Browsing Tag

ভ্যান শেন্ডেল

News weekly

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রেস রিলিজ

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি। গ্রামের ইতিহাস হিসেবে যা লেখা হয়েছে তা মূলত জোতদার শ্রেণি ও ক্ষমতাশালীদের ইতিহাস। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, কৃষকদের ইতিহাস সেখানে উঠে আসেনি যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ডাচ গবেষক ভেল্যাম ভ্যান শেন্ডেলের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণা সম্পর্কিত আলোচনায় তার  বরাতে উপরোক্ত মন্তব্য করেন রিডিং ক্লাবের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের প্রবক্তা আতাউর রহমান মারুফ।

বাংলাকে “সোনার বাংলা” বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে একজন বিদেশী ইবনে বতুতার। তিনি বাংলায় জিনিসপত্রের প্রতুলতা ও এর দাম সস্তা  বলে এই নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় গবেষকগণ অবশ্য সোনার বাংলাকে ‘মিথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রবক্তা ইবনে বতুতার সূত্র ধরে বিদেশী পণ্ডিতদের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর। কিন্তু বঙ্গদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের গবেষণাধর্মী কাজের সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে। স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারের “A Statistical Account of Bengal”-সহ অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থ এখনো বঙ্গদেশ বিষয়ক গবেষকদের জন্য অবিকল্প প্রামান্য গ্রন্থ। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট জি. সেক ১৯০৬-১৯১০ সময়কালীন ফরিদপুরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল- “The Economic Life of a Bengal District”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্বক গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে নেদারল্যান্ডের নাগরিক ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় উপেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাছাড়া, তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামজিক অবস্থা, নৃতাত্বিক বিবর্তনসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

তাঁর “A History of Bangladesh” বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল এ বইটির রিভিউতে বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কাজগুলো হয়েছে তার মধ্যে এটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। ভ্যান শেন্ডেলের ১২টি বই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক বই ছয়টি। তাঁর মৌলিক গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থ সাতটি ।

শেন্ডেল বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের গতিশীলতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। আমাদের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। আমাদের নীল অর্থনীতি (নীল চাষ) সম্পর্কে গবেষণা  করেছেন । পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশে রেশম শিল্প সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে কিন্তু রেশম নীতি সাধারণ মানুষকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে- এ সম্পর্কে কোন গবেষণা হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন।

শেন্ডেলের ১৯৮১ সালে প্রকাশিত  “Peasant mobility : The Odds of Life in Rural Bangladesh Studies of Developing Countries” বইতে আমাদের কৃষক পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কৃষকের পরিবার ও তাদের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা হয়নি । ১৮৮০-১৯৮০ এই একশত বছরের কৃষক গতিশীলতার  ইতিহাস তাঁর বইয়ে আলোচিত হয়েছে।

২০০০ সালে  শেন্ডেলের  “Chittagong Hill Tracts: Living in Borderland”  বইটি প্রকাশিত হয় । বইটিতে তিনি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বইটি লেখার কারণ  হল পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশে সর্বদা উপেক্ষিত হয়েছে। শেন্ডেল এই বইয়ের জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ টি সূত্র থেকে ছবি সংগ্রহে করেছেন ।

শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা অপর্যাপ্ত। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করলে, আরো নতুন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কিন্তু একইভাবে নাইজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ  ব্যর্থ হয়েছে কেন? এ বিষয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে অন্য গণহত্যার সম্পর্ক বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সাধারণ মানুষের ইতিহাস লেখার চেষ্টা তার অন্যতম বড় গুণ।

সবশেষে বক্তা শেন্ডেলের বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদের কথা বলেন। শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি, যারা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র  হিসেবে গড়ে তুলবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম শেন্ডেলের বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ-কেন্দ্রিক গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, তাঁদের গবেষণায় প্রান্তে বসবাসকারী মানুষরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু শেন্ডেল এই প্রান্তিক মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন । তিনি কৃষকদের নিয়ে, আদিবাসী নিয়ে এবং সীমান্ত নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের  সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আদিবাসীদের সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তিনি এও বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবিক তা বোঝা যায়, সেই রাষ্ট্র তার প্রান্তিক জনগণের প্রতি কতটুকু আন্তরিক- তার উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লিপিকা বিশ্বাস অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে জিডিপি-নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, জিডিপি কার বৃদ্ধি পাচ্ছে? ধনী আরো ধনী হচ্ছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সমাজে অর্থনৈতিক  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জামশেদ সাকিব তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা  করেন। রাশিয়ায় ১৩-১৪ বছরের পূর্বে কেউ কৃষির উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত হয় না । কিন্তু বাংলাদেশে ৬ বছর বয়স  পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া শুরু করে । ফলে সে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

