৬.৩৩ শতাংশ। অথচ এবার এ খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৬.৭ শতাংশ। তাছাড়া নতুন করে করারোপ করা হয়েছে কৃষকের উপর।

কৃষক, গার্মেন্টস কর্মী এবং রেমিট্যান্স পাঠানো শ্রমিকরা হচ্ছে এদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। বড় আকারের জিডিপি এবং মজবুত অর্থনীতির ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এদের অমানুষিক পরিশ্রম আর হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর ভর করেই। অথচ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য কোনো বাজেটেই এদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণের বরাদ্দ রাখা হয় না।  এতে করে বাজেট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় অসমতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেঁচে থাকার জন্য জনগণের মৌলিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণেই বাজেট বাস্তবিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠে না।

তিন.
এটা সত্য যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে, যার অধিকাংশই সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতাতেই চলে যাবে। যদিও সরকারি আমলাদের দুর্নীতি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পল্লী উন্নয়ন খাতে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার রেল খাতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০১২ মিলিয়ন টাকা ভুর্তকি দেয়।১০ অথচ বাংলাদেশে যেকোনো সরকারি সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এখন পর্যন্ত সরকারি সেবার মান নিয়ে ১৩টি গণশুনানি হয়েছে। এর কোনোটিতে সরকারি সেবার ব্যাপারে নাগরিকরা সন্তুষ্ট বলে জানায়নি।১১আইনশৃঙ্খলা খাতে সরকার বরাদ্দ রাখছে। অথচ বিআইডিএসের তথ্যমতে, সেবা পাওয়ার ব্যাপারে দেশের ৯৫ শতাংশ নারীই পুলিশের উপর আস্থাশীল নয়।১২

জনগণের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। এজন্য সরকার, সেবা ও উন্নয়নমূলক খাতে যথেষ্ট পরিমাণে বরাদ্দ রাখছে। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্বলতার কারণে এসব বরাদ্দ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বাস্তবায়নের ব্যাপারে পরিকল্পনা বিভাগের সংস্থা ‘আইএমইডি’র এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩-১৪ সালের প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু দীর্ঘসূত্রতার কারণে ৯ হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।১৩

চার.
প্রতিবছর এরকম অপচয় আর দুনীর্তির কারণে এরকম কিছু খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দের চেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়। বছরের শেষে অর্থমন্ত্রী এরকম অতিরিক্ত খরচের একটি হিসাব তৈরি করেন। একে বলা হয় সম্পূরক বাজেট।১৪ আর যেসব খাতে প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা কম থাকে, সেগুলো নিয়ে নতুন বছরের বাজেট পেশ করার আগে একটি সংশোধিত বাজেট পেশ করেন সংসদে। বাংলাদেশে প্রস্তাবিত বাজেট সবসময় একটা ‘মুখোশ বাজেট’। প্রকৃত বাজেট হচ্ছে সংশোধিত ও সম্পূরক বাজেট। কিন্তু  দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের সংসদে সম্পূরক বাজেট নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। আকবর আলি খানের হিসাবানুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশের সংসদে সম্পূরক বাজেট নিয়ে গড় আলোচনা হয় ৪.১৬ শতাংশ। যা মোট বাজেট আলোচনার ১২.২ শতাংশ। এটা অন্তত ২০ শতাংশ হওয়া উচিত।১৫

এসব কারণে বাজেটের অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অর্থমন্ত্রী আইনবলে সব তথ্য দিতে বাধ্য নন। সংসদে বাজেট বিলের বিরোধিতা করতে পারে না কোনো সাংসদ। এতে তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। অধিকাংশ সময় বিেেরাধী দল বাজেট আলোচনায় কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করে না। তারা বাজেট প্রত্যাখ্যান করে রাস্তায় নেমে হরতাল ডাকে। সংবাদমাধ্যমে সরকারি দলের মিষ্টিমুখ আর বিরোধী দলের বাজেট প্রত্যাখ্যানের দাবিতে মিছিলের ছবি পাশাপাশি পাওয়া যায়। ফলে বাজেট একতরফাভাবে সংসদে পাস হয়ে যায়।

সংসদ ছাড়া সংবাদমাধ্যমে বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। বাজেটের কোনো খাতে বরাদ্দ কম বা বেশি দরকার অথবা বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এসব নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদ ও লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে বাজেট ঘোষণা শেষে আড্ডায় বঙ্গবন্ধু ঠাট্টা করে বলেছিলেন: “তাজউদ্দীন, তুমি যতই ভাল বাজেটই দাওনা কেন, ওরা (সাংবাদিকদের দিকে ইঙ্গিত করে) মন্দ বলবেই। যদি কিছু প্রশংসা চাও তো ওদের বেশি বেশি বিরিয়ানি-টিরিয়ানি খাওয়াও।”১৬ বস্তুত, বাজেটকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য এই আলোচনা-সমালোচনা দরকার। কারণ বাজেট হচ্ছে মূলত দর কষাকষির ব্যাপার। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দিকের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের হলঘরে বসত । ১৯৪৮ সালে এখানেই দেশের প্রথম বাজেট ঘোষিত হয়। মাওলানা ভাসানী সরকারি দলের হয়েও বাজেটের তীব্র সমালোচনা করেন।

আমাদের দেশের সাংসদরা বাজেট নিয়ে আলোচনায় অভ্যস্ত নয়। গড়ে প্রায় ৬৩ শতাংশ সাংসদ বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন না। বাজেট নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের এখানে সময়ের বরাদ্দও কম। আকবর আলি খানের হিসাবানুযায়ী, সাংসদরা বাজেট আলোচনার জন্য গড়ে সময় পায় ১৮ থেকে ২৪ দিন। অস্ট্রেলিয়ায় এসময় অন্তত এক মাস থেকে দুই মাস। ব্রিটেনে এটা সাধারণত তিন মাস। বাংলাদেশে অন্তত ছয় সপ্তাহ হওয়া উচিত।১৭ তা না হলে বার্ষিক এই আয়-ব্যয়ের আলোচনায় প্রত্যেক সদস্যদের সমঅংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। এসব কারণে দেখা যায় যে, সংসদে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়াতেই গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

