Browsing Tag

মুক্তিযুদ্ধ

News weekly

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

প্রেস রিলিজ

বাংলাদেশের সমাজ গ্রামভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস লেখা হয় নি। গ্রামের ইতিহাস হিসেবে যা লেখা হয়েছে তা মূলত জোতদার শ্রেণি ও ক্ষমতাশালীদের ইতিহাস। কিন্তু নিম্নশ্রেণির মানুষ, কৃষকদের ইতিহাস সেখানে উঠে আসেনি যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ডাচ গবেষক ভেল্যাম ভ্যান শেন্ডেলের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণা সম্পর্কিত আলোচনায় তার  বরাতে উপরোক্ত মন্তব্য করেন রিডিং ক্লাবের ২৭৬তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারের প্রবক্তা আতাউর রহমান মারুফ।

বাংলাকে “সোনার বাংলা” বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে একজন বিদেশী ইবনে বতুতার। তিনি বাংলায় জিনিসপত্রের প্রতুলতা ও এর দাম সস্তা  বলে এই নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় গবেষকগণ অবশ্য সোনার বাংলাকে ‘মিথ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রবক্তা ইবনে বতুতার সূত্র ধরে বিদেশী পণ্ডিতদের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর। কিন্তু বঙ্গদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের গবেষণাধর্মী কাজের সূত্রপাত ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে। স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারের “A Statistical Account of Bengal”-সহ অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থ এখনো বঙ্গদেশ বিষয়ক গবেষকদের জন্য অবিকল্প প্রামান্য গ্রন্থ। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট জি. সেক ১৯০৬-১৯১০ সময়কালীন ফরিদপুরের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন। গবেষণাটির শিরোনাম ছিল- “The Economic Life of a Bengal District”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্বক গবেষণা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে নেদারল্যান্ডের নাগরিক ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারণ তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষণায় উপেক্ষিত বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাছাড়া, তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামজিক অবস্থা, নৃতাত্বিক বিবর্তনসহ বাংলাদেশ সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

তাঁর “A History of Bangladesh” বইটি বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল এ বইটির রিভিউতে বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কাজগুলো হয়েছে তার মধ্যে এটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। ভ্যান শেন্ডেলের ১২টি বই পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক বই ছয়টি। তাঁর মৌলিক গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থ সাতটি ।

শেন্ডেল বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের গতিশীলতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। আমাদের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। আমাদের নীল অর্থনীতি (নীল চাষ) সম্পর্কে গবেষণা  করেছেন । পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশে রেশম শিল্প সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে কিন্তু রেশম নীতি সাধারণ মানুষকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে- এ সম্পর্কে কোন গবেষণা হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন।

শেন্ডেলের ১৯৮১ সালে প্রকাশিত  “Peasant mobility : The Odds of Life in Rural Bangladesh Studies of Developing Countries” বইতে আমাদের কৃষক পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কৃষকের পরিবার ও তাদের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা হয়নি । ১৮৮০-১৯৮০ এই একশত বছরের কৃষক গতিশীলতার  ইতিহাস তাঁর বইয়ে আলোচিত হয়েছে।

২০০০ সালে  শেন্ডেলের  “Chittagong Hill Tracts: Living in Borderland”  বইটি প্রকাশিত হয় । বইটিতে তিনি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। বইটি লেখার কারণ  হল পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশে সর্বদা উপেক্ষিত হয়েছে। শেন্ডেল এই বইয়ের জন্য সারা বিশ্বের প্রায় ৫০ টি সূত্র থেকে ছবি সংগ্রহে করেছেন ।

শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা অপর্যাপ্ত। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করলে, আরো নতুন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে কিন্তু একইভাবে নাইজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ  ব্যর্থ হয়েছে কেন? এ বিষয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গণহত্যার সাথে বিংশ শতাব্দীতে অন্য গণহত্যার সম্পর্ক বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের সাধারণ মানুষের ইতিহাস লেখার চেষ্টা তার অন্যতম বড় গুণ।

সবশেষে বক্তা শেন্ডেলের বাংলাদেশ সম্পর্কে আশাবাদের কথা বলেন। শেন্ডেলের মতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি, যারা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র  হিসেবে গড়ে তুলবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম শেন্ডেলের বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ-কেন্দ্রিক গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, তাঁদের গবেষণায় প্রান্তে বসবাসকারী মানুষরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু শেন্ডেল এই প্রান্তিক মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন । তিনি কৃষকদের নিয়ে, আদিবাসী নিয়ে এবং সীমান্ত নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের  সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি আদিবাসীদের সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তিনি এও বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবিক তা বোঝা যায়, সেই রাষ্ট্র তার প্রান্তিক জনগণের প্রতি কতটুকু আন্তরিক- তার উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লিপিকা বিশ্বাস অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে জিডিপি-নির্ভর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, জিডিপি কার বৃদ্ধি পাচ্ছে? ধনী আরো ধনী হচ্ছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সমাজে অর্থনৈতিক  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জামশেদ সাকিব তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা  করেন। রাশিয়ায় ১৩-১৪ বছরের পূর্বে কেউ কৃষির উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত হয় না । কিন্তু বাংলাদেশে ৬ বছর বয়স  পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া শুরু করে । ফলে সে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

শেন্ডেল রচিত বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনালোচিত অনুষঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেন তুহিন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ১৮ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেয়া ত্রিপুরার অবদান অনালোচিত । ত্রিপুরার মেলাঘয়ে সেনাবাহিনী সদস্যেদের প্রশিক্ষণের ঘটনাও অনালোচিত। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করার প্রয়োজনীয়তা কথা বলেন তিনি।

শেন্ডেল বিষয়ক আলোচনার অর্থ আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। আমরা কতটা অথর্ব শেন্ডেলের গবেষণার মাধ্যমে তা বোঝা যায় । কারণ একজন বিদেশী আমাদের কাজ করে দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারিনি। সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের পরিচালক আরিফ খান উপরোক্ত মন্তব্য করেন । তিনি বলেন, শেন্ডেলের বইয়ের প্রচ্ছদে একজন রিকশাওয়ালার ছবি। তাঁর মতে রিকশাওয়ালারাই বাংলাদেশ । কারণ বাংলাদেশে রিকশাওয়ালারা খণ্ডকালীন বেকারত্ব লাগব করতে শহরে আসে। আবার কৃষি কাজের সময় গ্রামে চলে যায় । অর্থাৎ সে গ্রাম ও শহর দু’জায়গায়ই বসবাস করে। আরিফ খানের মতে, শেন্ডেল রিকশাওয়ালার মাধ্যমেই  Making sense of contemporary Bangladesh বোঝাতে চেয়েছেন । শেন্ডেল তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে ঋণী করে ফেলেছেন। কারণ তাঁর কাজগুলো আগামী ৫০-১০০ বছর পরে হলেও আমাদেরকে করতেই হত। কিন্তু শেন্ডেল তা আগেই করে আমাদেরকে ঋণগ্রস্ত করেছেন ।

একটি জাতির বোধোদয় হয় তার ইতিহাস জানার মাধ্যমে। আমাদের ৫২-র ফেব্রুয়ারীর বীজ বেড়ে উঠতে ৮০০ বছরের অধিক সময় লেগেছে। পৃথিবীতে বহু ভাষা, জাতি বিলুপ্ত হয়েছে । বাঙালি জাতির টিকে থাকার রহস্য জানা যায়  শেন্ডেলের কাজের মাধ্যমে। আমাদের দুর্বলতা বোঝার জন্য আমাদেরকে শেন্ডেলের কাজের দিকে তাকাতে হবে।

 

weekly

ভ্যান শেন্ডেল-এর বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাবের ২৭৬ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
প্রবক্তা: আতাউর রহমান মারুফ
স্থান: সিনেপ্লেক্স রুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

বাংলাদেশের সাথে ভেলাম ভ্যান শেন্ডেলের (জন্ম:১৯৪৯) পরিচয় অনেকটা আকষ্মিকভাবেই। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র (আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস) হিসেবে সেসময় নিয়ম ছিল নিজের সমাজের বাইরে অন্য কোন সমাজ নিয়ে গবেষণা করা। ভ্যান শেন্ডেল বাংলাদেশকে নির্বাচন করেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশে আসেন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আক্রোশে অনাহারে মারা যাচ্ছে লাখো মানুষ। এই দুর্ভিক্ষ চট্টগ্রামের অধ্যাপক ড. ইউনূসের চিন্তাজগত পাল্টে দিয়েছে। অর্থনীতির তত্ত্ব ছেড়ে তিনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। সিলেটে, রংপুরে আবেদ ব্র্যাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। রংপুরে গড়ে উঠেছিল স্বনির্ভর আন্দোলন। বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক একটি দেশের স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যমী তরুণরা বিভিন্নভাবে কাজ করেছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের প্রকট প্রভাব সত্ত্বেও শেন্ডেল বাংলাদেশের বাতাসে এক ধরণের আশাবাদের, পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের এই দুঃসময়ে শেন্ডেল নিজেও বিপদে পড়েছিলেন। সেসময় সরকার ৫০০ টাকার নোট বাতিল করে দেয়। তার কাছে ছিল সব ৫০০ টাকার নোট। মূহুর্তের মধ্যেই তিনি কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। গ্রামের মানুষেরাই তাকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। গ্রামবাসীর আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেমে পড়ে যান। প্রান্তিক জনজীবনের ইতিহাস রচনার উপর তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কারণ তারা সবসময় উপেক্ষিত। অথচ এরাই সমাজের প্রাণ। তিনি বলেন, ইতিহাসের চাকা ঘোরানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি, যা আমরা প্রায়ই অনুধাবন করি না। শেন্ডেল বাংলাদেশী সমাজের শেকড়ের সন্ধান করেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ এবং ইতিহাসের এমন বিষয় নিয়ে চর্চা করেছেন, যা সাধারণভাবেই অনুল্লেখিত। একারণেই আমরা শেন্ডেলের নিকট ঋণী।

শেন্ডেল বাংলাদেশ নিয়ে গোটা দশেক বই লিখেছেন। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ইতিহাস রচনার মাধ্যমে শুরু করেন(Peasant Mobility,1993)। সেখানে চেষ্টা করেন কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ গ্রাম ভিত্তিক হলেও গ্রামের ইতিহাস রচিত হয়নি, হয়েছে মূলত গ্রামের জোতদার, জমিদার, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ইতিহাস। শেন্ডেল তাঁর গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ফলে অবহেলিত-শোষিত মানুষই তার গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। The Chittagong Hill Tracts: Living in the Boarderland (2000,UPL ) নামক পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি আলোকচিত্রভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক বই লিখেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করে এ অঞ্চলের গত একশ বছরের দুঃস্প্রাপ্য ইতিহাস রচনা করেন ।

১৮২৪ সালের দিকে পাগলপন্থি নামক ময়মনসিংহের শেরপুরের একটি সম্প্রদায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। বাংলার ঐ এলাকাটি তখনো ব্রিটিশদের পুরোপুরি শাসনে আসেনি। বড় বড় জোতদার আর ভূস্বামীরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। কৃষকরা স্থানীয় জোতদার আর ব্রিটিশ সৈন্য উভয়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাগলপন্থিদের নেতা টিপু পাগল আর তার মায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ আর নারীনেতৃত্বের ভূমিকা শেন্ডেলকে কৌতুলহলোদ্দীপক করে তোলে (Madmen’ of Mymensingh: peasant resistance and the colonial process in eastern India, 1824-1833, 1985)

১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রানসিস বুকাননকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় পাঠিয়েছিল, এ এলাকাটিতে  আরো লাভজনক মশলা উৎপাদন করা যায় কি না তা সরেজমিনে যাচাই করে দেখতে। বুকানন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। বুকানন ভ্রমণের সময়  এসব অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন, ভাষা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন তার বইতে। এই ডায়েরিটি বাংলাদেশের  দক্ষিণ পূর্ব এলাকার সবচেয়ে পুরনো লিখিত দলিল। কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ এটি জানত এবং কখনো প্রকাশিত হয়নি। শেন্ডেল এই ডায়েরিটি ভূমিকাসহ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৯৯২ সালে এটি প্রকাশিত করেন। (Dokkhinpurbo Banglay Francis Buchanan, 1994)