শেন্ডেল রচিত বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনালোচিত অনুষঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেন তুহিন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ১৮ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেয়া ত্রিপুরার অবদান অনালোচিত । ত্রিপুরার মেলাঘয়ে সেনাবাহিনী সদস্যেদের প্রশিক্ষণের ঘটনাও অনালোচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করার প্রয়োজনীয়তা কথা বলেন তিনি।

শেন্ডেল বিষয়ক আলোচনার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। আমরা কতটা অথর্ব শেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে তা বোঝা যায় । কারণ একজন বিদেশী আমাদের কাজ করে দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারিনি। সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন । তিনি বলেন, শেন্ডেলের বইয়ের প্রচ্ছদে একজন রিকশাওয়ালার ছবি। তাঁর মতে রিকশাওয়ালারাই বাংলাদেশ । কারণ বাংলাদেশে রিকশাওয়ালারা খণ্ডকালীন বেকারত্ব লাগব করতে শহরে আসে। আবার কৃষি কাজের সময় গ্রামে চলে যায় । অর্থাৎ সে গ্রাম ও শহর দু’জায়গায়ই বসবাস করে। আরিফ খানের মতে, শেন্ডেল রিকশাওয়ালার মাধ্যমেই  Making sense of contemporary Bangladesh বোঝাতে চেয়েছেন । শেন্ডেল তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ঋণী করে ফেলেছেন। কারণ তাঁর কাজগুলো আগামী ৫০-১০০ বছর পরে হলেও আমাদেরকে করতেই হত। কিন্তু শেন্ডেল তা আগেই করে আমাদেরকে ঋণগ্রস্ত করেছেন ।

একটি জাতির বোধোদয় হয় তার ইতিহাস জানার মাধ্যমে। আমাদের ৫২-র ফেব্রুয়ারীর বীজ বেড়ে উঠতে ৮০০ বছরের অধিক সময় লেগেছে। পৃথিবীতে বহু ভাষা, জাতি বিলুপ্ত হয়েছে । বাঙালি জাতির টিকে থাকার রহস্য জানা যায়  শেন্ডেলের কাজের মাধ্যমে। আমাদের দুর্বলতা বোঝার জন্য আমাদেরকে শেন্ডেলের কাজের দিকে তাকাতে হবে।

 

weekly

ভ্যান শেন্ডেল-এর বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাবের ২৭৬ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ
স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

বাংলাদেশের সাথে ভেলাম ভ্যান শেন্ডেলের (জন্ম:১৯৪৯) পরিচয় অনেকটা আকষ্মিকভাবেই। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র (আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস) হিসেবে সেসময় নিয়ম ছিল নিজের সমাজের বাইরে অন্য কোন সমাজ নিয়ে গবেষণা করা। ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশকে নির্বাচন করেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশে আসেন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আক্রোশে অনাহারে মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। এই দুর্ভিক্ষ চট্টগ্রামের অধ্যাপক ড. ইউনূসের চিন্তাজগত পাল্টে দিয়েছে। অর্থনীতির তত্ত্ব ছেড়ে তিনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। সিলেটে, রংপুরে আবেদ ব্র্যাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। রংপুরে গড়ে উঠেছিল স্বনির্ভর আন্দোলন। বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যমী তরুণরা বিভিন্নভাবে কাজ করেছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের প্রকট প্রভাব সত্ত্বেও শেন্ডেল বাংলাদেশের বাতাসে এক ধরণের আশাবাদের, পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের এই দুঃসময়ে শেন্ডেল নিজেও বিপদে পড়েছিলেন। সেসময় সরকার ৫০০ টাকার নোট বাতিল করে দেয়। তার কাছে ছিল সব ৫০০ টাকার নোট। মূহুর্তের মধ্যেই তিনি কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। গ্রামের মানুষেরাই তাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। গ্রামবাসীর আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেমে পড়ে যান। প্রান্তিক জনজীবনের ইতিহাস রচনার উপর তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কারণ তারা সবসময় উপেক্ষিত। অথচ এরাই সমাজের প্রাণ। তিনি বলেন, ইতিহাসের চাকা ঘোরানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি, যা আমরা প্রায়ই অনুধাবন করি না। শেন্ডেল বাংলাদেশী সমাজের শেকড়ের সন্ধান করেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ এবং ইতিহাসের এমন বিষয় নিয়ে চর্চা করেছেন, যা সাধারণভাবেই অনুল্লেখিত। একারণেই আমরা শেন্ডেলের নিকট ঋণী।