পাঁচ.
ইদানীংকালে বাংলাদেশের বাজেটেগুলোর গঠন, প্রক্রিয়া এবং কাঠামোর মাঝে একঘেয়ে রকমের মিল পাওয়া যায়। এগুলোতে নেই কোনো সৃষ্টিশীলতা, রয়েছে সৃজনশীলতার অভাব। জনবিচ্ছিন্ন স্থির একটা কাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে আছে এগুলো। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য জনগণকে বাজেটের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একে বলা হয় ‘অংশগ্রহণমূলক বাজেট’। অংশগ্রহণ দু’ভাবে হতে পারে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণমূলক বাজেটে সংসদ সদস্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের বাজেট আলোচনায় তার অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তিনি যত বেশি জনগণের কাছাকাছি যাবেন, বাজেটে জনগণের চাহিদা অন্তর্ভুক্ত হবে তত বেশি।

জনগণের পক্ষ থেকে যখন কোনো সামাজিক সংগঠন বা সংস্থা বাজেট বিষয়ক দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকারের কাছে পেশ করে তখন তাকে পরোক্ষ অংশগ্রহণমূলক বাজেট বলে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। সামাজিক সংগঠনগুলো বাজেট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে জনগণের কাছে এর ভালো দিক খারাপ দিক তুলে ধরে। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা বা ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো তাদের বিভিন্ন দাবি পেশ করে থাকে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বাজেটে সরাসরি জনগণের প্রয়োজন বা দাবি-দাওয়া তুলে ধরে আলোচনা করার প্রচলন বাংলাদেশে খুব বেশি নেই।
১৯৮০ এর দশকে আয়ারল্যান্ডে অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাঝে ব্যাপক পরামর্শ হয়। একে বলা হয় ‘সামাজিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’। অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক সরকারি ঋণ এবং ঘাটতির পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবার মতো ব্যাপারগুলো আয়ত্তে আনতে এই চুক্তি করা হয়। ভারতে ‘রিপোর্ট কার্ড’ পদ্ধতি চালু আছে। এর দ্বারা সেবা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সামাজিক সংগঠনগুলো বাজার গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে জনগণের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রস্তাবনা সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করে। এর মাধ্যমে জনগণের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত ও সহজলভ্য হয়।১৮

বাংলাদেশে বেশকিছু সামাজিক সংগঠন বাজেটকে জনগণের জন্য সহজভাবে করা এবং বাজেটে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কাজ করে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও অনেক বেশি বেশি দরকার। তাতে করে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে, মৌলিক প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োগ ঘটবে এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে পুরো বাজেট প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ আর কার্যকর হয়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: “এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার মানুষ পেট ভরে না খায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার মা বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের যুবক কাজ না পায়”।১৯ তাই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত এরকম সাধারণ মানুষ। তখন বাজেটের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং এটি সঠিকভাবে কাজ করবে। আর এভাবেই শোষণবিহীন একটি আধুনিক ‘সোনার বাংলা’ গঠন করা সম্ভব হবে।

[১] আতিউর রহমান, জনগণের বাজেট: অংশগ্রহণমূলক পরিপ্রেক্ষিত, পাঠক সমাবেশ, ২০০০, পৃ:৫৭

২] ঐঃঃঢ়ং://যরংঃড়ৎুড়ভঢ়ধৎষরসবহঃনষড়ম.ড়িৎফঢ়ৎবংং.পড়স/২০১২/০৩/০৭/ঃযব-ভরৎংঃ-নঁফমবঃ-ধিষঢ়ড়ষবং-নধম-ড়ভ-ঃৎরপশং-ধহফ-ঃযব-ড়ৎরমরহং-ড়ভ-ঃযব-পযধহপবষষড়ৎং-মৎবধঃ-ংবপৎবঃ/

৩.জবা. বফ.) ঞযড়সধং ঞযড়সংড়হ, ইরড়মৎধঢ়যরপধষ উরপঃরড়হধৎু ড়ভ বসরহবহঃ ঝপড়ঃংসবহ, ঠড়ষ. ওওও, ইষধপশরব ধহফ ংড়হ, ১৮৭০, ঢ়:৫৪২-৫৪৬.  উইলসন একজন স্কটিশ ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও উদারনৈতিক রাজনীতিবিদ। ছোট বেলা থেকে ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন। ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার দরুণ ১৮৪৮ সাল থেকে জীবনের শেষ অবধি ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৮৪৩ সালে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৩ সালে চার্টার্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন যেটা বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’র অর্থনৈতিক সদস্য হন। মাত্র এক বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করে অসুস্থ হয়ে পরলোকগমন করেন।

[৪] ড. শফিক উজ জামান, বাজেট উচ্চাভিলাসী নয়, কল্পনাবিলাসী, বণিক বার্তা, ১৫ ই জুন ২০১৬

[৫]  আকবর আলী খান, সোনার বাংলা: মিথ ও বাস্তব, উল্লেখিত (সম্পা) সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস, ২য় খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃ:৬০৪

[৬] জাতীয় বাজেট ২০১৬-২০১৭, প্রথম আলো, ৩ জুন ২০১৬

[৭] আমেরিকার মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ১২ হাজার ডলার, প্রথম আলো, ১২ জুন ২০১৫

[৮] ঐঃঃঢ়ং://িি.িহধঃরড়হধষঢ়ৎরড়ৎরঃরবং.ড়ৎম/নঁফমবঃ-নধংরপং/ভবফবৎধষ-নঁফমবঃ-১০১/ংঢ়বহফরহম/

[৯] এক নজরে বাংলাদেশ কৃষি পরিসংখ্যান, কৃষি মন্ত্রণালয়, সর্বশেষ হালনাগাত: ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

[১০ কাজী আবুল ফিদা, রেলওয়ে,বাংলাপিডিয়া, ১০ মার্চ,২০১৫

[১১ সরকারী অফিসের মান নিয়ে জনগণ সন্তুষ্ট নয়, অর্থসূচক, ৯ মে ২০১৬

[১২সহায়তা পেতে পুলিশের উপর আস্থাশীল নয় নন ৯৫% নারী, প্রধম আলো, ২১ মে ২০১৫

১৩ ড. শফিক উজ জামান, বাজেট উচ্চাভিলাসী নয়, কল্পনাবিলাসী, বণিক বার্তা, ১৫ ই জুন ২০১৬