রেশম শিল্প নিয়ে তাঁর গবেষণায় তিনি বাংলার অতি প্রাচীন এই গ্রামীন শিল্পের সঙ্গে এ দেশের উন্নয়ন নীতিমালার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। সেই হিসেবে এ কাজটিকে এ অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ইতিহাসও বলা যেতে পারে। উন্নয়ন একটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হলেও অবাক ব্যাপার হল, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া নিয়ে এ অঞ্চলে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। এই বইয়ে উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ অবধি রেশম শিল্পকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন, কী করে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের পৌনঃপুনিক ভুলের কারণে এ অঞ্চলের এমন একটি সমৃদ্ধশালী শিল্পের পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাঁর একটি গবেষণার বিষয় সময়, যেখানে তিনি বলেন বাংলাদেশ খুব ব্যতিক্রমীভাবে একটি সময়-সমৃদ্ধ (Time-Rich) দেশ। ইউরোপীয় সমাজ যেখানে একটি সময়কাঠামোতে চলে সেখানে বাংলাদেশী সমাজ অনায়াসে তিনটি সময়কাঠামো বজায় রেখেছে। সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামো হলেও এ দেশে বাংলা, ইংরেজি এবং ইসলামি এই তিন রকম ক্যালেন্ডারই ব্যবহৃত হয়। খাসিয়াদের ৮ দিনে সপ্তাহ। বাংলাদেশের মানুষ এই বিভিন্ন ধরণের সময়কাঠামো যেভাবে তাদের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ব্যবহার করে, তা  পর্যবেক্ষণ করেলে এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পদ্ধতি , ক্ষমতাকাঠামোর খেলা, পরিচয়ের সংকট এসব নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।

দি বর্ডারল্যান্ড: বিয়ন্ড স্টেট অ্যান্ড নেশন ইন সাউথ এশিয়া’ বইয়ের বিষয়বস্তু হলো ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট বাংলাদেশ, ভারত এবং বার্মার সীমানা। দেশভাগ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও সীমানার ইতিহাস নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। সীমান্তরেখা সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবনে কী পরিবর্তন হল, কী করে তারা অলক্ষ্যেই প্রভাবিত করলেন রাষ্ট্রকে। তিনি দেখিয়েছেন সীমান্ত এলাকার ইতিহাস রচনা করতে গেলে সীমান্তের দু দিকের দেশ নিয়েই গবেষণা করতে হবে। সীমান্তবর্তী মানুষদের জীবন এবং কর্মকা- খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নীতিনির্ধারক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সামান্য মনযোগ দেন।

শেন্ডেলের সব কাজের একটি সমন্বিত রুপ পেয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ‘A History of Bangladesh’ বইতে। বইটি ২০১২ সালে চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তিনি মূলত বর্তমান বাংলাদেশকে বুঝতে চেয়েছেন। তার ভাষায় এই বইয়ের উদ্দেশ্য হল- Make sense of Contemporary Bangladesh । এজন্য এ অঞ্চলের ইতিহাস বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। শেন্ডেল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বর্তমান বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এর আগের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ছিল সম্পাদিত এবং ইনসাইক্লোপেডিক ধরনের। কিন্তু এগুলোর সমন্বিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ছিলনা। একই সাথে অধিকাংশ ইতিহাস হয়ত নির্দিষ্ট ঘরানার অথবা জাতীয়তাবদী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই বইয়ের লেখক এসব ত্রুটিমুক্ত হয়ে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখিয়েছেন।

৩৪৭ পৃষ্ঠার মূল বইটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা। এতে ২২টি চ্যাপ্টার রয়েছে। বইটি চারটি বৃহৎ ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইকোলজি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি। প্রথম ভাগে তিনি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠনপ্রক্রিয়া- যেমন মাটি, পানি, বনজঙ্গল, শহর ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।  তিনি এটাকে বলছেন ‘বেঙ্গল ডেলটা’ যার সঙ্গে অনেকাংশে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলের মিল রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ধ্বংসাত্বক এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়ার ফলে এ অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য তৈরী হয়েছে। রিচার্ড ইটনের ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি এ অঞ্চলের কৃষি, ধর্ম, ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন সীমারেখার (Frontier) বর্ণনা ও তুলনামূলক আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় ভাগে মোগল আমল থেকে বৃটিশ শাসন, ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব এবং পরের ভাগে দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ ভাগে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সর্বশেষ ভাগে তিনি বর্তমান (২০০৭) বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ভ্যান শেন্ডেল মূলত একজন তুলনামূলক ইতিহাসবিদ হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশে এরকম ইতিহাস চর্চা খুবই বিরল। তার মতে, ইতিহাস চর্চার তাত্ত্বিক যে নতুন ধারাগুলো আছে, যা বাংলাদেশে বিশেষ আলোচিত নয়, সেসব ধারায় এখানে গবেষণা হতে পারে। যেমন- বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে যদি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে রেখে একটা তুলনামূলক আলোচনা করা যায়, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হলো,  একই সময়ে বায়াফ্রার (নাইজেরিয়া) মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হলো কেন? একাত্তরের গণহত্যার  সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর আর সব গণহতার (রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া) কী তুলনামূলক সম্পর্ক।”

শেন্ডেল মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসের নবদিক উন্মোচনকারী ইতিহাসবিদ। তিনি চেষ্টা করেছেন বড় বড় জাতীয় বীরের বদলে সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে, যাতে বাংলাদেশের জটিল ইতিহাসকে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়। তিনি সবসময় চমকিত হয়েছেন এদেশের মানুষের অঢেল জীবনীশক্তি দেখে। অসম্ভব বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে এখানে সাধারণ মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় কিন্তু এর মাঝেই তারা ধরে রেখেছে অসীম সাহস, আন্তরিকতা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্বল। যেমন ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তা আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে পারেনি। বাংলাদেশের অসাধারণ মানবিক সম্ভাবনা রয়েছে আবার সেই সম্ভাবনার সীমাহীন অপচয়ও হচ্ছে। তবুও সবশেষে তিনি তরুণদের উপর ভরসা রেখেছেন। ইতিহাস নিয়ে তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 সূত্র:

  1. শাহাদুজ্জামান, কথাপরম্পরা, পাঠক সমাবেশ,২০০৭, ভ্যান শেন্ডেলের সাক্ষাৎকার, পৃ: ১১২-১২৫
  2. Willem Van schendel, A history of Bangladesh, Cambridge University Press,2009
  3. Iftekhar Iqbal, “A Long view of Bangladesh”, Economic & political weekly, August 2009, Vol XLIV no 34, p:32-34
Monthly

বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের উন্মেষ ও বিকাশ

রিডিং ক্লাবের ০৮ম মাসিক পাবলিক লেকচার

বক্তা: গোলাম মুরশিদ

 

আমার খুব ইতিবাচক ধারণা নেই যে বাঙালিরা জ্ঞানের স্পৃহায় কাতর হয়েছে। এরকম ধারণা আমার নেই। আমি কয়েকবছর আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যার নাম দিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যা লয়। যেখানে বিশ্ববিদ্যা লয়প্রাপ্ত হয়, সেই জায়গার নাম হল বিশ্ববিদ্যালয়। সত্যি সত্যি এখানে এসেও আমি কয়েকটা জিনিস পর্যবেক্ষণ করলাম আমি লক্ষ করে দেখলাম (সঞ্চালকের সূচনা বক্তব্যকে উদ্দেশ্য করে), সেটা হচ্ছে, আমাদের বিশেষণ প্রীতি। এবং অতিশয়োক্তির জন্য আমাদের অতি আগ্রহ। আমরা বিশেষণ ছাড়া কোনো কিছু বলতে পারি না।

যাক্ গে, এটা আমি বলতে চাইনি,আমি আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিভাবে উন্মেষ এবং বিকাশ লাভ করল তার দিকে। আমি এ বিষয়টা নিয়ে কাজ করেছিলাম অনেক আগে। আর আমি এক একটা সময়ে এক একটা বিষয় নিয়ে কাজ করি। তারপর সে বিষয়ে যখন মোটামুটি খানিকটা জানতে পাই তারপর সে বিষয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। তখন সেদিকটার কথা আর চিন্তা করিনা, মনে করিনা, মনে থাকেও না। এককথায় বলা যায় যে আমি হচ্ছি জ্যাক অব অল ট্রেডস মাস্টার অব নান। সত্যি সত্যি আমার আগ্রহের ক্ষেত্রটা অনেক বিস্তৃত ও বিচিত্র। আমি অনেক কিছু নিয়ে কাজ করেছি, যেমন একটু আগে রাশেদ (সঞ্চালক) বলছিলেন যে কথা আপনাদের- যে, মানববিদ্যা চর্চা থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার ইতিহাস থেকে শুরু করে অনেক বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। কিছু লেখা জোগাড় করেছি এ পর্যন্ত; না লিখলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। পরিবেশকে রক্ষা করা  হত, কারণ আমার এই সমস্ত বই লিখতে গিয়ে অনেক গাছপালার জীবনহানি হয়েছে।

যাক্ গে, প্রথমে আমি একটা অবজারভেশন অথবা বৈশিষ্ট্য দিতে চাই বাঙালিদের চরিত্র সম্পর্কে। সেটা হচ্ছে আমরা যেকথা শুনি সেকথা বিশ্বাস করি। এটা আমাদের চরিত্রের একটা বৈশিষ্ট্য। অমুক লিখিয়াছেন সুতরাং আমারও সেটা বিশ্বাস করতে হবে, এ রকম একটা ধারণা বাঙালিদের মধ্যে প্রচলিত আছে। কেউ যাচাই করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিষয়টাকে লিখবেন, সেটার জন্য যে পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দরকার সেটা করতে দেখিনা। বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্পর্কে কেউ কেউ লিখেছেন। কিন্তু তারা যেভাবে লিখেছেন আমি সেভাবে লিখতে চাইনি, সেগুলো গ্রহণ করিনি ও করতে চাইনি। আমার ধারণা আমাদের সমাজের গভীরে লুকিয়ে আছে এ প্রশ্নের উত্তর যে- কেন বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল না।

কেন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠল এবং কিভাবে গড়ে উঠল? এটার জন্য আগের বই গুলোতে যা যা লেখা আছে সেটা মনে করলে আমার মনে হয় ভুল করা হবে। বঙ্গীয় মুসলমান নিয়ে প্রথমে আমাদের চিন্তা করা দরকার। বাঙালি মুসলমানদের সম্পর্কে অনেক ধারণা ভ্রান্ত, ভাসাভাসা। ভ্রান্তির উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। যেমন আমি দৃষ্টান্ত দিতে চাই। হান্টারের তৈরি একটা কিংবদন্তি আছে বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে। মুসলমানরা নাকি ইংরেজদের উপর গোস্যা করে শিক্ষা লাভ করেনি। এ রকম একটা ভ্রান্ত কথা আর থাকতে পারেনা।

আমরা কোন্ বাঙালি মুসলমানের কথা বলছি সেটা আগে যাচাই করে নেওয়া উচিত। তাদের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক কি আদৌ স্থাপিত হয়েছিল অথবা ইংরেজদের প্রভাব কীভাবে তাদের উপর পড়েছিল সেখান থেকে জিনিসটাকে বিচার করা দরকার। হান্টারের কিংবদন্তি ছিল বাঙালী মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে; তাদের অর্থনৈতিক, শিক্ষা সম্পর্কে। তিনি ধারণা দিয়েছিলেন- যেহেতু তারা (মুসলমানরা) শাসক ছিলেন সুতরাং তাদের সরিয়ে দিয়ে যখন অন্যরা (ব্রিটিশরা) শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন তারা লেখাপড়ার দিকে এগিয়ে যাননি। তারা সেখান থেকে দূরে সড়ে গেছেন, কিন্তু সেটা ঠিক না। তার কারণ হান্টার যাদের কথা লিখেছেন তাদের বাঙালি মুসলমান বলা ঠিক না। তাদের সংখ্যা এত সামান্য যে তা দিয়ে বাঙালি মুসলমানের কথা চিন্তা করা সংগত নয়।

