Browsing Tag

রিক্সা পেইন্টিং

News weekly

জ্ঞানের অভাবেই বাংলাদেশে পপুলার আর্ট সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

জ্ঞানগত সংকটের কারণেই আমরা জনপ্রিয় ধারার শিল্পকলা সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে চরম অসচেতনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। সামষ্টিক জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সচলতাই আমাদের এই জাতিগত অপিরণামদর্শিতা থেকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স হলরুমে আয়োজিত রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের  ২৭৭ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে উপরোক্ত মন্তব্য করেন বক্তা শিল্পী শাওন আকন্দ। লেকচারের বিষয় ছিল পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ : স্পেশাল ফোকাস অন রিকশা পেইন্টিং এ্যান্ড সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির বিকাশ-পরবর্তী বিশ্বায়নের পৃথিবীতে শিক্ষিত উচ্চকোটির শিল্পচর্চার বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা-ঘনিষ্ঠ শিল্প-সংস্কৃতির ধারা, তাদের শিল্পবোধ, সংস্কৃতি-সচেতনতা এবং শিল্পকর্মে তাদের জীবনের প্রতিফলন- এই হল পপুলার কালচারের আপাত:পরিধি। কিন্তু সাধারণের সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতার কারণেই সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং এবং রিকশা পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা-গবেষণায় আমরা আগ্রহী নই। অথচ এগুলো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

সিনেমা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সিনেমা পেইন্টিং-এর ইতিহাস প্রায় একশ বছরের। রবি বর্মা, বাবুরাম পেইন্টার প্রমুখ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর হাতে সিনেমা ব্যানার শিল্পের আদি ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের  যাত্রা শুরু হওয়ার পর সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ের বিকাশের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে আসা অবাঙালি মুসলমানরা। নিতুন কুণ্ডের মত প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরা যুক্ত হলেও নিম্নবর্গের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীরাই ছিলেন এই শিল্পের প্রাণ। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই অনন্য ধারা আজ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর সংরক্ষণে আমাদের ন্যূনতম উদ্যোগ নেই। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন গবেষণা হয়নি, এর পরে যা হয়েছে তা অপ্রতুল। ন্যাশনাল ফিল্ম  আর্কাইভে সিনেমা ব্যানার পোস্টার সংরক্ষণ করা হয় না। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য নেই কোন উদ্যোগ।

রিকশা পেইন্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, রিকশা পেইন্টিং গ্রামে দেখা গেলেও তা প্রধানত নাগরিক নিম্নবিত্তের শিল্পকলা। রিক্সার উদ্ভব জাপানে। ১৯৪০-এর দশকে বাংলাদেশে রিক্সার  প্রচলন ঘটে। বিষয় অনুষঙ্গ, রঙের ব্যবহার ইত্যাদি দেখে ধারণা করা যায় রিক্সা আর্টেও অবাঙালি মুসলমানদের অবদানই প্রধান। এই শিল্পের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার কোন যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। রিক্সা আর্টের বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ- সিনেমার নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে তাজমহল, বোরাক, মরুভূমি, টাইটানিক, পশু-পাখি, হেলিকপ্টার, সমুদ্র, শহরের ছবি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক অবিচার, আলাদীনের দৈত্য কিংবা ইরাক যুদ্ধ। সমসাময়িক সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও উঠে এসেছে কখনো। যেমন- এরশাদের  স্বৈর শাসনামলে রিক্সায় মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে, রিক্সা আর্টে দেখা গেছে মানুষের বদলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে সিংহ। রিক্সা আর্ট নিয়ে গবেষণায় যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তার কারণ বিদেশিরা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নয়, রিক্সা আর্ট-এর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা জাপানে- এ আমাদের জন্য অপমানজনক।

বক্তব্যের উপসংহারে তিনি বলেন,  সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ও রিক্সা পেইন্টিং- দুটি শিল্পই আজ বিপন্নপ্রায়। অথচ এগুলোর সংরক্ষণ এবং এই বিষয়ক গবেষণায় আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যৎসামান্য। অথচ এই শিল্পগুলো আমাদের সামজিক-রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যরকম বয়ান শুধু নয়, তা আমাদের মূলধারার শিল্পচর্চাকেও সমৃদ্ধ করছে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই ঔদাসীন্য, এই আত্মঅবমাননার বীজ আমাদের সংস্কৃতির গভীরে নিহিত। জ্ঞানগত সংকট নিরসনের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভবপর হবে।

রিডিং ক্লাবের সিইও জুলফিকার ইসলাম বলেন, পপুলার আর্ট বা জনপ্রিয় ধারার শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও সংরক্ষণে ব্যর্থতার মাঝেই নিহিত রয়েছে আমাদের অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা। একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য এই শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণ জরুরি ।

সমাপনী বক্তব্যে রিডিং ক্লাবের হেড অব রিসার্চ ও ট্রান্সলেশন ডিভিশন রাশেদ রাহম বলেন, পপুলার কালচার বৃহত্তর অর্থে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। এসব ডিসিপ্লিনে আমাদের অবদান প্রায় শূন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘প্রেসক্রাইব্ড বুকস’-এর ৯৫% উৎপাদিত হয় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হীনম্মন্যতার কারণ তাই আমাদের জাতীয় জ্ঞানকাণ্ডের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিশীল হলেই জাতীয় সমৃদ্ধির পথ রচিত হবে।

weekly

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ২৭৭তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