[১৪ (সম্পা.) আতিউর রহমান, জনগণের দোরগোড়ায় বাজেট, সূচীপত্র, ২০০৮, পৃ: ১৯

(১৫আকবর আলী খান, বাংলাদেশের বাজেটের প্রক্রিয়ায় গণমানুষের অংশীদারীত্ব: কতিপয় নীতিমালা সংস্কারের অন্বেষা, সমুন্নয়, ২০০৮, পু:৩১

[১৬সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলায় বাজেট বক্তৃতার বৃত্তান্ত, প্রথম আলো,৯ জুন ২০১৫

[১৭ আকবর আলী খান, বাংলাদেশের বাজেটের প্রক্রিয়ায় গণমানুষের অংশীদারীত্ব: কতিপয় নীতিমালা সংস্কারের অন্বেষা, সমুন্নয়, ২০০৮, পু:২৭

১৮ সম্পা.) আতিউর রহমান, জনগণের দোরগোড়ায় বাজেট, সূচীপত্র, ২০০৮, পৃ: ২৭-৫১

১৯আতিউর রহমান, অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ, বণিকবার্তা, ২ জুন ২০১৫

weekly

বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চার ইতিহাস

রিডিং ক্লাবের ১২৫ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: রাশেদ রাহম

লেকচার নোট্স

ধর্ম সম্পর্কিত বিষয়গুলোর নাটকীয় ভঙ্গিতে বর্ণনা দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় প্রায় সবার মধ্যেই। আর এই ড্রামাটিক ওয়েতে বর্ণনা করার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ এই ঘটনাগুলো এতো স্বাভাবিক বা এতো সাধারণভাবে ঘটেনি।

বিশেষ করে আমাদের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রেলিজিয়াস ইভোল্যুশন এর একটা প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটেছে প্রায় দের হাজার বছর আগে। এই পরিবর্তন কোথায় ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এর পরবর্তী দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের নাটুকে বক্তারা  অবহিত নন। কারণ এটা বোঝার জন্য মোস্ট সুপ্রিমলি ইন্টেলেক্চুয়াল হতে হয়। বস্তুত এই ব্যাপারগুলোর সাথে বাংলাদেশের কুরআন চর্চার ইতিহাস সম্পর্কিত। মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে শ্রুতিনির্ভর পড়াশুনার প্রবণতা রয়েছে। শোনাও এক ধরণের পড়া কিন্তু সবচেয়ে নিম্নমানের পড়ার উদাহরণ। কারণ এতে মূল ঘটনার বিকৃতি হতে বাধ্য। ইসলাম ধর্মের যখন কোন হাদিস বর্ণনা করা হয় বা কোন নবী বা খলিফার কোন ইভেন্টস এর বর্ণনা দেয়া হয় তখন নাটকীয় ভঙ্গিতে না গিয়ে আবেগের সাথে সাথে এর সাথে জড়িয়ে থাকা রিস্কটাও জানা দরকার।

আর কেন এই নাটকীয় ভঙ্গিটা আসে, কেন এই ধারা প্রচলিত; কারণ হচ্ছে শুনে শুনে কোন ঘটনা বর্ণনা দেয়া, নিজে না পড়া, কোন সিরিয়াস রিডিং হ্যাবিট তৈরি না করা। আর এই শ্রুতি নির্ভর ধর্ম চর্চা প্রকৃত ধর্মের বাইরে গিয়ে অন্য রকম একটা আচার নির্ভর, কুসংস্কার নির্ভর ধর্ম চর্চায় পরিণত হয়। তাই এই ব্যাপারগুলোতে সতর্ক হতে হবে। যেসব গ্রন্থ থেকে হাদিসের কথা জানা যাচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ও অথেন্টিক অনুবাদ বাংলায় আজো হয়নি। কারণ সবাইতো অনুবাদ ঠিকভাবে করতে পারে না। তাছাড়া সবাই বইটাও ঠিকভাবে জানে না।

ইমাম বুখারীর আট খন্ডে এখন পর্যন্ত একটাই ইংরেজী অনুবাদ বের হয়েছে বছর দশেক আগে তাও আবার ঢাকায় অ্যাভেইলেবল না। বুখারী শরীফের বাংলায় যে কয়টা অনুবাদ হয়েছে তার সবগুলো খন্ডিত; বিছিন্ন, কোন পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ নাই। তাছাড়া এমন অনেক ইমাম বুখারীর অনুবাদ বই পাওয়া যায়, যা কোন বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে তার সোর্সটা পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা ভাষা থেকে অন্য আরেকটা ভাষায় অনুবাদে যে একটা ন্যূনতম আদব আছে তার প্রকাশ খুব কমই পাওয়া যায়। কারণ এই কমিউনিটি ইন্টেলেকচুয়ালী পুওর এবং ডিসঅনেষ্ট। রিডিং স্কলারশীপ ডেভেলপ্ড না হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।

মুসলিম কমিউনিটির মোস্ট স্পেকটেকুলার এন্ড আনপ্রেসিডেন্টাল ফেনোমেনা হচ্ছে খাতেমুন-নাবীঈন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী। এর পরে আর কোন নবী আসবেননা। পবিত্র আল-কুরআন শেষ ঐশী-গ্রন্থ। এর পরে আর কোন ঐশী-গ্রন্থ আসবে না। এটাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ফেনোমেনা মুসলমানদের জন্য। কারণ লক্ষ্য লক্ষ্য বছর ধরে যে ধারাবাহিকতায় প্রত্যেক সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর বা ভাষাভাষীর লোকদের জন্য নবী পাঠানোর প্রচলন ছিল তার পরিসমাপ্তি হয়। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর তামাম জনগোষ্ঠীর জন্য, হাজার হাজার ভাষাভাষী লোকদের জন্য এর চর্চার রূপ কিভাবে নির্ধারিত হবে এই নিয়ে ইন্টেলেকচুয়ালি সিরিয়াস কোন গবেষণা, কোন প্রজেক্ট পাওয়া যায় না। যারা চুপি চুপি বেহেশতে চলে যেতে চায় তাদের সাথে কোন তর্ক নয়। কারণ কোন ভাল কিছু, কোন সুন্দর কিছু সবাই চায়। শুধু মনে রাখায় বিষয় হচ্ছে বেহেশতে যাওয়ার পথ এতো সহজ না। এর পদে পদে বিপদ রয়েছে। যে কোন রিলেজিওন কে চর্চার মধ্যে দিয়ে সুপ্রিম পর্যায়ে যাওয়ার যে পথ, সেই পথে গোপনে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এর জন্য প্রয়োজন “সুপ্রিমেসি অব নলেজ।” নলেজকে বেইজ করে যারা সামনে আগাবে তারাই টিকে থাকবে। কারণ অল কাম্স ফ্রম নলেজ। যেহেতু নবী আর আসবে না সেহেতু যে পাথেয় বা পথ নির্দেশ পরবর্তী সময়ের জন্য প্রদান করা হয়েছে তা কেবল একটা ভাষাতেই চর্চা হবে, এর ভিন্ন ভিন্ন ভার্সন থাকবে না তা পুরোপুরি অমূলক। এটি নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা ডিসকোর্স এখনো তৈরি হয় নি।