বঙ্গীয় মুসলমান ২ শ্রেণীর, শ্রেণী না বলে বলি দুভাগে বিভক্ত ছিল। একভাগ হল অবাঙালি; বঙ্গদেশে বসবাসকারী মুসলমান। যেহেতু কলকাতা বাস করে সেহেতু কলকাতাবাসী মুসলমান বলা যায়। বাঙালি মুসলমান বলা যায় কিনা সেটা পরের কথা। তারা যদি বাংলায় কথা বলে তাহলে তারাই বাঙালি মুসলমান, নয়ত তারা বাঙালি মুসলমান নন, অবাঙালি বঙ্গবাসী মুসলমান তারা। আর আরেক ধরনের মুসলমান যেটা আসলে যাদের সম্পর্কে আমি আজ কথা বলতে চাই, সেই দলটা হচ্ছে বাংলাভাষী মুসলমান, বাঙালি মুসলমান। এখন এ দুটো শ্রেণীর গুরুত্বটা বোদঝা দরকার। সংখ্যালঘু হচ্ছেন অবাঙালী মুসলমানরা, আর এরা হচ্ছেন বহিরাগত। অবাঙালী মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সংখ্যালঘু বললে ঠিক বুঝা যায় না যে কতটা লঘু তারা, সে প্রসঙ্গে আমি পরে আসছি।

কিন্তু এ অবাঙালি মুসলমান কোথা থেকে এলেন? তারা বাইরে থেকে এলেন। আরব, ইরান থেকে এসেছেন তাদের সংখ্যা খুবই কম, প্রায় আসেনি বলেই মনে হয়। উত্তর ভারত থেকে এসেছে অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে উত্তর ভারতে বসতি স্থাপন করে। সেখানে বসবাস করে একদল বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। নানা কাজে এসেছেন; কেউ ধর্মপ্রচার করতে, কেউ সরকারী কাজ করার উদ্দেশ্যে এসেছেন। যেমন মুঘল আমলে মুঘলদের সাথে তাদের কর্মচারীরা এসেছেন এবং তারা বসবাস করেছেন। এই সূত্রে বাংলাদেশে একদল শিয়া মুসলমান আছেন, যারা এখন বেশিরভাগই  ঢাকায় বসবাস করছেন। এরা হচ্ছেন বহিরাগত, বহিরাগতদের সন্তানরা কি বহিরাগত? না হয় তাদের সন্তানদের কথা ধরলাম না, সন্তানদের সন্তানরা, তারা কি বহিরাগত? যাদের জন্ম এদেশে তারা বহিরাগত নন, কিন্তু যদি বহিরাগত হিসেবে তাদের ধরি, এরকম পুরুষানুক্রমিক বহিরাগত বলে বিবেচনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব যে তাদের সংখ্যা কত নগন্য। পূর্ববাংলার সমাজের তুলনায় তাদের সংখ্যা কত নগন্য।

যাক্ গে, এই অবাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলা কখনো স্বীকার করেনি। ফারসি তারা বলতেন না,তারা উত্তরভারত থেকে এসেছেন; উর্দুভাষা বলতেন। ফারসিতে কথা বলছেন এমন মুসলমান বাঙালির সংখ্যা হাতে গণনা করা যাবে। অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আরও বৈশিষ্ট্য আছে। তারা পরশ্রমজীবী, নিজেরা পরিশ্রম করে জীবিকা র্অজন করতেন না, অন্য শ্রেণীর উপর নির্ভর করে জীবিকা র্অজন করতেন, এককথায় তারা ধনী। তারা শিক্ষিত, কিন্তু এ শিক্ষিত যখন বলি এ শিক্ষিতকে কোয়ালিফাই করে বলা দরকার। এরা শিক্ষিত, ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে পারেন, এই সূত্রে তারা শিক্ষিত। তারা ইংরেজি, স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্য শেখেননি। অর্থকরী যে বিদ্যা সেটা তারা আয়ত্ত করেননি। কিছুকাল আগে পর্যন্ত, আমি ঠিক সময় বলতে পারবো না, পাকিস্তানের সেন্সাস ১৯৫১ সালেও যারা কোরআন পড়তে পারত তাদের শিক্ষিত বলে হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু সত্যি কি তারা শিক্ষিত?

তারা মেকানিক্যালি পড়া শিখেছেন, তারা অর্থ জানেন না। তারা শুধু পড়তে পারেন। তাদের শিক্ষিত বলা সঙ্গত নয়। আমাদের বাড়িতে একটা বাচ্চা আছে এখন, বাচ্চাটা আমাদের গৃহভৃত্যের সন্তান। সে এখন অনেক ইংরেজি বলে। ইংরেজিগুলোর অর্থ সে জানে না। বাচ্চাটাকে কি শিক্ষিত বলা যাবে? সে মুখস্ত করেছে। কোরআন শরীফ পড়তে পারা, তা আবেগ থেকে পড়তে পারা আর লিটারেট হওয়া এক জিনিস নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সেন্সাস অনুযায়ী ধর্মগ্রন্থ পড়তে পারলে তাদের লিটারেট বলা যায় কিনা তা আমার জানা নাই। কিন্তু লিটারেসির সংজ্ঞানুযায়ী যে ভাষা পড়তে, লিখতে, বলতে এবং অর্থ বুঝতে পারবেন -এ চারটি স্কিল থাকলে লিটারেসি বলা হয়।

এই যে অবাঙালি মুসলমানদের কথা বলছিলাম, এদের আরেকটা পরিচয় হচ্ছে- এরা উচ্চবিত্ত। যেমন, রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন পরিচিত তাঁর উর্দু ভাষায় লেখার জন্য নয়। তিনি বাংলায় লিখেছেন বলে এবং  মুসলমান মেয়েদের জন্য পরিশ্রম করেছেন বলে তিনি আমাদের কাছে পরিচিত। তিনি আমাদের কাছে পরিচিত বাঙালি  হিসেবে। তাঁর বাবা উর্দুভাষী মুসলমান ছিলেন, উচ্চবিত্তের জমিদার ছিলেন। যাদের নিয়ে আমরা বলি অবাঙালি, বঙ্গবাসী মুসলমান তারা উচ্চবিত্ত, সাধারণভাবে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব সীমিত, সারা দেশজুড়ে জমিদার থাকতে পারেনা। সবাই জমিদার হতে পারে না; তাহলে প্রজা হবে কারা?

অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আরেকটা প্রধান ভাগ হচ্ছে, যারা বাংলায় কথা বলে না, উর্দুতে কথা বলে, উচ্চবিত্ত না, সাধারণ মানুষ, আমাদের বাংলাদেশে, যেমন বিহারীরা। সরকারি ভাষায় বলি পাকিস্তানি, আসলে তারা বিহারী।  অবাঙালি মুসলমানও দুভাগে বিভক্ত। বেশিরভাগই দরিদ্র, পেশাজীবী। যেমন ঢাকার সেলুনগুলোতে নাপিতরা বিহারী । এ রকম ছোট ছোট পেশাজীবী। অনেক ঘড়ির দোকান করেছেন বিহারীরা। তারা উচ্চবিত্ত নয় ,মধ্যবিত্ত নয়। কিন্তু আমরা যে অবাঙালি  মুসলমানের কথা বলি তারা উচ্চবিত্ত মুসলমান। নিম্নবিত্তের সংখ্যা বেশি, কিন্তু তাদের আবার আইডেনটিফাই করি উচ্চবিত্ত বলে। অপরপক্ষে সংখ্যাগুরু মুসলমানরা হচ্ছেন বাঙালি, বাংলাভাষায় কথা বলে। পুরুষানুক্রমিকভাবে তারা এদেশের সন্তান, তারা এ মাটির ছেলে মেয়ে। এবং তারা বেশিরভাগই বসবাস করেন গ্রামে। তারা শ্রমজীবী, বেশিরভাগই চাষী, ভূমিনির্ভর।

যে কথা বলছিলাম যে তারা হচ্ছেন শ্রমজীবী,ভূমিনির্ভর মানুষ, দরিদ্র। হয় জমিতে কাজ করেন নয়ত জমির মালিক, নয়ত দুইই। তাহলে আমরা দুরকমের বাঙালি পেলাম, বাঙালি মুসলমান পেলাম। অবাঙালি এবং অবাঙালিদের আবার প্রধান ভাগ হচ্ছে দরিদ্র। আর প্রধান ভাগ পেলাম বাংলা ভাষায় কথা বলে,ভূমিনির্ভর, গ্রামে বাস করে এমন একদল বাঙালি। এদের সংখ্যা কিরকম?

অবাঙালি মুসলমানদের সংখ্যা আমাদের সঠিকভাবে জানা নেই। অন্তত ১৮৭২ সালের সেন্সাসের আগে পর্যন্ত আমরা জানতাম না, এখনও জানিনা। ১৮৭২ সালের যে ডেফিনেশন দিয়ে তাদের নেওয়া হয়েছে সেটা দিয়ে ঠিক অবাঙালি মুসলমানদের বোঝা যায় না। ১৮৭২ সালে বলা হয়েছে অবাঙালির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১.৫২ শতাংশ। শতকরা দেড়জন ,এ শতকরা দেড়জন যে অবাঙলায় কথা বলে তা নন, উর্দুতে কথা বলে তা ও নন,তারা যে বহিরাগত তাও নন, তাদের পূর্বপুরুষরা বহিরাগত ছিল। পূর্বপুরুষরা বহিরাগত,তাদের বংশানুক্রমিকভাবে তারা এদেশে বাস করেছেন। তাদের যদি অবাঙালি ধরা হয় তাহলে তাদের শতকরা ১.৫২ ভাগ হচ্ছেন অবাঙালি মুসলমান,অর্থাৎ হাতে গণনা করা যায় তাদের সংখ্যা। অপরপক্ষে ৯৮.৫ ভাগ হচ্ছে বাংলাভাষী, গ্রামের বসবাসকারী চাষী, বেশিরভাগ মুসলমান।

জেসি জ্যাক যেমন বলেছেন ১৯১৬ সালের হিসাব অনুসারে ফরিদপুর জেলার কথা যে, ওখানকার চাষীদের যারা জমিতে চাষাবাদ করে তাদের শতকরা ৯১ ভাগ হচ্ছেন মুসলমান। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বঙ্গভাষী মুসলমানদের কথা যদি বলতে হয় তাহলে অবাঙালিদের কথা ভুলে যেতে হবে। যে অবাঙালিদের নিয়ে কিংবদন্তি লিখেছিলেন উইলিয়াম হান্টার। হান্টারের কথা ভুলে গিয়ে বা তাকে অনুসরণ করে যারা বাঙালিদের কথা বলেছেন তাদের কথা ভুলে গিয়ে আমাদের একটা নতুন অ্যাপ্রোচ নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

অবাঙালি মুসলমানদের আর কিছু  বৈশিষ্ট্য আছে সেটা একটু বলে নিই। যেমন তারা অভিজাত শ্রেণী। আর বাঙালি মুসলমানরা শ্রেণীরা অনভিজাত । আতরাফ বলা যায় না, আতরাফের সংজ্ঞায় বোধ হয় জাতিভেদ প্রথার একটা যোগাযোগ আছে, নিম্ন শ্রেণীর। শ্রেণী মানে শ্রেণীর সঙ্গে টাকা-পয়সার যোগযোগ আছে। মোটকথা অবাঙালিরা ধনী মুসলমান। বাঙালি মুসলমানরা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বলে কিছু ছিল না বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে। এই জিনিসটা আমি পরিষ্কার করে এবং জোড় দিয়ে বলতে চাই। যে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে, গ্রামের অশিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ছিল না। অপরপক্ষে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে হিন্দুদের মধ্যে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছিল। সেটা গড়ে উঠেছিল প্রধানত ভূমির উপর নির্ভরশীল যারা- ছোট ছোট জমিদার- তাদের নিয়ে।

আর বিদ্যা শিক্ষা করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছিল একটা। যে জিনিসটা মুসলমানদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। মুসলমানরা ৭০-৮০ বছর পিছিয়ে ছিলেন হিন্দুদের তুলনায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ থেকে। কারণ বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে গড়ে উঠছিল  সে মধ্যবিত্তশ্রেণীর প্রধানভাগ শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। শিক্ষিত চাকরিজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী। এখন শিক্ষা কারা লাভ করেছিল সেটা আমাদের জানা দরকার, সেটা জানলে, বুঝতে পারবো বাংলার মুসলমানদের কেন মধ্যবিত্ত হতে এত দেরী হল?