শেন্ডেল বাংলাদেশ নিয়ে গোটা দশেক বই লিখেছেন। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ইতিহাস রচনার মাধ্যমে শুরু করেন(Peasant Mobility,1993)। সেখানে চেষ্টা করেন কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ গ্রাম ভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস রচিত হয়নি, হয়েছে মূলত গ্রামের জোতদার, জমিদার, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ইতিহাস। শেন্ডেল তাঁর গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ফলে অবহেলিত-শোষিত মানুষই তার গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। The Chittagong Hill Tracts: Living in the Boarderland (2000,UPL ) নামক পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি আলোকচিত্রভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক বই লিখেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করে এ অঞ্চলের গত একশ বছরের দুঃস্প্রাপ্য ইতিহাস রচনা করেন ।

১৮২৪ সালের দিকে পাগলপন্থি নামক ময়মনসিংহের শেরপুরের একটি সম্প্রদায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। বাংলার ঐ এলাকাটি তখনো ব্রিটিশদের পুরোপুরি শাসনে আসেনি। বড় বড় জোতদার আর ভূস্বামীরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। কৃষকরা স্থানীয় জোতদার আর ব্রিটিশ সৈন্য উভয়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাগলপন্থিদের নেতা টিপু পাগল আর তার মায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ আর নারীনেতৃত্বের ভূমিকা শেন্ডেলকে কৌতুলহলোদ্দীপক করে তোলে (Madmen’ of Mymensingh: peasant resistance and the colonial process in eastern India, 1824-1833, 1985)

১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রানসিস বুকাননকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় পাঠিয়েছিল, এ এলাকাটিতে  আরো লাভজনক মশলা উৎপাদন করা যায় কি না তা সরেজমিনে যাচাই করে দেখতে। বুকানন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। বুকানন ভ্রমণের সময়  এসব অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন, ভাষা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন তার বইতে। এই ডায়েরিটি বাংলাদেশের  দক্ষিণ পূর্ব এলাকার সবচেয়ে পুরনো লিখিত দলিল। কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ এটি জানত এবং কখনো প্রকাশিত হয়নি। শেন্ডেল এই ডায়েরিটি ভূমিকাসহ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৯৯২ সালে এটি প্রকাশিত করেন। (Dokkhinpurbo Banglay Francis Buchanan, 1994)

রেশম শিল্প নিয়ে তাঁর গবেষণায় তিনি বাংলার অতি প্রাচীন এই গ্রামীন শিল্পের সঙ্গে এ দেশের উন্নয়ন নীতিমালার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। সেই হিসেবে এ কাজটিকে এ অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ইতিহাসও বলা যেতে পারে। উন্নয়ন একটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হলেও অবাক ব্যাপার হল, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া নিয়ে এ অঞ্চলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। এই বইয়ে উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ অবধি রেশম শিল্পকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন, কী করে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের পৌনঃপুনিক ভুলের কারণে এ অঞ্চলের এমন একটি সমৃদ্ধশালী শিল্পের পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাঁর একটি গবেষণার বিষয় সময়, যেখানে তিনি বলেন বাংলাদেশ খুব ব্যতিক্রমীভাবে একটি সময়-সমৃদ্ধ (Time-Rich) দেশ। ইউরোপীয় সমাজ যেখানে একটি সময়কাঠামোতে চলে সেখানে বাংলাদেশী সমাজ অনায়াসে তিনটি সময়কাঠামো বজায় রেখেছে। সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামো হলেও এ দেশে বাংলা, ইংরেজি এবং ইসলামি এই তিন রকম ক্যালেন্ডারই ব্যবহৃত হয়। খাসিয়াদের ৮ দিনে সপ্তাহ। বাংলাদেশের মানুষ এই বিভিন্ন ধরণের সময়কাঠামো যেভাবে তাদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ব্যবহার করে, তা  পর্যবেক্ষণ করেলে এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পদ্ধতি , ক্ষমতাকাঠামোর খেলা, পরিচয়ের সংকট এসব নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।