বৃহত্তম চারটা ধর্মীয় কমিউনিটির অন্যতম ইসলাম এর প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন এখন বৃহত্তম নলেজ ডিসকোর্স হয়ে ওঠেনি। যেহেতু আর কোন নবী আসবে না তাই এর পরবর্তী যে কোন সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে এর ব্যবহারের ধরণটা কী হবে তা ঠিক করা হয় নি। তাই এর অনুসারীদের নবী ছাড়া চলার জন্য এই কুরআনের চর্চার কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে কুরআন চর্চার ক্ষেত্রে যে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়ার দরকার ছিল, সামাজিক ও সামষ্টিক যে অনুপ্রেরণা আমাদের দেখানো দরকার ছিল তাতে আমরা ব্যর্থ- হয়েছি। নবী করিম (সঃ) এর ইন্তেকালের সাড়ে চৌদ্দশ বছর এর মাথায় যদি বাংলায় ইউসুফ-জুলেখা লেখা যেতে পারে তাহলে কুরআনের বিচ্ছিন্ন অনুবাদ কেন হবেনা। ১২০০-১৮০০ সাল পর্যন্ত শত শত পুঁথি, শত শত কবিতার বই বা লিটারেচার পাওয়া যাবে। এর মধ্যে কোরআনের চর্চা অনুপস্থিত। এই ৬০০ বছরের মধ্যে কোরআন চর্চার অনুপস্থিতি (কোরআন এর কোন অনুবাদ না হওয়া বা খুবই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যা সোসাইটাল কোন ইম্প্যাক্ট রাখতে পারে নি)  আমাদের মতো একটা কমিউনিটির জন্য প্রশ্ন আকারে ধরা দেয়। ১৮০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে কাজগুলো হয়েছে তাও সন্তোষজনক বলে ধরে নেয়া যাবে না। কুরআন অনুবাদের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রায় চল্লিশ বছরে উনত্রিশ-ত্রিশটা অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু এর এডিশন তিন-চার টার বেশি না। যে বই এতো গুরুত্ববহ তার বিক্রি অকল্পনীয়ভাবে কম। ধর্ম বিষয়ে আমাদের যে একটা মেকি অহংকার বা দাবী যে আমরা কোরআন পড়ি এই দাবী খুবই ঠুনকো এবং অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অরিজিনাল লাঙ্গুয়েজে তো নয়ই আমাদের নিজস্ব ভাষায়ও এর চর্চার অবস্থা তথৈবচ।

কোরআন এর ওপর বিষয়ভিত্তিক কাজ করতে হবে। এই কাজ প্রথম করেন ১৯৮৪ সালে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ইনডেক্স এর ভিত্তিতে রচনা করেন “কোরানসূত্র”। ২০০৩ সালে চলিত বাংলায় প্রথম কোরআনের অনুবাদ হয়। যা পঁচিশ বার ছাপাতে হয়। এ থেকে বোঝা যায় মানুষ সহজে তার ধর্মকে বুঝতে চায়। যা অন্য কোন বইয়ের ক্ষেত্রে বিশ বারের বেশি হয়নি। কারণ মানুষ তা গ্রহণ করেনি।

ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন যে সাহস আমাদের দেখিয়ে গেছেন এজন্য তিনি বহুলস্মরণীয়। ১৮৮১ সালে তিনি খণ্ডে খণ্ডে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন। বই আকারে প্রকাশ করেন ১৮৮৬ সালে। এর প্রায় একশত বছর পরে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বই বের হয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে বাংলাভাষায় কোরআন চর্চার বিষয়ে প্রথম পি.এইচ.ডি. করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোঃ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় পি.এইচ.ডি. করেন কুষ্টিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ডঃ আব্দুল অদুদ ভূইয়্যা। তার পি.এইচ.ডি. থিসিস শুরু হয় ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে যা শেষ হয় ২০০০ সালে। প্রায় ১০০০ পৃষ্ঠার এই বইটি ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় “বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চার ইতিহাস” নামে। এতো বড় কমিউনিটির জন্য মাত্র দুইটা পি.এইচ.ডি. যা আমাদের দাবী বা গর্বের জায়গাটা নড়বড়ে করে দেয়। যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত তার ওপর আমাদের যে অমনোযোগিতা তার ইতি টানা দরকার। এই আলোচনা বোধ করি সেই শুরুরই একটা ইনডিকেটর হয়ে থাকবে।

weekly

বিশ্বকাপের না বলা গল্প

 রিডিং ক্লাবের ১২০ তম পাবলিক লেকচার

প্রবক্তা: আবু বকর সিদ্দীক রাজু

লেকচার নোট্স

বিশ্বকাপ ফুটবল এমন একটি আয়োজন যা পুরো বিশ্বকে একই সুতোয় বাঁধতে পারে।। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া- সব মহাদেশের প্রতিনিধি দেশের অংশগ্রহণ থাকে বিশ্বকাপে।  তাই ফুটবল বিশ্বকাপে সার্বজনীনতার ছোঁয়া রয়েছে।  ফুটবল বিশ্বকাপ মানে উন্মাদনা। এই উন্মাদনায় প্রায়শই গৌণ হয়ে পড়ে রাজনীতি-অর্থনীতির মত সর্বময় প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো।  তবে মাঝে মাঝে এসবের প্রভাব ও যে বিশ্বকাপ আয়োজনে চোখে পড়ে- তার উদাহরণ ও বিরল নয়।  তবে এসবের প্রভাব স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয় ফুটবল খেলা একধরণের শিল্পের প্রকাশ।  আর ফুটবল বিশ্বকাপ সেই শিল্পের বহি:প্রকাশের এক বিশাল আয়োজন।