শিক্ষার সঙ্গে কুলগত বৃত্তির একটা যোগ আছে। যেমন: জেলেরা কখনো লেখাপড়া শিখতে যাননি প্রথমদিকে। ধরা যাক যেমন কামার,তারা লেখাপড়া শিখতে যাননি,যারা কুমার তারা ও লেখাপড়া শিখতে যাননি। লেখাপড়া করতে গেছেন তারাই, যাদের কোনো পেশা ছিল না, কুলগত পেশা ছিল না। আর কুলগত পেশটা পুরুষানুক্রমিকভাবে চলত। নাপিতের ছেলে নাপিত হয়,তার ছেলে নাপিত হয়, তার ছেলে নাপিত হয় । এক ধরনের এক্সপার্টিজও সেইসূত্রে তারা আয়ত্ত করত। কামারের ছেলে কামার হয়,কুমারের ছেলে কুমার হয় ইত্যাদি। লেখাপড়ার সাথে যোগাযোগ ছিল ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের। তাদের কোনো পেশা নেই। আপনাদের মনে পড়তে পারে সঙ্গে সঙ্গে যে- না, ব্রাহ্মণরা তো পূজা করত। পূজারী, যারা পূজা করত, সেই পুরুতব্রাহ্মণদের সংখ্যা খুবই সামান্য। এবং তাদের মধ্যে লেখাপড়াটা হয়নি। তারা নম:নম: শিখেছে, মন্ত্র শিখেছে পর্যন্ত, এ দিয়ে তারা আয় করেছে। তার ছেলেকেও ঐ মন্ত্রগুলো শিখিয়ে দিয়েছে, ছেলেও মন্ত্র পড়ে, পূজো করে, আয় করেছে।

লেখাপড়ায় এগিয়ে গেলেন বিশেষ করে ব্রিটিশযুগে। কারা এগিয়ে এলেন? সেই সমস্ত ব্রাহ্মণরা যারা পুজো করেন, যারা পুরুত নন এবং একজনের কথা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলি যেমন- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের ঠাকুরদাদা সংসার পোষণ করতে না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, মহবীরের মত। তখন তার স্ত্রী চরকা কেটে সুতা তৈরি করে, বিক্রি করে কোনমতে সংসার দেখাশুনা করছিলেন। তার ছেলে অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের বাবা সেইজন্য কম বয়সে কলকাতায় চলে গিয়েছেন। কলকাতায় গিয়ে সেখানে ঘুরেছেন। ব্রাহ্মণ দেখলে পর তখনকার লোকেরা সবাই একটু সমীহ করতেন, দয়া করতেন।  ব্রাহ্মণ ভিক্ষা নিবে এটা হচ্ছে স্বাভাবিক, প্রত্যাশিত। সুতরাং তিনি বলতে গেলে ভিক্ষাজীবী ছিলেন। বিদ্যাসাগর উল্লেখ করেছেন এক মুড়িওলার কথা, যে মুড়িওয়ালা তার বাবাকে মুড়ি খাওয়াত। যাক্ গে,মোটকথা ব্রাহ্মণের ছেলে অ-আ শিখেছিলেন, দু-টাকা বেতনের একটা চাকরি পেলেন এবং সেই চাকরি পাওয়ার কথা শুনে তাদের বাড়িতে মহোৎসব। ছেলে দু-টাকা বেতনের চাকরি পেয়েছে। এবং বিদ্যাসাগরকে কিছুদিন পরে নিয়ে এলেন শহরে, লেখাপড়া শিখাবেন। কারণ, তিনি বুঝতে পারলেন লেখাপড়া শিখলে চরকা কাটানোর উপর নির্ভর করতে হয় না। লেখাপড়া শিখলে চাকরি পাওয়া যায়, সেইজন্য ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। এবং ছেলে কলকাতায় এসে লেখাপড়া শিখেছে, বিদ্যাসাগর হয়েছে। তারপর শিক্ষিত হয়ে, শুধুমাত্র শিক্ষা দিয়ে যারা মধ্যবিত্ত হয়েছেন,উচ্চ মধ্যবিত্ত হয়েছেন বিদ্যাসাগর তাদের মধ্যে একজন। তিনি একসময় এমন একটা চাকরি করতেন যেটা বাঙালিদের মধ্যে সর্বোচ্চ বেতনের।

শিক্ষা দিয়ে তিনি একধরনের আভিজাত্য লাভ করলেন। যে আভিজাত্য তার ঠাকুরদার ছিল না,তার পিতার ছিলনা; তিনি মধ্যবিত্ত হলেন। আর অপরপক্ষে দেখতে পাচ্ছি, যারা ভট্টাচার্য, যারা পূজা করতেন, এবং চক্রবর্তী, যারা পূজা করেন তাদের মধ্যে শিক্ষার হার খুব কম। তার কারণ তারা একটা পেশা থেকে আয় করেন, আয় করেন বলে তারা লেখাপড়ার প্রতি এত আগ্রহ দেখান না। ১৮৭১ সাল র্পযন্ত আমি কিছু পরিসংখ্যান দিই তাহলে বুঝতে পারবেন, ১৮৭১ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি,এ পাস করেছিলেন ৬৭১ জন। এর মধ্যে পুরুত নন এমন মুর্খাজীরা শতকরা ৯ ভাগ, বন্দ্যোপাধ্যায়রা শতকরা ৮ ভাগ, চট্টোপাধ্যায়রা ৭ ভাগ। আপনি কিন্তু কথা বলছেন শুধু বাঙালীদের নিয়ে নয়। কলকাতা ইউনিভার্সিটি মানে পাঞ্জাব থেকে ব্রক্ষদেশ পর্যন্ত।

পাঞ্জাব থেকে মায়ানমার পর্যন্ত হচ্ছে  জুরিসডিকশন। শুধু বাঙালি নন, অবাঙালিও এদের মধ্যে ইনক্লুডেড। এবং তাবৎ বাঙালী পরিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে, তাবত পরীক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পাস করার মধ্যে শতকরা ৯ ভাগ ছিল একটা পদবীর মধ্যে ব্রাক্ষণ ও মুখার্জী। অপরপক্ষে পুরুত যারা তাদের মধ্যে চক্রবর্তীর সংখ্যা শতকরা আড়াই ভাগ। একলাফে কমে গেল। ভট্টাচার্য শতকরা ২.২ ভাগ। মুসলমানদের সংখ্যা? সমস্ত উত্তর-ভারত সমস্ত বঙ্গদেশ, সমস্ত ব্রক্ষদেশ মিলে মুসলমানরা পাশ করেছে শতকরা ১ ভাগ। ৭ জন সব মিলে। ৭ জনে একভাগ হয় না, ৭০০ জনের মধ্যে ১ ভাগ হলে শতকরা একভাগ হয়। একভাগের থেকে একটু কম।

হিন্দুদের মধ্যে কুলবৃত্তি কিভাবে কাজ করেছে সেটা একটু দেখেন; যেমন বৈদ্যদের মধ্যে শতকরা ৫৩ ভাগ শিক্ষিত। কারণ তারা চিকিৎসাবিদ্যার উপর নির্ভর করে। চিকিৎসাবিদ্যাটা শিখে তবে করা যায়। ব্রাহ্মণ শতকরা ৪০ ভাগ, কায়স্থ শতকরা ৩৫ ভাগ। এটা ১৯১১ সালের কথা বলছি। তিলি ১৬ ভাগ, নাপিত শতকরা ১১ ভাগ, কুমার ৮ ভাগ, সাধারণ শুদ্ররা যারা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত বিশেষ করে জমির উপর নির্ভরশীল খানিকটা, কৈবর্তরা বটেই তারা ৪ ভাগ ৫ ভাগ।

এখন এদেশের হিন্দু-মুসলমান সমাজটা একই, সমাজটার রীতি-নীতি এবং ধর্মীয় অংশটা ছাড়া বাকি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো এক। মুসলমানদের বৃত্তিটা কি? সেটা ও হিন্দুদের পুনরাবৃত্তির মতই। চাষীর ছেলে চাষী, প্রধানত কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। জমির উপর তখন চাপ ছিল না,আমরা ঊনিশ শতকের কথা বলছি। জমির উপর চাপ ছিলনা, সুতরাং যত আয় হয় ঐ দিয়ে যথেষ্ট চলে যায়। জমি থেকে যে ধান পায়, সে অংশের একটা অংশ নাপিতরা নিয়ে যায় নগদ। বাড়িতে একটা কথা আছে এক মণ ধান দিতে হবে, সারা বছর নাপিত এসে চুল কেটে যাবে। টাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার নেই। বিনিময়ের অর্থনীতি এবং জেলেকে দেবে,কামারকে দেবে ,কুমারকে দেবে। এভাবে ফসলের বিনিময়ে সেবা গ্রহণ করত। লেখাপড়ার দরকার ছিলনা।

কিন্তু ধীরে ধীরে জমির উপর চাপ বাড়ল। চাপ বাড়ল কিভাবে? একটা হল লোকসংখ্যা বাড়ছে, দুই হচ্ছে জীবন রক্ষার ঔষধ আবিষ্কার হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। এর ফলে আস্তে আস্তে জমির উপর চাপ বাড়ছে। একবার নিজেদের কথা ভেবে দেখুন যে আপনার দাদা যখন ছিলেন তখন আপনার বাড়িতে কয়জন লোক ছিলেন? জমি কতটুকু ছিল? আজকে লোকসংখ্যা কজন হয়েছে? জমির পরিমাণ বেড়েছে কি কমেছে? বাংলাদেশের মোট জমির পরিমাণ মাথাপিছু ০.৩ একর -এটা হয়ত একটু আগেকার পরিসংখ্যান থেকে বলছি। এরমধ্যে খালবিল, নদীনালা-পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি যুক্ত আছে। সুতরাং কৃষিযোগ্য জমি খুবই সামান্য।

যখন মুসলমানরা বুঝতে পারলেন জমির উপর নির্ভর করলে চলবে না, তখন কিন্তু তারা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তবে শিক্ষা নিতে পারেননি, কারণ গ্রামে তখন শিক্ষার ভাল ব্যবস্থা নেই। এখনকার মত গ্রামে হাইস্কুল, কলেজ হয়নি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলনা। আর শহরে পাঠিয়ে লেখাপড়া শেখানোর সংগতি ছিলনা। আমি হান্টারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্টস অব বেঙ্গল থেকে বলছি।  ১৮৭২ সালে জিলা স্কুলে নাইন টেনের বেতন ছিল ৪ টাকা আর দিনের মজুরি ছিল ২ আনা। ৩০ দিনে মজুরি ৬০ আনা। আয় ৬০ আনা মানে পৌনে চার টাকা। আর স্কুলের বেতন ছিল চার টাকা।  সুতরাং এ আয় করে ছেলেকে লেখাপড়া শিখানো সম্ভব নয়। তাদের সংগতি ছিল না।

এই কারণে মুসলমানদের লেখাপড়ার বিকাশ ঘটেছে দেরিতে। একদিকে সচেতনতার ও সংগতির অভাব আর অন্যদিকে জমিনির্ভর মানুষ। সেজন্য ১৯১১ সালে শতকরা ৫৩ ভাগ হচ্ছে বৈদ্যদের শিক্ষিতের হার, ব্রাহ্মণদের হার ৪০ ভাগ । তখন মুসলমানদের অবাঙালিসহ শিক্ষার হার শতকরা ৪ ভাগ। ইংরেজী শিক্ষিতের হার শতকরা একভাগের চেয়ে কম, শতকরা দশমিক ০.৪। তখনো শিক্ষিত ধরা হচ্ছে যারা কোরআন শরীফ পড়তে পারেন। কাজেই অর্থকরী বিদ্যা জানতেন এ রকম শিক্ষিতের হার খুবই সামান্য।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে কি কারণে মুসলমানরা মধ্যবিত্ত হতে পারছেন না। হিন্দু-মুসলমানের শিক্ষার হার এ জন্য দুরকমের। একই বাঙালী, একই ভাষায় কথা বলে শিক্ষার হারের এত পার্থক্য। যেমন ১৯০১ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম,এ পাস করেছে ১৫৫৮ জন। তার মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা ১৫১৩ জন, মুসলমানদের সংখ্যা ৪৫ জন। বলা বাহুল্য, সন্দেহ করা হয় এরা বাঙালি মুসলমান কিনা? খুবই সম্ভব, এদের বেশিরভাগ অবাঙালি মুসলমান। বি,এ পাশের কথা যদি চিন্তা করি তাহলে এম,এ পাশের তুলনায় অবস্থা কিছুটা ভাল। ১৯০১ সালে মুসলমানদের মধ্যে বি,এ পাশ করেছেন ৩৩৮ জন শতকরা সাড়ে চার ভাগ। বি,এল পাস করেছেন ১১৬ জন, শতকরা ৩.১ ভাগ। এম.ডি পাস করেছিলেন ২জন, শতকরা ১.১ ভাগ। পরিবর্তনের সূচনাটা হলো তাহলে কখন?