পপুলার আর্ট ইন বাংলাদেশ

বক্তা

শিল্পী শাওন আকন্দ

পরিচালক, যথাশিল্প (সমকালীন ও ঐতিহ্যবাহি শিল্প কেন্দ্র)

সময় ও স্থান

 বিকাল ৪.০০-৬.০০ শনিবার, তারিখ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সিনেপ্লেক্স হলরুম, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

লেকচার সারাংশ

 

সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চারুকলার ধারার পাশাপাশি একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাও গড়ে ওঠে। এর নেতৃত্ব দেন পীতলরাম সুর, আর কে দাস, আলাউদ্দিন, আলী নুর, দাউদ উস্তাদ প্রমুখ শিল্পী। এসব প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীর মাধ্যমেই বিকশিত হয় এ দেশের সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং, রিকশা আর্ট ইত্যাদি।

সিনেমার ব্যানার বলতে আমরা এখন যা বুঝি অর্থাৎ কাপড়ের উপরে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রায়শই অতিরঞ্জিত প্রোট্রেট কিংবা ফিগার এবং গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সিনেমার নাম ও অন্যান্য তথ্য। এই ধরণের কাজের সূত্রপাত দেশভাগের পর থেকেই হয়েছে।

দেশভাগের আগে ঠিক এই ধরণের সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর প্রচলন না থাকলেও, প্রচারণার তাগিদে প্রেক্ষাগৃহের নির্দিষ্ট দেয়ালে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি ও সিনেমার নাম বড় বড় করে লেখার প্রচলন ছিল। আমরা এই ধরণের কাজকে বলতে পারি সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর আদি রূপ। দেশভাগের আগে তিরিশ ও চল্লিশের দশকে, ঢাকার প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে এই ধরণের ছবি আঁকার কাজে যুক্ত ছিলেন এমন  অন্তত একজন শিল্পীর নাম জানা যায়। তিনি শাঁখারী বাজারের পীতলরাম সুর (১৯০২-১৯৮৭)। ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকায় মায়া (স্টার) সিনেমার হলের কাছাকাছি অঞ্চলে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘আর্ট হাউজ’ ছিল বলে জানা যায়। এমন কি পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। উদাহরণ হিসাবে বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্কর নিতুন কুন্ডু (১৯৩৬-২০০৬) এবং বর্তমানে চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান (জ. ১৯৩৯)-এর নাম উল্লেখ করা যায়।

দেশভাগের পর বিপুল সংখ্যক অবাঙ্গালী মুসলমান কোলকাতা ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এদের অনেকেই কোলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং কিংবা এ ধরণের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত: এদের হাত দিয়েই বাংলাদেশে সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর সূত্রপাত। দেশভাগের পর কিংবা ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর কোলকাতা থেকে যারা ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেন তাদের অনেকেই এই স্টুডিও/কারখানাগুলোতে কাজ করতো।

তবে ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং-এর ইতিহাসে আরেকজন পথিকৃৎ এর সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম মোহম্মদ সেলিম (পরে ‘মুনলাইট’ সিনেমা হলের মালিক)। মোহম্মদ সেলিম  এসেছিলেন কোলকাতা থেকে। তার আদি নিবাস ছিল বোম্বে। ১৯৪৮ থেকে তিনি ঢাকায় সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং এর কাজ শুরু করেন তার বাসায়, র‌্যাংকিন স্ট্রীটে। এই সেলিমের কাছ থেকে কাজ শিখে পরবর্তী পর্যায়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন অনেকেই। এদের মধ্যে গুলফামের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। (গুলফাম এবং মোহম্মদ সেলিম দু’জনই মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে চলে যান।)

রিকশা আর্ট

নিজস্ব শিল্পশৈলী, উপস্থাপন রীতি ও বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে সুধীজনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো রিকশা আর্ট। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের সুসজ্জিত ও চিত্রিত রিকশা সংগৃহীত আছে।

মূলত চাকা আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে রিকশা নামের এই বাহনের সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, ১৮৭০ সাল নাগাদ। অবিভক্ত বাংলায় প্রথম রিকশার প্রচলন ঘটে কলকাতায়, বিশ শতকের প্রথম ভাগে। কাছাকাছি সময়ে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রিকশার প্রচলন হয় প্রথমে ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে এবং পরে ঢাকায় (১৯৩৮)। তবে বাংলাদেশে প্রচলন ঘটে সাইকেল রিকশার, মানুষে টানা রিকশা নয়। বাহারি ও শৌখিন পরিবহন হিসেবে ঢাকায় রিকশার আগমন ঘটে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর। মূলত রিকশা পেইন্টিংয়ের সূত্রপাত হয় এই সময় থেকেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে রিকশা পেইন্টিং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় হতে থাকে। বাংলাদেশে রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রবীণ ও বিখ্যাত শিল্পী যেমন- আর কে দাস, আলী নূর, দাউদ উস্তাদ, আলাউদ্দিনসহ অন্যরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকেই রিকশা পেইন্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন।

রিকশা আর্টের মূল লক্ষ্য রিকশাকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করা। সাধারণত শিল্পীরা মহাজন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ছবি এঁকে থাকেন। তবে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে রিকশা পেইন্টিং করা হয়েছে। যেমন- ষাটের দশকে রিকশা পেইন্টিং করা হতো মূলত শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে। আবার সত্তরের দশকে নতুন দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন  কাল্পনিক শহরের দৃশ্য আঁকা হতো রিকশায়। পাশাপাশি সব সময়ই গ্রামের জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও আঁকা হতো, এখনো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টাইলের ফুল, পাখি ইত্যাদি তো আছেই।