 যা কোন কাজে লাগে না, তাই তো শিল্প। বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় দলের বিজয়ের আনন্দ, পরাজয়ের দুঃখ আমাদের কোন পার্থিব প্রয়োজনে লাগে না, সে কারণেই ফুটবল সম্ভোগ হলো শিল্পের সম্ভোগ। শিল্প-হলো মানুষের মহত্তম আচার, মহত্তম প্রকাশ। শিল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাকি কবিতা। আর বলা হয়, শিল্পের সঙ্গে যদি খেলাকে তুলনা করা হয় তাহলে ফুটবল হলো সেই কবিতা।

জোড় সাল, কিন্তু লিপইয়ার  নয়। চার বছর অন্তর এমন একটি বছরের মধ্যবর্তী মাসটা কাছে এলেই কেমন শিহরণ জাগে। অন্তহীন রোমাঞ্চ, অসহ্য স্নায়ু-পীড়ন, রাতজাগা ঢুলুঢুলু চোখ আর অনি:শেষ ফুটবল রোমাঞ্চ। কিন্তু এই ফুটবলের  শুরুটা কেমন ছিল? ফুটবল মহোৎসবের রথ কাদেরকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সঙ্গী করেছে? বিশ্বকাপের: রেকর্ডগুলো কি কি? বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অবস্থান কি? মূলত আমার আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করেছি।

আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করাকে উদ্দেশ্য করে ১৯০৪ সালে ৭টি দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠিত করেছিল ” ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন” বা ফিফা নামের এই আন্তর্জাতিক সংগঠন। যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২০৯। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ ব্রাজিলে ‌এসেছে মাঝের ১৮টি বিশ্বকাপের ইতিহাস সাথে নিয়ে।

১৯৩০:

প্রথম আসরের স্বাগতিক হিসেবে উরুগুয়েকে বেছে নেওয়ায় দু’টি কারণ ছিল। উরুগুয়ের স্বাধীনতায় শতবর্ষ উদযাপন এবং অলিম্পিক ফুটবলে টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া। এমন খরচ ও সময়-বিবেচনা করে অনেক ইউরোপীয় দল প্রতিযোগীয় অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। মোট ১৩টি দলের মধ্যে উরুগুয়েই শিরোপা জিতে নিয়েছিল।

১৯৩৪:

দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ৩২টি দল খেলতে আগ্রহী হওয়ায় বাছাইপর্বের আয়োজন করা হয়। ১৬ দলের টুর্নামেন্টের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইতালি আর চেকোস্লোভাকিয়া। জিত্তসেম্পে মিয়াজ্জার বানিয়ে দেওয়া বলে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে ইতালিকে প্রথম শিরোপা এনে দেন অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিত্ত।

১৯৩৮:

বিগত শতাব্দীর তৃতীয় বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন খেতাব পায় ফ্রান্স। রানার্স আপ ইটালি। পনেরটি দেশ এই বিশ্বকাপে অংশ নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৩৮ সালে ১২ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর।

১৯৫০:

এটিই একমাত্র বিশ্বকাপ যেটিতে কোন ফাইনাল হয়নি। পয়েন্টের ভিত্তিতে স্থান নির্বাচন হলেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে এ আসরটি। কারণ উরুগুয়ের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ব্রাজিল হেরে যাওয়ায় হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল শতাধিক ব্রাজিলিয়ানের।

১৯৫৪:

১৯৫৪ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করে সুইজারল্যান্ড। চুড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়া ১৬টি দলের মধ্যে টানা ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে এসেছিল পুসকাসের দল। ফাইনালের প্রথমার্ধের  ২-০তে এগিয়ে থাকা হাঙ্গেরিকে শেষ পর্যন্ত ৩-২ এ হারিয়ে দেয় জার্মানী।  হাঙ্গেরির বিস্ময় পুসকাস ১১টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার কতিত্ব দেখান।

১৯৫৮:

ব্রাজিলের অপেক্ষার পালা ফুরায় ফুটবলের মহানয়ক ’পেলে’র আগমনের মধ্য দিয়ে, সুইডেনকে হারিয়ে ৫-২ গোলে বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল।

১৯৬৬ :

ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপটি ঠাঁই করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তখন পর্যন্ত একমাত্র ফাইনাল, যে ম্যাচ দেখেছিল হ্যাটট্রিক জিওফ হার্স্টের সেই হ্যাটট্রিক জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারায় ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আগে চুরি হয়ে গিয়েছিল জুলেরিমে’  কাপটি। নরওয়ের একটি বাগান বাড়ি থেকে খুঁজে বের করে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে পিকল্স নামের একটি কুকুরও।

১৯৭০:

আগের বিশ্বকাপের ব্যর্থতা মুছে ফেলে আবারও শেরোপা জিতে নেয় ব্রাজিল। এই বিশ্বকাপেই প্রথম চালু হয় হলুদ ও লাল কার্ড। তিনবার শিরোপা জেতায়  ’জুলে রিমে’ ট্রফিটা একেবারেই দিয়ে দেওয়া হয় ব্রাজিলকে।

১৯৭৪:

বিশ্বকাপে আবির্ভাব হলো ’টোটাল ফুটবলে’র পুরো দলকেই একই সঙ্গে আক্রমণ ও রক্ষণ করার দুরুহ কাজটি অনুপম দক্ষতায় সম্পন্ন করলো হল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানীর অধিনায়ক বেকনবাওয়ার হল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথম ফিফা কাপ জয়ের অনন্য কৃতিত্ব দেখান।

১৯৭৮:

প্রায় আধা শতাব্দী আর ১০টি বিশ্বকাপের পর অপেক্ষার পালা ফুরাল আর্জেটিনার। ৬-০ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা যে ম্যাচটি পাতানো ছিল বলে এখনো কথা ওড়ে বাতাসে।

১৯৮২ :

আকার- আয়তনে আগের  বিশ্বকাপের তুলনায় বেড়ে যায় দ্বাদশ বিশ্বকাপ। দলের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায ২৪টি। এই বিশ্বকাপের  নায়ক ইতালিয়ান স্ট্রাইকার পাওলো রসি। টাইব্রেকারে এসে ফ্রান্স ৩-১ গোলে হেরেছিল জার্মানির কাছে।