এবারে আমরা আসল প্রসঙ্গ আসি। কখন থেকে মুসলমানদের লেখাপড়া এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তৈরী হওয়া শুরু হয়েছিল। এটা প্রধানত নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপর। সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী অবস্থা কেমন ছিল? তখনকার অবস্থাটা এই- ইংরেজরা বুঝতে পারল হিন্দুদের উপর যদি নির্ভর করে শাসন চালানো কঠিন।  কাজেই মুসলমানদের কৃপা করা দরকার, পৃষ্টপোষণা করা দরকার।  তারই একটা অংশ হিসেবে হান্টারকে দিয়ে বই লিখে নিয়েছিলেন কর্তারা। মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে। শিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের সুযোগ দিতে হান্টারকে দিয়ে মুসলমানদের দুরাবস্থা নিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। তখনো ইংরেজরা মুসলমানদের যে শিক্ষা দিতে চাইলেন সেটা ছিল মক্তবি শিক্ষা,অগ্রসর শিক্ষা না। যে মক্তবে বাংলা পড়া হবে, সে বাংলা মুসলমানই পারেনা। এরপর দ্বিতীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ,এই যে কৃপার কথা বললাম, সেই সূত্র ধরে শতাব্দীর শেষ দুই দশকে মুসলমানদের কিছু কিছু ছোট ছোট চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা হল এবং মোক্তব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

কিন্তু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ায় তার ফলাফল হল আর একটু বেশি। বঙ্গভঙ্গের জন্য রাজধানী হল ঢাকায়। নতুন রাজধানী এবং নতুন রাজধানী করলে সেইসঙ্গে কিছু সরকারের পৃষ্টপোষণা দিতে হয়। কর্মচারীদের রাখতে হয়,স্থাপনা নির্মাণ করতে হয় । বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল মাত্র ৫-৬ বছরের জন্য। এইটুকু সময়ের মধ্যে ঢাকার উন্নতি হওয়া শুরু হতে লাগল। শিক্ষার হার উন্নত হয়েছিল,এ শিক্ষা কিন্তু মুসলমানরা নিয়েছেন তা না। ঢাকায় যে কর্মচারীরা এসেছিলেন বেশিরভাগই হিন্দু। তাদের মধ্যে লেখাপড়া কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। লেখাপড়া জানা কিছু লোক ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা ও বঙ্গভঙ্গের পরের এই যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, এই পদক্ষেপ দিয়ে উপকৃত হয়েছিলেন। এছাড়া আরেকটা উপকার মুসলমানদের হয়েছিল,যেটা বিশেষ করে আব্দুর রাজ্জাক সাহেব এই ধারণাটা দেন।

মুসলমানরা ক্যাশ ক্রপ (অর্থকরী শস্য) করতে পারলেন। পাটের মত কৃষিপণ্যের উৎপাদন করতে পারলেন। যার চাহিদা বৃদ্ধি পেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে। সুতরাং তাদের হাতে কিছু টাকা আসল। ধান না শুধু,  খাদ্য না, বিক্রি করে পাওয়া যায় নগদ টাকা এমন একটা ফসল তারা উৎপাদন করতে আরম্ভ করলেন ।সেটা তাদের লেখাপড়া নিতে সাহায্য করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯২১ সালে। এবং তারপর থেকে আমরা কিছু লোকের নাম শুনতে পাই- কাজী আবদুল ওদুদ,কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী ইত্যাদি নাম শুনতে পাই। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন বলে একটা কথা শোনা যায়, এটা হওয়া সম্ভব হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হলো বলে। দূরত্বের কারণে যে লেখাপড়া কতটা পিছিয়ে গিয়েছিল সেটার দৃষ্টান্ত একটা আপনাদের দিই। কলকাতায় যখন লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল, তার বাইরে ছিলনা। কলকাতায় যখন ইংরেজী স্কুল হল, কলকাতায় তখন আসত যারা কলকাতায় হেঁটে আসতে পারতেন এমন দূরত্ব থেকে। বিদ্যাসাগরও হেঁটে এসেছিলেন, কলকাতায়। তারপরে বৃত্তটা আর একটু বড় হল। তারপরে বৃত্তটা আর একটু বড় হল । ১৮৪৬ সালে হিন্দু কলেজে যে একজন মাত্র ছাত্র পূর্ববাংলা থেকে গেছেন সে ছাত্রটি কোন জেলার?  কলকাতা থেকে সবচেয়ে কাছের জেলা, যশোর জেলা থেকে। এটা হচ্ছে ১৮৪৬ সালে ঘটনা। তার মানে শিক্ষাটা কলকাতা থেকে ছড়িয়ে পড়তে, পূর্বদিকে আসতে অনেকটা সময় লেগেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন তৈরী হল তখন স্বাভাবিকভাবে ঢাকা অঞ্চলে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা,সিলেটে,বগুড়া এ রকম অঞ্চলে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এ সময় বাঙালিরা একজন মুসলমান নারীকে পায় যিনি এসেছিলেন লেখাপড়া শিখতে।

তখন যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না থাকত,তাহলে তারও পড়ালেখা হতো না। তিনি ফজিলাতুন্নেছা। তিনি অসাধারণ এক নারী ছিলেন। যখন নারীদের লেখাপড়া সম্পূর্ণ বারণ তখন তিনি লেখাপড়া করতে এসেছিলেন। এবং তিনি প্রথম বাঙালি মুসলমান নারী গ্র্যাজুয়েট, যিনি এম,এ পাশ করেন; এম,এ তে প্রথম শ্রেণীর প্রথম স্থান অধিকার লাভ করেন, বিলেতে যান লেখাপড়া করার জন্য; উচ্চতর ডিগ্রির নেওয়ার জন্য। এটা সম্ভব হল কারণ টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা বেশি দূরে ছিলনা। কলকাতা যদি শিক্ষার কেন্দ্র থাকত তাহলে তিনি কলকাতা যেতেন কিনা, অর্থাৎ পিতা তাঁকে কলকাতা আদৌ পৌঁছিয়ে দিতেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে । শিক্ষারবোধ যেখানে শুরু হয়েছে সেই কেন্দ্র থেকে দূরত্বটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এরপর তৃতীয় পদক্ষেপ রাজনৈতিক অবস্থা, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ। এর ফলে ব্যাপকহারে হিন্দুরা চলে গেছেন। ১৯৫১ সালের সেন্সাস অনুসারে হিন্দুদের সংখ্যা তখনও শতকরা ২৯ ভাগ, এখন ৯ ভাগের কম। ১৯৫১ সালের আগে দাঙ্গা হয়ে গিয়েছে; ১৯৫০ এ। কাজেই শিক্ষিত,অভিজাত হিন্দুরা দেশ থেকে চলে গিয়েছে ১৯৫০ সালের মধ্যে। তারপরও ২৯ ভাগ হিন্দুরা এদেশে ছিল। তারা যাওয়ার ফলে কি হল? তারা যাওয়ার পর শিক্ষিত এবং পেশাদার লোকের অভাব দেখা দিল। স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও ফাঁকা হয়ে গেল। আমার শিক্ষক মুহম্মদ আবদুল হাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নেন ১৯৪৯ সালে। কখন? যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বেশ কয়েকজন অধ্যাপক কলকাতা চলে গেলেন।

এবং এক কথায় বললে বলতে পারি যে শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য মুসলমানরা চারদিক থেকে ছুটে আসলেন । বিজ্ঞানের নিয়ম হচ্ছে শূন্য জায়গা থাকতে পারেনা। চারদিক থেকে বাতাস চলে আসে।  মুসলমানরা এসে শূন্যস্থান পূরণ করল। একটা কথা আছে বরিশালে- যার যা কাজ না, শেখে বেঁচে তেল। শেখরা কখনও তেল বেঁচেনি। সুতরাং বাড়ির কাছের কলুরা যখন চলে গেল তখন কলুগিরি করতেও মুসলমানরা এগিয়ে এল,এটাই স্বাভাবিক। ছোট-খাট ব্যবসা-বাণিজ্য,যার হাইস্কুলে পড়ানোর যোগ্যতা নেই, মেট্রিক পাস; তাকেই চলে আসতে হল হাইস্কুলের শিক্ষকতা করার জন্য, এভাবে শূন্যস্থান পূরণ হতে শুরু হল। এক কথায় বলতে পারি প্রতিযোগিতা হ্রাস পেল এবং হ্রাস পাওয়ায় শূন্য মাঠে, ফাঁকা মাঠে গোল দিল মুসলমানরা। এর ফলটা কি হল সেটা দেখুন,তাহলে বুঝতে পারবেন।

প্রবেশিকা পরীক্ষার কথা ধরা যাক। বঙ্গদেশ ও আসাম এ দুটা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৪০-৪৪ এই পাঁচ বছর গড়পড়তা মুসলমান বাঙালি প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছে ৭৫৯২ জন। মোট পরীক্ষার্থীর শতকরা ২১ ভাগ। কিন্তু ১৯৬১ সালে পূর্বপাকিস্তান থেকে ৫৪৬৬৭ জন পরীক্ষা দিয়েছেন। এর মধ্যে হিন্দু কয়জন  জানিনা,তবে ধরে নিলে ৪০০০০ হবেই মুসলমান। ১৯৭২ সালে পৌনে চার লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে, প্রবেশিকা পরীক্ষা । ততদিনে লোকসংখ্যা ২গুণ হয়েছে। কাজেই ৫৪০০০ হাজার ডাবল হওয়া উচিত, একলাখ হওয়া উচিত। একলাখ না পৌনে চার লাখ হয়েছে। পৌনে চারলাখের মধ্যে মুসলমান পরিসংখ্যান কত? সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। অন্তত লাখ-তিনেক তো হবে, হয়ত বেশিই হবে। ২০১৬ সালে পরীক্ষা দিয়েছে ১৪ লাখ।শুধু একটা লাইনে পরীক্ষা দেয়নি। মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিয়েছে লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী। তার  মানে শিক্ষার হার কি পরমাণ বাড়ছে,সেটা একবার ভেবে দেখুন।

তাহলে শিক্ষালাভ করলেন তারা এবং শিক্ষালাভ করার পরবর্তী পদক্ষেপ হল একটা শিক্ষিত লোক যে সমস্ত চাকরি করে সেরকম একটা চাকরি করা। যত ছোট চাকরি হোক,একটা চাকরি করা। সরকারি চাকরির অবস্থা কি দেখতে পাচ্ছি, দেশবিভাগের আগে ১৮৭২ সালে আইসিএস ছিলেন ৫৩ জন,যার মধ্যে ২২ জন বাঙালী, ২জন বাঙালি মুসলমান। বিসিএস ২৯ জন বাঙালি,যার মধ্যে ৮ জন মুসলমান। একজনও পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস হয়নি, সবই বিবেচনার মধ্য দিয়ে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রট ১৫৩ জন হিন্দু, মুসলমান ৯৫ জন এদের মধ্যে অনেকেই অবাঙালি মুসলমান। সাব-ম্যাজিস্ট্রট ৩৯৬ জন হিন্দু, ১৮৭ জন মুসলমান অবাঙালিসহ। এছাড়া এডুকেশন,জুডিশিয়ারি, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস- এগুলোতে এই হারে মুসলমানরা লেখাপড়ার দিকে এগিয়েছেন, খুবই কম তখন পর্যন্ত।  কিন্তু ১৯৬২ সালে যদি যাই,তাহলে আমরা দেখতে পাই ভিন্ন চেহারা।