দি বর্ডারল্যান্ড: বিয়ন্ড স্টেট অ্যান্ড নেশন ইন সাউথ এশিয়া’ বইয়ের বিষয়বস্তু হলো ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট বাংলাদেশ, ভারত এবং বার্মার সীমানা। দেশভাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও সীমানার ইতিহাস নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। সীমান্তরেখা সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবনে কী পরিবর্তন হল, কী করে তারা অলক্ষ্যেই প্রভাবিত করলেন রাষ্ট্রকে। তিনি দেখিয়েছেন সীমান্ত এলাকার ইতিহাস রচনা করতে গেলে সীমান্তের দু দিকের দেশ নিয়েই গবেষণা করতে হবে। সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবন এবং কর্মকা- খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নীতিনির্ধারক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সামান্য মনযোগ দেন।

শেন্ডেলের সব কাজের একটি সমন্বিত রুপ পেয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ‘A History of Bangladesh’ বইতে। বইটি ২০১২ সালে চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তিনি মূলত বর্তমান বাংলাদেশকে বুঝতে চেয়েছেন। তার ভাষায় এই বইয়ের উদ্দেশ্য হল- Make sense of Contemporary Bangladesh । এজন্য এ অঞ্চলের ইতিহাস বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। শেন্ডেল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বর্তমান বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এর আগের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ছিল সম্পাদিত এবং ইনসাইক্লোপেডিক ধরনের। কিন্তু এগুলোর সমন্বিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ছিলনা। একই সাথে অধিকাংশ ইতিহাস হয়ত নির্দিষ্ট ঘরানার অথবা জাতীয়তাবদী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই বইয়ের লেখক এসব ত্রুটিমুক্ত হয়ে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখিয়েছেন।

৩৪৭ পৃষ্ঠার মূল বইটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা। এতে ২২টি চ্যাপ্টার রয়েছে। বইটি চারটি বৃহৎ ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইকোলজি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি। প্রথম ভাগে তিনি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠনপ্রক্রিয়া- যেমন মাটি, পানি, বনজঙ্গল, শহর ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।  তিনি এটাকে বলছেন ‘বেঙ্গল ডেলটা’ যার সঙ্গে অনেকাংশে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলের মিল রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ধ্বংসাত্বক এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়ার ফলে এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য তৈরী হয়েছে। রিচার্ড ইটনের ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি এ অঞ্চলের কৃষি, ধর্ম, ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন সীমারেখার (Frontier) বর্ণনা ও তুলনামূলক আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় ভাগে মোগল আমল থেকে বৃটিশ শাসন, ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব এবং পরের ভাগে দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ ভাগে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সর্বশেষ ভাগে তিনি বর্তমান (২০০৭) বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ভ্যান শেন্ডেল মূলত একজন তুলনামূলক ইতিহাসবিদ হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশে এরকম ইতিহাস চর্চা খুবই বিরল। তার মতে, ইতিহাস চর্চার তাত্ত্বিক যে নতুন ধারাগুলো আছে, যা বাংলাদেশে বিশেষ আলোচিত নয়, সেসব ধারায় এখানে গবেষণা হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে যদি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে রেখে একটা তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হলো,  একই সময়ে বায়াফ্রার (নাইজেরিয়া) মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হলো কেন? একাত্তরের গণহত্যার  সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর আর সব গণহতার (রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া) কী তুলনামূলক সম্পর্ক।”

শেন্ডেল মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসের নবদিক উন্মোচনকারী ইতিহাসবিদ। তিনি চেষ্টা করেছেন বড় বড় জাতীয় বীরের বদলে সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে, যাতে বাংলাদেশের জটিল ইতিহাসকে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়। তিনি সবসময় চমকিত হয়েছেন এদেশের মানুষের অঢেল জীবনীশক্তি দেখে। অসম্ভব বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে এখানে সাধারণ মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় কিন্তু এর মাঝেই তারা ধরে রেখেছে অসীম সাহস, আন্তরিকতা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্বল। যেমন ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তা আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে পারেনি। বাংলাদেশের অসাধারণ মানবিক সম্ভাবনা রয়েছে আবার সেই সম্ভাবনার সীমাহীন অপচয়ও হচ্ছে। তবুও সবশেষে তিনি তরুণদের উপর ভরসা রেখেছেন। ইতিহাস নিয়ে তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 সূত্র:

  1. শাহাদুজ্জামান, কথাপরম্পরা, পাঠক সমাবেশ,২০০৭, ভ্যান শেন্ডেলের সাক্ষাৎকার, পৃ: ১১২-১২৫
  2. Willem Van schendel, A history of Bangladesh, Cambridge University Press,2009
  3. Iftekhar Iqbal, “A Long view of Bangladesh”, Economic & political weekly, August 2009, Vol XLIV no 34, p:32-34