১৯৮৬ :

বিশ্বের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনা ফুটবল বিশ্বকাপের জন্মলগ্ন থেকে প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রথম এবং ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপ পায়। সর্বকালের সেরা ফুটবলার ডিয়াগো ম্যারাডোনার অবদানের জন্যই ১৯৮৬ সালে আবারও শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় এই ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি, ৩-২ এ জিতে ছিল আর্জেন্টিনা।

১৯৯০:

বিশ্বকাপের এই আসরটি বসে ফুটবলের আরেক পরাশক্তি ছন্দময় ফুটবলের দেশ ইটালিতে। পশ্চিম জার্মানী তৃতীয় বারের মত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ান হবার গৌরব অর্জন করে ইটালির এই আসরে। সিলাচী ব্যক্তিগত ৬টি গোল করে গোল্ডেন বুট পাওয়ার  খেতাব অর্জন করে।

১৯৯৪:

বেশ কিছু অঘটনের জন্ম দিয়েছে এই বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মতো দল বাছাইপর্বের বৈতরণীই পেরোতে পারেনি। ডোপ টেষ্টে ধরা পড়ে টুর্নামেন্ট থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন ডিয়েগে ম্যারাডোনা। ইতালির বিপক্ষে ফাইনালের নাটকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জয় হয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

১৯৯৮:

১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আসরে অংশগ্রহন করে মোট ৩২টি দেশ, বিশ্বখ্যাত ফুটবলার জিনেদিন জিদান ফ্রান্সকে ভাসিয়েছিলেন সফলতার আনন্দে, করেছিলেন জোড়া গোল। এই বিশ্বকাপ থেকেই শুরু ৩২ দলের বর্তমান ফরম্যাট।

২০০২:

এশিয়ার বুকে প্রথম বিশ্বকাপ। আয়োজক দেশ যৌথবাভে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান। রোনালদোর জোড়া গোলে ব্রাজিল জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বজয়ী হয় পঞ্চমবারের মতো।

২০০৬:

জার্মানীতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে সবাই ধরেই নিয়েছিল শক্তিশালী জার্মানীরা তুলে নিবে বিশ্বকাপ। কিন্তু তারা সেমিফাইনালেই বিদায় নেয়। ফ্রান্স ও ইটালির ফাইলাল ছিল নাটকীয়তার ভরপুর। শেষ পর্যন্ত দুই যুগ পর শিরোপা জিতেছিল ইতালি।

২০১০:

২০১০ সাল ছিল বিশ্বকাপের বছর, অনেক দিক থেকেই ’প্রথম’ এর জন্ম দেওয়া এই বিশ্বকাপ পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন। দেশটি ছিল স্পেন। বিশ্ব ফুটবলে ধাঁধা হয়ে ছিল স্পেন আর হল্যান্ডের বিশ্বকাপে না জেতা।  এই দুটি দলই মুখোমুখি হয়েছিল ফাইনালে। বিশ্বকাপে প্রথম কোন ইউরোপীয় দলের হাতে শিরোপা ওঠার জন্য স্মরণীয় এই বিশ্বকাপ।

 বিশ্বকাপের রেকর্ড:

         সবচেয়ে বেশি গোল করেছে ব্রাজিল

         এক আসরে সবচেয়ে বেশি গোল জাঁ ফন্টেইনের (১৯৫৮)-১৩টি

         বিদেশী কোচ নিয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি কোন দল

         তিনবার বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র ফুটবলার -পেলে (১৯৫৮,১৯৬২ও ১৯৭০)

         বেঞ্চে থেকেও লাল কার্ড দেখা ফুটবলার -ক্লদিও ক্যানিজিয়া (আর্জেন্টিনা-সুইডেন, ২০০২)

         চুড়ান্ত পর্বে সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি-ব্রাজিল (২০)।

         সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয়-ব্রাজিল (৫)

         সবচেয়ে বেশি ফাইনাল খেলা দল- ব্রাজিল ও জার্মানি (৭ বার করে)।

         সবচেয়ে বেশিবার টুর্নামেন্ট খেলে দ্বিতীয় রাইন্ডে উঠতে না পারা দল-স্কটল্যান্ড (৮) ।

         সবচেয়ে বেশি টানা শিরোপা -২: ইতালি (১৯৩৪,১৯৩৮), ব্রাজিল (১৯৫৮,১৯৬২)

         সবচেয়ে বেশি টানা ফাইনাল-৩: (জার্মানি ১৯৮২-১৯৯০), ব্রাজিল (১৯৯৪-২০০২)।

         সবচেয়ে বেশি টানা জয়-১১, ব্রাজিল (২০০২-২০০৬)।

         সবচেয়ে বেশিবার অংশগ্রহণ -৫ বার; আন্তোনিও কারবাজাল (মেক্সিকো, ১৯৫০-১৯৬৬) ও লোথার ম্যাথাউস (জার্মানি, ১৯৮২-১৯৯৮)।

         সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার -লোথার ম্যাথাউস (জার্মানি,২৫ ম্যাচ)।

         এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল -৫, ওলেগ সালেঙ্কো  (রাশিয়া-ক্যামেরুন,১৯৯৪)।

         সবচেয়ে বেশি  হ্যাটট্রিক ২টি -স্যান্ডর ককসিস (হাঙ্গেরি,১৯৫৪), জাঁ ফন্টেইন (ফ্রান্স, ১৯৫৮), জার্ড মুলার  (জার্মানি,১৯৭০) ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (আর্জেন্টিনা-১৯৯৪-১৯৯৮।

         সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা-পেলে  (ব্রাজিল, ১৭ বছর ২৩৯ দিন)

         সবচেয়ে কম বয়সে হ্রাটট্রিক-পেলে (১৭ বছর ২৪৪ দিন, ব্রাজিল-ফ্রান্স,১৯৫৮)

         দ্রুততম গোল -১১ সেকেন্ড; হাকান সুকুর (তুরস্ক-কোরিয়া, ২০০২)।

         সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচ -অষ্ট্রিয়া ৭-৫ সুইজাল্যান্ড,১৯৫৪।

         সবচেয়ে বেশি সময় গোল না খাওয়া গোলরক্ষক-ওয়াল্টার জেঙ্গা, ৫১৭ মিনিট (ইতালি, ১৯৯০)।