পূর্বপাকিস্তানে তখন সিভিল সার্ভিসে ছিলেন ৭১৪ জন।  এর মধ্যে কিছু অবাঙালি ছিলেন,তবে ৫০০ জন তো বাঙালি মুসলমান ছিল। ৫০০ যদি অবাঙালি থাকে ২৫০ জন তো বাঙালি মুসলমান ছিল। জুডিসিয়ারী সার্ভিসে ২০৩ জন, এডুকেশন সার্ভিসে ৮৪৪ জন,যার মধ্যে ১১২ জন মহিলা। যুগান্তর নয় ? এই যুগান্তর হতে পারল দেশবিভাগের ফলে। অন্যান্য পেশার কথা বলতে গেলে, এটাতো কয়েকটা পেশার কথা বললাম। সরকারী চাকরি বিভিন্ন ধরনের, বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের চাকরি, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মোক্তার,ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি।  এভাবে আর একটা স্টেপ আমরা দেখতে পাই।  বিরাট স্টেপ। সেটা হল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ। অবাঙালিদের প্রতিযোগিতা লোপ পেল। এতদিন যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অথবা বিহার থেকে এসেছিলেন, অবাঙালি, উত্তর-ভারত থেকে এসেছিলেন আমরা যাদের বিহারী বলতাম, তাদের প্রতিযোগিতা লোপ পেল ব্যবসায়, চাকরিতে, বণ্টনব্যবস্থায়। আর অন্যদিকে একটা নতুন ফাঁকা জিনিস তৈরি হল।  চাহিদা তৈরি হল। চাহিদাটা কিসের? উৎপাদনের। বাংলাদেশে কি কেউ শুনেছেন কোনকালে একটা স্নো তৈরী হয়েছে? মেয়েদের প্রসাধনী তৈরী হয়েছে? হয় নি।

১৯৭২ সালের শেষদিকে যখন সব বিক্রি হয়ে গেল দোকান থেকে,তখন জিঞ্জিরায় তৈরী হওয়া শুরু। তখন যে সমস্ত পুরনো কৌটা বিক্রি করে দিতেন আপনারা,সেই গুলোর ভিতর চুন দিয়ে স্নো তৈরী করা শুরু হয়েছে। একটা স্বাধীন দেশ হলে অনেক কিছু লাগে। আলপিন থেকে শুরু করে  স্টিল ইন্ড্রাটি পর্যন্ত অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। দেশে বণ্টনব্যবস্থা , ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, পুলিশবিভাগ, আইনবিভাগ, শিক্ষাবিভাগ লাগে । সেখানে কত হাজার হাজার লাখ-লাখ লোক প্রয়োজন। এখন কিন্তু বাংলাদেশে এইসব পণ্য জিঞ্জিরায় তৈরী হয় না। এখন বাংলাদেশে যে ঔষধ তৈরী হয় সেটা অনেক জায়গায় রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশে এখন স্টিল মিল আছে অনেকগুলো,এটাকে  বলা হয় ভারী/হেভি ইন্ড্রাটিজ। একটা স্বাধীন দেশে অনেক কিছু প্রয়োজন হয়, স্বাধীন দেশ হলে না থেকে পারেনা। এই সমস্ত কে করেছে? এই সমস্ত বিহারীরা,পাকিস্তান, সৌদি-আরব থেকে কেউ এসে করেনি। বাঙালিদের নিজেদের করতে হয়েছে। এভাবে বাঙালি মধ্যবিত্তদের বিকাশ ঘটে। একটা চিন্তা করে দেখেন এই পূর্বপাকিস্তান ছিল একটা প্রশাসনিক ইউনিট। তারপরে বিভাগ হল, এখন ৮টা বিভাগ। জেলা হয়েছে ৬৪ টি জেলা।  ২১ টা না ১৮ টা জেলা ছিল র্পূব পাকিস্তানে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। উপজেলা হয়েছে ৪৯০ টা। ইউনিয়ন হয়েছে বেশ কয়েক হাজারের মত। এ সবকিছু পরিবর্তন ঘটল। এতে  সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে রাজনীতি। দেশবিভাগের কারণে পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমান মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। এবং তারপর বাঙালি মুসলমানরা আরও বেশি উপকৃত হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। দেশবিভাগের আগে বাংলাদেশে কয়জন ধনী মুসলমান ছিল? একলাখের বেশি হবেনা হয়ত। স্বাধীন হওয়ার পর বহু লাখ ধনী পরিবার তৈরী হয়েছে। সেই তুলনায় পশ্চিমবাংলায় যান তাহলে কি দেখবেন,পশ্চিমবাংলায় এখনও টিম টিম করে বাতি জ্বলছে, বাঙালী মুসলমানদের। পশ্চিমবাংলায় খুঁজলে এখনো বহু বাঙালি মুসলমান ডাক্তার পাবেন,কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার পাবেন না। কেন পাবেন না? কারণ ইঞ্জিনিয়ার হলে সরকারী চাকরি করতে হয়। সরকারী চাকরি করতে গেলে তারা পাবে না।

সুতরাং তারা ইঞ্জিনিয়ার হবেনা,ডাক্তার হয়। দিলীপ চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন। তিনি সিন্ডিকেটের সদস্য; সেই সূত্রে বিভিন্ন সিলেকশন বোর্ডে থাকতেন। এরকম একটা কলেজে তিনি নির্বাচক ছিলেন। নিয়োগ যারা দেয় সে কমিটির সদস্য ছিল। সেখানে ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া একজন মুসলমান ছাত্র চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে আসছেন। ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্র চাকরি না হওয়ার তো কারণ নাই। তিনি বেস্ট ক্যান্ডিডেট। সুতরাং অধ্যক্ষ তাকে বললেন, চাকরি তো আপনারই পাওয়ার কথা; কিন্তু আপনি বাড়ি ভাড়া পাবেন কোথায়? তখন দিলীপ বাবু বললেন যে, ও বাড়ি ভাড়া করবেন না, ও রোজ হ্যালিকপ্টারে আসবে। এই হচ্ছে মধ্যবিত্তের শ্রেণীর বিকাশের কারণ।

পশ্চিমবাংলা এবং বাংলদেশে এখনও একটা শ্রেণীর লোক মধ্যবিত্ত হতে পারেনি বা খুব কম সংখ্যায় মধ্যবিত্ত হতে পেরেছে। তারা শুদ্র, কারণ মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান হয়েছে। সেই পাকিস্তানের অপর নাম বাংলাদেশ এখন। যতই যেখানে লেখা থাকুক না কেন, ডমিনেন্ট শ্রেনীটা হচ্ছে মুসলমান। যদি শুদ্রস্থান নামে একটা দেশ হয়, তাহলে পশ্চিমবাংলার শুদ্ররা চাকরি পাবে, বাংলাদেশের শুদ্ররা ও চাকরি পাবে। আনফরচুনেটলি শুদ্রস্থান বলে কোনো দেশ হয় নি। শুদ্রদের উচিত,তাদের উচিত একটা আন্দোলন করা। বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষার হার অসম্ভব বৃদ্ধি পেয়েছে, অথবা অশিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা মানে পাঠক অর্থাৎ পুঁথিগত বিদ্যা। আর পুঁথিগত বিদ্যা কতটুকু হয়েছে,সত্যি সত্যি পরীক্ষায় খাতায় কতটুকু লেখা হয়েছে সেটা বলা মুশকিল। যদি বা খাতায় লিখেছে, শিখেছে কিনা বলা মুশকিল। আমি যখন ছোট, বাবার কোলে বসে দেখেছি -দেয়ালে লেখা হরফ কাঁচ দিয়ে বাঁধানো থাকে না বাড়িতে “সদা সত্যি কথা বলিবে”?  আমি “সদা সত্যি কথা বলিবে”-র অর্থটা তো জানি না। পড়তে পেরেছি বাবার খানিকটা সাহায্য নিয়ে,কিন্তু অর্থ জানি না। বললাম, বাবা, এটার অর্থ কি?বাবা বললেন,সবসময় সত্য কথা বলিবে।

শিক্ষার হলো তিনটি স্টেজ। একটা হল -সদা সত্য কথা বলা – পড়তে পারা। ২য় স্টেজ হচ্ছে অর্থটা বুঝা- সদা সত্য কথা বলিবে। আর তৃতীয় স্টেজ হল জীবনে । এখন আমাদের দেশে কতটুকু পালন করা হয় শিক্ষাটা। সত্যিকারের শিক্ষাটা তাই, শিখতে পারাটা মানেইতো তাই। নাকি সমস্ত লিখা দেখলাম,পরীক্ষায় খাতায় সমস্ত লিখে এলাম,কিন্তু কিছুই শিখলাম না। শিখলাম না মানে পালন করলাম না।  সেইটাকে শিক্ষা বলে?

যাক গে, সেই শিক্ষাটার কথা বাদ। আপাতত র্অথনীতির উন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকাটা দেখা যাক। এইদেশে শিক্ষার হারটা বেড়েছে,কেউ কেউ বলে শতকরা ৭০ ভাগ শিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে চাকরি পাওয়াটা বেড়েছে। কিন্তু বহুলোক চাকরি পায়নি। শিক্ষা এত অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি সেই শিক্ষা দিয়ে। বরং দেশের অর্থনীতি উন্নতি হচ্ছে,স্বাধীন দেশ হিসেবে অনেক টাকা তৈরি হচ্ছে, ব্যয় হচ্ছে। অনেক টাকা বাইরে থেকে আসছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে,কবে যেন বাংলাদেশের আয় ছিল ১৬৪ ডলার, এখন ১৪০০।  দশগুণ বেড়েছে । মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেড়েছে,দরিদ্রের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭৪ সালে আমি নিজে ছবি দেখেছি।  বমি করেছে, মানুষ সেই বমি খেয়েছে, দুর্ভিক্ষে।  ১৯৭৪ সালে দেশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। গিয়ে যে সংক্ষিপ্ত বসনে মেয়েদের আমি দেখেছি, আমার সারাজীবন মনে থাকবে। দরিদ্রতার সংখ্যা কমেছে, ধনীদের সংখ্যা বেড়েছে নতুন মধ্যবিত্তের সংখ্যার উদ্ভব হয়েছে।

নতুন মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছে বাংলাদেশে। ফার্মিং করে খামারে এখন চাষীরা যা উৎপাদন করেছে,সেটা থেকে অনেকে ধনী হয়েছে, মধ্যবিত্ত হয়েছে। চাষী কখনো ধনী ছিল না। গরু পুষে ধনী হয়েছে , মুরগি পুষে ধনী হয়েছে। কাজেই নতুন নতুন দিকে মানুষের নজর গেছে। এবং বিত্ত সম্পর্কে এখন একটা অন্যরকম ধারনা হয়েছে। ধনীর সংখ্যা বেড়েছে, এখন লক্ষ লক্ষ লোক- এত টাকার মালিক; যেটা ভাবতে পারবেন না। আপনার আমার নেই।  আপনার থাকতে পারে  কিন্তু আমার নেই। মধ্যবিত্তের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে ,এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। মধ্যবিত্তের যে সাইজটা সেটা নিচের দিকে নেমেছে, উপরের দিকে উঠেছে। এখন আবার মধ্যবিত্তদের আবার দু-তিন ভাগ করা যায়। নিম্ন মধ্যবিত্ত,মধ্য-মধ্যবিত্ত,উচ্চ-মধ্যবিত্ত। দরিদ্রদের অনুপাত হ্রাস পেয়েছে। আগে যে দরিদ্রের একটা ঘোরদরিদ্র ছিল সেরকম দরিদ্রের সংখ্যা এখন কম। এবং এর ফলে যে দেশের মানুষের সুখ,শান্তি হয়েছে তা না। কারণ মানুষের আয় নিয়ে তৃপ্তি নেই। যে কোন মূল্যে  আরও আয় করার লোভ। এবং দেশে প্রতিযোগিতার একটা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। আমার সাধ্য নেই ছেলের জন্মদিন পালন করার। কিন্তু পাশের বাসার ছেলেটার জন্মদিন পালন হচ্ছে। সুতরাং আমার দরকার হলে ঋণ করে ছেলের জন্মদিন পালন করতে হবে। দরকার হলে অন্যের পকেট মেরে। মোটকথা,আমাদের মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। তা আমি এই সামাজিক অবক্ষয় এর কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই।

সত্যি সত্যি আমি একটা গোলাপী ছবি দিতে পারলাম না। মধ্যবিত্ত শ্রেনী সম্পর্কে বললাম বটে,মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিভাবে বিকাশ, উদ্ভব লাভ করেছে এসবকথাও বললাম বটে। কিন্তু দেশের মানুষের উন্নতি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। মানুষ যে সমস্ত ক্রাইম এখন করছে, আমি কল্পনা করতে পারিনি,কোনদিন শুনিনি জীবনে যে এরকম হীন,জঘন্য অপরাধ করতে পারে মানুষ। এবং এ অপরাধে করছে বেশিরভাগই মাদকদ্রব্যের জন্য। অথবা প্রতিযোগিতা করে ছেলের জন্মদিন পালনের জন্য। এখন একশ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে দেয় ছেলেকে বাঁচানোর জন্য, মামলা থেকে। দেয় না? ১০০ কোটি, ছোটখাট ফিগার দিয়ে কোন লাভ নেই। সুতরাং মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটছে। সমাজের এবং রাজনীতির কারণে।  আবার সমাজের এবং রাজনীতির কারণে দেশে অসম্ভব রকমের অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। মানুষের মনুষ্যত্ব এবং মূল্যবোধ সত্যি সত্যি লোপ পেয়েছে। আমি সত্যি খুব দু:খিত যে বুঝিয়ে বলতে পারিনি। অনেকবার মনযোগ নষ্ট হয়েছে,খেই হারিয়ে ফেলেছি। সেজন্য বলতে পারলাম না।  কিন্তু তাড়া আছে,তাই শেষ করেছি,সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।

 

শ্রুতিলিখন: জামশেদ সাকিব

Uncategorized

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনঃ তাজউদ্দীন আহমদের অবদান

লেখক: সৈকত বিশ্বাস

বিশ্বের ইতিহাসে কয়েকটা রাষ্ট্র সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। এদের প্রত্যেকটা রাষ্ট্রই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করে।  যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেনারেল চার্লস দ্য গলের স্বাধীন ফরাসি সরকার। কিংবা পোল্যান্ডের প্রবাসী সরকার যার কার্যালয় ছিল লন্ডন।[1] তাছাড়া আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধও (১৭৭৫-১৭৮৩) পরিচালিত হয়েছে একটি বিপ্লবী সরকারের অধীনে[2]। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বেশ মিল পাওয়া যায়। তুলনামূলক ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। একই সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন জাতীয় নেতৃত্বের ভূমিকাকেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে একটি সার্বভৌম বিপ্লবী সরকারের অধীনে। বাংলাদেশেরও তাই। মার্কিনীদের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সহযোগিতা করে ফ্রান্স তেমনি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করে ভারত[3]। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা ও সরকার গঠন ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় যেমন সে দেশের জাতীয় নেতা  থমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬) ও আর কজন নেতা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে তেমনি, বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধের এই তাত্ত্বিক গুরু যেমন থমাস জেফারসন ডিকলারেশন অব ইনডেপেনডেন্স  সনদ ঘোষণা করেন[4] তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সহযোগিতায় তাজউদ্দীন আহমেদ।

তবে পৃথিবীর অন্যান্য প্রবাসী সরকারের তুলনায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার খুব দ্রুত সময়ে মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন করে। কারণ এই সরকার ছিল কাজে নিষ্ঠাবান, কূটনৈতিক সম্পর্কে ছিল খুবই তৎপর, পরিকল্পিত ও ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ছিল সুসংগঠিত। আর এই সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন ঠান্ডা মাথার ধীরস্থির চিন্তাশীল মানুষ, অপরিমেয় দূরদর্শী, আদর্শবান, আপোষহীন নেতা তাজউদ্দীন আহমদ।

এ প্রসঙ্গে এইচ টি ইমাম বলেন, প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যে এই সরকার গঠন করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একদিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ত্ব অন্যদিকে এক কোটির ওপর শরণার্থীর জন্য ত্রাণব্যবস্থা, দেশের অভ্যন্তর থেকে লক্ষ লক্ষ মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা, যুবাদেরকে যুবশিবিরে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন করে পাকিস্থানিদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি, স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ রাখা এবং সাথে সাথে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি- এ সবই ছিল প্রবাসী সরকারের অবিস্মরণীয় কীর্তি যা সমকালীন ইতিহাসের বিচারে অতুলনীয়।[5] কিন্তু আমেরিকা স্বাধীনতার পর জেফারসনের যেমন মূল্যায়ন হয়েছে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদকে তেমন মূল্যায়ন করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে ড. আনিসুজ্জামানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে গনতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপরে নেমে আসে পাকিস্থান সামরিক বাহিনীর অমানুষিক আক্রমণ। বঙ্গবন্ধু তাদের হাতে বন্দি হন। তখন দেশবাসীকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাজউদ্দীন। দক্ষতার সঙ্গে সকল প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এই উদ্দেশ্য সাধনে তিনি সমর্থ হন।[6] তিনি আরও বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের কাছে এই জাতির ঋণের স্বীকৃতি আমরা যথাযথভাবে দেইনি’।[7]

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ করেও স্বাধীনতা ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালে অনেকটা রাজনৈতিক মীমাংসার মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা পাকিস্থানের সাথে রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানলে ১৯৫২ সালের চূড়ান্ত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি প্রথম বারের মতো ‘স্বদেশ যাত্রা’করে। এর পরে একে একে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণ অভুথানের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্ত্বার উন্মেষ ঘটে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনঅনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তান বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অসম্মত হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খান পূর্ব নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। ফলে পূর্ব পাকিস্থানের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়ে। এবং কার্যত এর পর থেকেই পূর্ব পাকিস্থান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্থান এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না করে সামরিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্থানকে সমূলে উৎপাটন করতে মনঃস্থির করে। ইয়াহিয়া আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে, অন্য দিকে বাঙালির উপরে হামলার জন্য সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে থাকে। এদিকে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয় এবং ৭ মার্চ সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে স্বাধীনতার ইঙ্গিত প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি আলোচনার দরজা খোলা রাখেন। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ গভীর রাতে নিরস্ত্র বাঙালির উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ইতিহাসের নারকীয় হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনতা ঘোষণার জন্যে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যেতে সম্মত না হলে তাজউদ্দীন আহমদ রুষ্ট হয়ে সাত মসজিদ রোডের বাসায় ফিরে আসেন।[8] কিছুক্ষণ পরে আমীর-উল ইসলাম ও কামাল হোসেন তাজউদ্দীনের বাসায় যান। এরই মধ্যে যখন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ মোজাফফর সাহেব পাকিস্থানি বাহিনী ইপিআরকে নিরস্ত্র করার খবর দেন তখন তাজউদ্দীন খুবই আশান্বিত হন। সাথে সাথে রাজারবাগের পুলিশের প্রতিরোধ আন্দোলনের কথা শুনতে পান। তখন তাজউদ্দীন ভাবেন ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বাঙালি আজ যুদ্ধের জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত। তাই তিনি অনেকটা সশন্ত্র অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যান অজানার পথে। ২৭ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে অবহিত হন। ২৫ মার্চ রাতেই ওয়ারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পর দিন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানসহ অনেকেই বেতারে পাঠ করেন এবং লিফলেট বিলি করে প্রচার করা হয়।

সরকার গঠন করা কেন প্রয়োজন ছিলঃ

তাজউদ্দীন আহমদ ২৫ মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে ফরিদপুর হয়ে কুষ্টিয়া সীমান্তে ৩০ মার্চ আসেন আমীর-উল ইসলামকে সাথে নিয়ে। এ সময় তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করেন এবং যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করবেন তার পরিকল্পনা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ আন্দোলন দেখে খুব উদ্বুদ্ধ হন। সাধারণ মানুষ গুলোকে হঠাৎ অসাধারণ হয়ে উঠতে দেখে তিনি ৭ কোটি বাঙালির মুক্তির পথ তৈরি করতে থাকলেন।

৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। তাজউদ্দীন উপলব্ধি করেন এখন এই যুদ্ধকে পরিকল্পিত জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে হবে। অপরিকল্পিত যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করা যাবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করতে হবে তার জন্যে চাই একটি সরকারের। তাছাড়া আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করতে একটি সামরিক বাহিনী গঠন করার খুব প্রয়োজন। অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক রসদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদানে ভারতীয় সহযোগিতা লাভ। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা ও এই মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা তখন খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহনের জন্যে ভারতের সহযোগিতার জন্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সরকার অবশ্যক হয়ে পড়ে।

সরকার গঠন করা যে কতটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে তা মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের লেখায় বোঝা যায়। তিনি লেখেন, “পরিকল্পনা করার জন্য প্রতিনিধি স্থানীয় কিছু যোদ্ধাকে নিয়ে আলোচনায় বসলাম। সৈনিকদের সবারই বক্তব্য, আমরা একটি দেশের সৈনিক। কিন্তু দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে এবং বিবেকের ডাকে বিদ্রোহ করেছি। এর পেছনে আমাদের যত মানসিক শক্তি এবং যুক্তিই থাকুক না কেন আমাদের শক্তি কিন্তু তেমন নেই। আমরা পাকিস্তানিদের দ্বারা প্রায় অবরুদ্ধ। যে কোন মুহূর্তে ওরা আমাদের ধরে ফেলতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি আসে তা হলে আমরা আইনানুগ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবো। কারণ এখানও প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্য। ওরা আমাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে বিচার করতে পারে। আর এই বিচারের রায় হবে জঘন্যতম মৃত্যু। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার গঠন অপরিহার্য। আমাদের যদি কেউ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তাহলে অন্তত প্রতিপক্ষ যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারবে এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবে।”[9] এমতাবস্থায় যদি সরকার গঠন করতে বিলম্ব করা হতো, তাহলে একাধিক আঞ্চলিক সরকার কিংবা বিপ্লবী কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। আর যদি সত্যি তা হতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কোন পথে যেতো তা বলা শক্ত। এই সকল গুরুত্ব অনুধাবন করে তাজউদ্দীন আহমদ দ্রুত সরকার গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

 ১৯৭২ সালে তাজউদ্দিন আহমদ একটি স্মৃতিচারণে বলেন, “যাবার পথে এদেশের মানুষের স্বাধীনতা লাভের যে চেতনার উন্মেষ দেখে গিয়েছিলাম সেটাই আমাকে আমার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে অনিবার্য সুযোগ দিয়েছিল। জীবননগরের কাছে সীমান্তবর্তী টঙ্গি নামক স্থানে একটি সেতুর নিচে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলোঃ একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।”[10]

যদিও তিনি জানতেন মুজিববিহীন আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দ্বন্দ্ব রয়েছে। কোন কোন নেতা তার সরকার গঠনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে পারেন। সত্যি সত্যি কিছু নেতা বিরোধিতা করেও ছিলেন। এ সংকটের আশঙ্কা থাকার পরও তাজউদ্দীন আহমদ কাল বিলম্ব না করে, বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সরকার গঠনের জন্য মনস্থির করেন। এ ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন গবেষক কামাল হোসেনের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে তিনি  ‘রিয়েল পলিটিক্স’ এর পরিচয় দেন”।[11]

প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন ও তাজউদ্দীন আহমদের অবদানঃ

৩০ মার্চ তাজউদ্দীন ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে প্রবেশ করেন একজন আওয়ামী লীগের উচ্চপদস্থ নেতা হিসেবে। তিনি প্রথমে বিএসএফ এর আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার ও পরে বিএসএফ প্রধান রুস্তমজীর সাথে দেখা করেন। মার্চ মাসে ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্তের সাথে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাজউদ্দীনের আলোচনা হয়। আলোচনায় বলা হয় পাকিস্তান যদি বাঙালির উপর হামলা করে বাংলাদেশকে ভারত সরকার সাহায্য করবে কিনা। তাজউদ্দীন ভারতে প্রবেশ করে ভারতের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা বুঝতে পারেন সে আলোচনা কোন অগ্রগতি পায় নি। ভারত সরকারও কোন সাহায্য করার জন্য রাজনৈতিকভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। মূলত ৩০ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদের ভারতে প্রবেশের পরপরই ভারত সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তারা কি ধরনের সহযোগিতা করবে তা ভাবতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ÔTajuddin and his colleagues, on their arrival in India, had to establish their credentials as the genuine representatives of the party as well as their capacity to lead a war of liberation’।[12]