         সবচেয়ে বেশি  বয়সী কোচ-অটো রেহেগাল (৭১ বছর ৩১৭ দিন, গ্রিস ২০১০)।

         খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে টুর্নামেন্ট জয়- মারিও জাগালো ও  ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

         দ্রুততম লালকার্ড -৫৬ সেকেন্ড, হোসে বাতিস্তা (উরুগুয়ে-স্কটল্যান্ড ১৯৮৬)।

বিশ্বকাপের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বকাপের সাথে পরিচয় হয় ১৯৮২ সালে। যদিও এর আনন্দ উম্মাদনা শুরু হয় ১৯৮৬ সাল থেকে।  বাংলাদেশ ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৬৭ তম। ’বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন’ এর কাজী সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফুটবলের চুড়ান্ত পর্বে খেলার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ ভিশন ২০২২। কাতারে খেলবে বাংলাদেশ। আমাদের ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ ২০২২ এর স্বপ্নকে ইতিবাচক বলেই মনে করেন।

নোট নিয়েছেন: তাসমিয়া জাহান তন্বী

weekly

সাম্প্রদায়িকতার বীজ বনাম ধর্ম নিরপেক্ষতার গণিত

রিডিং ক্লাবের ৬১ তম পাবলিক লেকচার 

প্রবক্তা: ফারুক ওয়াসিফ

বক্তব্যের শুরুতেই ফারুক ওয়াসিফ পরিচয়ের রাজনীতির প্রসঙ্গ তোলেন। মানুষ পরিচিত হয় মুসলমান হিসেবে,খ্রিস্টান হিসেবে, বাঙালি হিসেবে,কখনো হিন্দু হিসেবে আবার কখনো বৌদ্ধ হিসেবে।তিনি বলেন, পরিচয় নির্ধারিত হয় মূলত তার সংস্কৃতির দ্বারা।এখানে ক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত প্রাসঙ্গিকভাবে। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আমাদের মুসলমান পরিচয়টা বড়ো ছিল। তারও আগে  বড়ো পরিচয় ছিল ভারতীয় হিসেবে। ৪৭-পরবর্তী সময় থেকে আমাদের বাঙালি পরিচয়টা বড় হয়ে উঠতে শুরু করে। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই আলাদা পরিচয়গুলোর মধ্যে একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। যেমন- সম্প্রতি রামুতে মুসলমান বনাম বৌদ্ধ পরিচয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি বনাম পাহাড়ি পরিচয়।

রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কোনো একটি সম্প্রদায় এখানে জড়িত নয়। একদল উস্কানি দিল, একদল সেটাকে জমিয়ে তুলল আর একদল এসে অগ্নি-সংযোগ,ভাঙচুর করল। দেখা গেল জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ, বিএনপি সব রাজনৈতিক দল এখানে জড়িত হয়ে গেল। পুলিশ, রোহিঙা, সমাজ, রাষ্ট্র এভাবে মোটামুটি ৮টি পরিচয়ের মানুষ এই কার্যক্রমে অংশ নিল। সেই দিক থেকে দেখলে ঘটনার কুশীলবরা অনেকটা সেক্যুলার। এই অঞ্চলে সাধারণত হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে তিক্ততা দেখা যায়। বৌদ্ধদের মত ঐতিহাসিকভাবে বিরোধহীন গোষ্ঠীর উপর এমন হামলা কিন্তু ইতিহাসের পরিক্রমায় খুব একটা দেখা যায় না। অবশ্য সম্প্রতি মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের  সমুদ্রসীমা নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কিছুটা উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরকম পরিস্থিতিতে কে লাভবান হবে তা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রচেষ্টা কিছুটা ইঙ্গিত দেয়।

পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একটি কৌশল হলো সংখ্যালঘুকে বিবাগী করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠকে অপরাধী করা। রামুর ঘটনায় কিন্তু এই উদ্দেশ্য খুব ভালো করে সাধিত হয়েছে। বাঙালি মুসলমানেরা এই ঘটনায় এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগছে এবং বৌদ্ধ সহ সকল সংখ্যালঘুর মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আর একটা বিষয় লক্ষনীয় যে বিষয়টাকে কোনো ক্রিমিনাল কার্যক্রম হিসেবে যতটা না দেখা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি দেখা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ব্যাপার হিসেবে। একটি সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের অপকর্মের দায় পুরো সম্প্রদায়ের উপর চাপানো হচ্ছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে যে মুসলমানরা খুব সাম্প্রদায়িক জাতি, হিংস্র অসহিষ্ণু এবং প্রতিক্রিয়াশীল জাতি। ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্থান যুদ্ধের কারণ হিসেবে পশ্চিমারা যেটাকে বরাবরই উপস্থাপন করে।

মুসলমানদেরকে নেতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা পশ্চিমাদের অনেক আগে থেকেই ছিল। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে রানী ইসাবেলা এবং রাজা ফার্ডিনান্ড স্পেনের গ্রানাডার মুসলিমদেরকে তারা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে তারা জয়ী হয় এবং মুসলিম এবং ইহুদীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে ইতিহাসের জঘন্যতম ক্রুসেড। মুসলিম এবং ইহুদীদের জন্য শুধু দুটি পথ খোলা রাখা হয়। তাদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হতে হবে অথবা স্পেন ছেড়ে চলে যেতে হবে। এর বাইরে হত্যা ছাড়া আর কোনো পথ তারা রাখে নি।

১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা কালীকট বন্দরে আসেন। কালীকটের রাজা সমুদ্রিন তাকে প্রথমে সাদরে গ্রহণ করলেও পরে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। এদিকে তিনি সেখানকার মুসলিম ব্যবসায়ীদের বাঁধার সম্মুখীন হন। এর ফলে তাকে লিসবনে ফিরে যেতে হয়।  ১৫০২ সালে ভাস্কো দা গামা আবার কালীকট বন্দরে আসেন। এবার আসেন ২০ টি অস্ত্র-সজ্জিত জাহাজ নিয়ে মুসলিম ব্যবসায়ীদের সাথে বোঝাপড়া করতে। সেই সময় তার এই দল অনেক নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করে। তিনি মুসলমান ব্যবসায়ীদের একটি জাহাজ আক্রমণ করেন এবং সেই জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ৩৮০ জন যাত্রী ছিল, যাদের মধ্যে শিশু, নারীও ছিল-তারা সবাই এই আগুনে পুড়ে এবং জাহাজ ডুবিতে মারা যায়। মুসলিমদের প্রতি তার আক্রোশ এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি কালীকটের সব মুসলিমকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তিনি অনেক জেলেকে ফাঁসি দেন এবং তাদের গলা কেটে হত্যা করেন।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে ফারুক ওয়াসিফ এটা পরিস্কার করতে চেয়েছেন যে পশ্চিমারা সংখ্যালঘু্ বা অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে কিভাবে সহাবস্থান করতে হয় সেটা জানে না। তারা হয় সংখ্যালঘুকে তাদের ভূখণ্ড থেকে বিতারিত করে দিয়েছে অথবা তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