এ পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তাজউদ্দীন দ্রুত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে উদ্যোগী হন এবং ৩ এপ্রিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। দেখা করার আগে উচ্চপদস্থ ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন তারা মূলত জানতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ কোন সরকার গঠন করেছে কিনা। তাছাড়া সাক্ষাৎকারের পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কোন পদাধিকার ব্যক্তি হিসেবে সাক্ষাৎ করবেন? তিনি উপস্থিত বুদ্ধির জোরে ত্বরিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে  ভারত সরকারকে জানাতে বলেন, ২৫-২৬ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করেছেন এবং  স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগ  হাইকমান্ডের সদস্যরা মন্ত্রীপরিষদের সদস্য। একটি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতীয় সরকারের সাথে  সাক্ষাৎ করলে রাজনৈতিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতার পথ তৈরি হয় এবং বিশ্ব দরবারে গ্রহণযোগ্যতা পায়  তাই তাজউদ্দীন আহমদ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এতে আলোচনা  অবিস্মরণীয়ভাবে ফলপ্রসূ হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, সামরিক রসদপত্র, শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয়দান ইত্যাদি বিষয়ে ভারতীয় সরকারের সহযোগিতা চান। তাজউদ্দীনের আহমদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চিন্তা-ভাবনার সূক্ষ্মতা ও দূরদর্শিতা ইন্দিরা গান্ধীর মনোযোগ আকর্ষণ করে।[13] এবং কার্যত এই আলোচনার পরপরই ভারত সরকার প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্যে মুক্তিবাহিনীকে স্বল্প পরিমাণে অস্ত্র-শস্ত্র প্রদান করে। দিল্লীতে অবস্থান কালেই তাজউদ্দীন আহমদ রেহমান সোবহান ও আমীর-উল-ইসলামকে দিয়ে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেন। দিল্লীতে থেকে ফিরে এসে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগ নেতাদের খুঁজে বের করেন।

দিল্লী প্রসঙ্গ নিয়ে এবং ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা ঠিক করার জন্যে ৮ এপ্রিল কলকাতার ভবানীপুর এলাকার একটি বাড়িতে মিটিংয়ে বসেন। মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামান, যুবা নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান ও অন্যান্য নেতারা। সভায় শেখ ফজলুল হক মনি মন্ত্রীসভা গঠনের বিরোধিতা করে বলেন দেশ যুদ্ধরত ও বঙ্গবন্ধু শত্রুর হাতে বন্দি, এখন মন্ত্রিত্ব নিয়ে কলহ না করে বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করা উচিত। তখন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম মনির প্রস্তাবে বিরোধিতা করে এবং সরকার গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, “বিপ্লবী কাউন্সিল যদি বিভিন্ন মতাবলম্বী দুটি, পাঁচটি বা সাতটি গঠন করে তাহলে জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা কোনটির আদেশ মেনে চলবেন? কোন কাউন্সিলের সাথে বিদেশের সরকার সহযোগিতা করবে? এ ক্ষেত্রে একাধিক কাউন্সিল গঠনের সম্ভবনা নাই। কোন বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হলে জনগণের মৌলিক অধিকার অবমাননা করা হবে।”[14]

তারপর তাজউদ্দীন সার্বিক পরিস্থিতির ওপরে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বক্তৃতা দিয়ে শেখ ফজলুল হক মনি ব্যতীত সবাইকে সরকার গঠনের তাৎপর্য বোঝাতে সক্ষম হন। মনি পরে জুন-জুলাই মাসে অন্যান্য যুবানেতাদের নিয়ে মুজিববাহিনী গঠন করে যা সরকারের কোন নির্দেশ পালন করতো না। এই সব সত্ত্বেও তাজউদ্দীন দক্ষতার সাথে সরকার পরিচালনা করে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আসে। খন্দকার মোশতাক আহমদও প্রধানমন্ত্রী পদ না পেয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করে যদিও পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ গ্রহণ করে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাজউদ্দীন আহমদের কর্ম তৎপরতা ও বিচক্ষণতার বলে এ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।

অতঃপর শেখ ফজলুল হক মনির বিরোধিতা সত্ত্বেও ১০ এপ্রিল রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা আকাশবাণীর একটি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এ ঘোষণার পরপরই মুক্তিযুদ্ধ একটি নতুন মাত্রা পায়। মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে গতিশীল হয়ে ওঠে, মুক্তিযোদ্ধারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হয়। কতোটা উৎসাহিত হয় তা মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের লেখায় বোঝা যায়। তিনি লেখেন, ‘এই ঘোষণা সর্বস্তরের মানুষ শুনতে না পেলেও আমাদের মনোবল বেড়ে যায় প্রচণ্ড রকম। এই ঘোষণা শোনার পর আমাদের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঐ সময় আমরা যে কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তা আজও প্রকাশ করতে পারবো না। মনে হয়েছিলো ওই মুহূর্ত থেকেই প্রকৃত অর্থে আমি একজন বাঙালি, একজন স্বাধীন নাগরিক। আমার প্রাণপ্রিয় দেশটির নাম বাংলাদেশ।”[15]

১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বদ্যনাথতলার আম্রকাননে প্রথম বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতির কারণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনসুর আলী, অর্থমন্ত্রী হিসেবে এ এইচ এম কামারুজ্জামান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও সেনাপ্রধান হিসেবে আতাউল গনি ওসমানী শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শে আমীর-উল ইসলাম ও আব্দুল মান্নান ৫০-৬০টি গাড়ি করে বিদেশী সাংবাদিকদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নিয়ে আসেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে ব্যাপক সাহায্য করে। যার পুরো কৃতিত্বের দাবীদার তাজউদ্দীন আহমদ।

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা থমাস জেফারসন তাদের বিপ্লবী সরকার গঠনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “when in the course of events, its becomes necessary for one people to dissolve the political bonds which have connected them with another, and to assume among the powers of the earth, the separate and equal station to which the laws of nature and of nature’s God entitle them a decent respect to the opinions of mankind requires that they should declare the causes which impel them to the separation।”[16]

তেমনি তাজউদ্দীন আহমদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেন, “তাদের বোঝা উচিত যে, পাকিস্তান আজ মৃত এবং ইয়াহিয়া নিজেই পাকিস্তানের হত্যাকারী। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ একটা বাস্তব সত্য। ” [17]তিনি আরও বলেন, “কারো তাঁবেদারে পরিণত হওয়ার জন্য আত্ম-নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ সংগ্রামে আমাদের মানুষ এত রক্ত দেয়নি, এত ত্যাগ স্বীকার করছে না।”[18]

মন্ত্রীপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরপরই কলকাতাস্থ পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলী তার সকল স্তরের বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে যোগদান করলে বিশ্বে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ যেমন  আলোড়ন সৃষ্টি তেমন বাংলাদেশের কূটনীতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আর এই তাৎপর্যপূর্ণ কাজটা মূলত তাজউদ্দীন আহমদের কূটনৈতিক জ্ঞানের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার দক্ষতার সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে মন্ত্রীপরিষদ সচিবালয় গঠন, দেশকে ১১ সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা, ৯টি প্রশাসনিক জোন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কমিটি, উদ্বাস্তু কল্যাণ বোর্ড, কৃষি বিভাগ, পরিকল্পনা সেল, বানিজ্য বোর্ড ইত্যাদি গঠন করেন।  এভাবেই তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ৯ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত বিজয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে।

বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু এই হাজার বছরের মধ্যে বাঙালির জাতীয় জীবনে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস। এই সময় বাংলাদেশকে নেতৃত্ব প্রদান করতে সরকার গঠন করে তাজউদ্দীন আহমদ। এই সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং পলাশীর প্রান্তরে যেই বাঙালি স্বাধীনতা হারায় তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে বাঙালি সেই স্বাধীনতা আবার অর্জন করে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে। ৭১ এর সেই উত্তাল সময়ে, কঠিন সময়ে তাজউদ্দীন ব্যতীত আর কেউ সেই সময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারতো কিনা বলা শক্ত।

এ ক্ষেত্রে মুহাম্মদ নূরুল কাদেরের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিতে চেয়েছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর রাতে এর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হতে সাহায্য করে, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের একচ্ছত্র নেতা বানিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের জায়গায় অন্য কেউ, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থাকলেও, অত সুষ্ঠুভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়তো বা, পারতেন না। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন স্তরে যে সকল কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, সেই সকল পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করে, সব কিছু ঠাণ্ডা মাথায় বিচার, বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নের জন্যে নেতৃত্বের যে দৃঢ়তা ও কঠোরতার প্রয়োজন ছিল, তা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেখতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু, হয়তো বা, অত কঠোর হতে পারতেন না। কারণ বঙ্গবন্ধু মনের দিক দিয়ে অত্যন্ত কোমল, স্নেহপ্রবণ ও আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন।”[19]

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জেফারসন কে জাতির পিতায় আখ্যায়িত করা হয়।[20] বাংলাদেশে  তাজউদ্দীন আহমদকে জাতীয় নেতায় আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু আমেরিকায় জেফারসন এর জীবন ও  কর্মকে নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে যেভাবে আলোচনা হয়, তাজউদ্দীন আহমদের জীবন-কর্ম ও স্বদেশ ভাবনা  নিয়ে তেমন আলোচনা বা গবেষণা হয় না। রাষ্ট্রীয় ভাবে চর্চা করা হয় না তাজউদ্দীনের জীবন ও কর্ম  নিয়ে। ফলে বাংলাদেশে আজ আর তাজউদ্দীন আহমদের মতো আদর্শ নেতা বেড়ে উঠছে না। তাই  আমরা যদি সত্যি একটি সোনার বাংলাদেশ চাই, তাহলে তাজউদ্দীন আহমদের মতো আদর্শ নেতা  আজ আমাদের বড়ই দরকার। তাই এমন আদর্শ নেতা পেতে আমাদের তাজউদ্দীন আহমদের  জীবন-দর্শন পাঠ অত্যাবশ্যক।

তথ্যসূত্রঃ

[1] এইচ টি ইমাম, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, (ঢাকাঃ আগামী প্রকাশ, ২০০৪), পৃ-৬২।

[2] সিরাজুল ইসলাম, ঐতিহাসিকের নোটবুক, (ঢাকাঃ কথা প্রকাশ, ২০১০), পৃ-১৭২ ।

[3] সিরাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ-১৭২।

[4] কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদঃ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর, (ঢাকাঃ অঙ্কুর প্রকাশ, ২০০৮), পৃ-২৮৮।

[5] এইচ টি ইমাম, প্রাগুক্ত, পৃ-৬৩ ।

[6] কামাল হোসেন,তাজউদ্দীন আহমদঃ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর, এই বইয়ের মুখবন্ধ লেখেছেন ড আনিসুজ্জামান। সেখানে তিনি তাজউদ্দীন স¤পর্কে মন্তব্য করেছেন, পৃ-XV ।

[7] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-XV ।

[8] মঈদুল হাসান, মূলধারা ৭১, (ঢাকাঃ ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৬), পৃ-০৯।

[9] মুহাম্মদ নুরুল কাদের, একাত্তর আমার, (ঢাকাঃ সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯), পৃ-৪০।

[10] দৈনিক পূর্বদেশ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২।

[11] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-২৭৪।

[12] Nurul Islam, Making of a Nation-Bangladesh: An Economist’s tale (Dhaka: The University Press Limited, ২০০৩), p-১১৫।

[13] কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ-২৭৬।

[14] হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত স্বাধীনতার দলিলপত্র, ১৫শ খ-, পৃ-১১১।

[15] নুরুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ-৪২।

[16] মাযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, পৃ-৬৭১।

[17] শারমিন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদঃ নেতা ও পিতা, (ঢাকাঃ ঐতিহ্য প্রকাশ, ২০১৪), পৃ-৩১৯।

[18] শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ-৩২০।

[19] মোহাম্মদ নুরুল কাদের, ২৬৬ দিনে স্বাধীনতা, (ঢাকাঃ মুক্ত প্রকাশ, ২০০৭), পৃ-৬৭।

[20] সিরাজুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ-১৬৯।

(তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড এর আয়োজনে তাজউদ্দীন আহমদের ওপর রচনা প্রতিযোগিতা-২০১৬- এ তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে এই প্রবন্ধটি। )

ফটোক্রেডিট: দি ডেইলি স্টার।