এই পর্যায়ে ফারুক ওয়াসিফ ইতিহাসের তিনজন অসাম্প্রদায়িক নেতার কথা বলেন যাঁরা ব্যক্তিগত ভাবে সেক্যুলার ছিলেন না। সম্রাট অশোক, সম্রাট আকবর এবং মহাত্মা গান্ধী তিনজনেরই প্রেরণার উৎস ছিল যথাক্রমে বৌদ্ধ, ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম। গান্ধী নিজেকে অ্যান্টি সেকুলারিস্ট মনে করতেন এবং হিন্দু ঐতিহ্য থেকেই তিনি তার সর্বমানবতার প্রেরণা পেতেন বলে জানিয়েছেন। আকবর এবং অশোকও ধর্মীয় উদারতার সমর্থন নিজ নিজ ধর্ম থেকে টেনেছিলেন। বর্তমানে এরা উত্তরাধিকারহীন।

আবার ইতিহাসের বিপর্যকারী তিন সাম্প্রদায়িক মতবাদের জনক বিনায়ক দামোদর সাভারকার, মোহাম্মদ্ আলি জিন্নাহ এবং থিওডর হার্জেল ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সেক্যুলার ও নাস্তিক। এই তিনজনের ধারায় বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী, মুসলমানবাদী এবং ইহুদীবাদী দাপট মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। তিন জনই যথাক্রমে হিন্দুত্ববাদী, মুসলিমবাদী ও ইহুদীবাদী জাতির জনক।

এই উদাহরণগুলো এটা প্রমাণ করতে সাহায্য করে যে সাম্প্রদায়িক আচরণের প্রেরণা কেবল ধর্ম থেকেই আসে না সেক্যুলার কারণ থেকেও আসতে পারে। একজন সেক্যুলার লোকও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারেন।

এ পর্যায়ে ফারুক ওয়াসিফ ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন ব্রিটিশরা আসার আগে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার দানবীয় রূপটি এই উপমহাদেশে কখনোই দেখা যায়নি। এই অঞ্চলে সেক্যুলার চেতনার বিকাশ অনেক আগে থেকেই দেখা যায়। ১৫০০-১৭০০ শতকে রচিত শ্রী চৈতন্য, মঙ্গলকাব্য,  বৈষ্ণব পদাবলীর ভাবনা গুলো অনেকটাই সেক্যুলার, মানুষ-কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা। ইংরেজরা আসার পর তারা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমানকে তাদের ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্ট ছকে মাপা শুরু করে। মধ্যযুগে তাদের সাম্প্রদায়িক সংঘাত, অন্ধকার সময়ের সমান্তরালে উপমহাদেশকে বিচার করে। তারাই “ডিভাইড এন্ড রুল” নীতির প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক স্বার্থে জমিয়ে তোলে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ।

১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার আদমশুমারী করে। এই আদমশুমারীতে তাদের ফরম্যাট এমন ছিল যেখানে দেখা গেল ২ লক্ষ ভারতীয় একই সাথে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়ই। অযোধ্যার রাজপুতদের নামের একটা অংশ হিন্দু আর একটা অংশ মুসলমানদের নামের মত। এটার মাধ্যমে ভারতের বহুত্ববাদী সত্তাকে আঘাত করা হলো। সব মানুষ দুটি ধর্মের ছাতার নিচে চলে আসল। একি সাথে হিন্দু মুসলমান পরিচয়কেই সবচেয়েব বড় করে তোলা হল এবং বীজ বপন করা হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির।

এরপরও বিভিন্ন সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দু-মুসলমানের বন্ধুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল। ১৯২১ সালের মুসলিম জাতীয়তাবাদী খিলাফত আন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের একই পথে পাশাপাশি চলা এই সাম্প্রদায়িক বন্ধুত্বের ইঙ্গিত দেয়।

এ পর্যায়ে ফারুক ওয়াসিফ ১৯১৪ সালের জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে  কৃষকদের আন্দোলনের কথা তুলে ধরেন।শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে এই কৃষক প্রজা পার্টি একটি সেক্যুলার দল ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলের ১২১ বছরে ১১১ টি কৃষক বিদ্রোহের সবগুলোই অসাম্প্রদায়িক ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জমিদার বিরোধিতাকে ব্রিটিশ বিরোধিতায় রুপান্তর করা যায় নি ।কারণ পার্টির ভিতর সাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ এবং শ্রেণী সংগ্রামের জায়গাটিকে গৌণ করা। এখানে কমিউনিস্ট পার্টির দুর্বলতা অগ্রাহ্য করা যায় না।

আর একটি বিষয় লক্ষনীয় যে ভারতীয় যে দাঙ্গাগুলো হয়েছে তার শুরুটা হয়েছে শহরাঞ্চলের শিক্ষিত সমাজ থেকে ।আর সে দাঙ্গাগুলো হওয়ার কারণ যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশি বৈষয়িক বা সেক্যুলার। ধর্মীয় কারণে সাম্প্রদায়িকভাবে মানুষকে খুব কমই ঐক্যবদ্ধ করা গেছে যতটা  করা হয়েছে অর্থনৈতিক কারণকে সামনে রেখে।

এই পর্যায়ে এসে ফারুক ওয়াসিফের মুখে ধর্ম-নিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক বিবাদ সম্পর্কে আশীষ নন্দীর মতামতটিই শোনা যায়। মতামতটি ছিল এরকম-“বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ দ্বারা সুসজ্জিত তত্ত্ব ও তার চর্চা আমাদের খুব একটা কাজে আসে নাই, দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তত।”

নোট লিখেছেন: জুলফিকার ইসলাম